খেলাপি ঋণ বাড়ছে অব্যাহতভাবে। খেলাপি ঋণ আদায়ে অর্থঋণ আদালতে জমেছে মামলার স্তূপ। অন্যদিকে, মামলার জালে আটকা পড়ে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ। বর্তমানে অর্থঋণ আদালতে চলমান মামলার সংখ্যা ৭০ হাজার ৮৭৬টি। আর এসব মামলায় আটকা পড়েছে প্রায় সোয়া ২ লাখ কোটি টাকা। যার অধিকাংশই আদায় হচ্ছে না।
আইনি প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতাসহ বিভিন্ন কারণে অর্থঋণ আদালতে মামলা নিষ্পত্তিতে ধীরগতি দেখা যায়। আদালতের বাইরে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) পদ্ধতিতে খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করা হলেও তেমন সাড়া মিলছে না। তারপরও ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সেদিকেই যাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় খাতসংশ্লিষ্টরা এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরও এই বিষয়ে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে অর্থঋণ আদালতে দেশের ৬০টি ব্যাংকের মোট মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭০ হাজার ৮৭৬টি। এসব মামলায় আটকে আছে প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৩৫১ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে বের করা ঋণ স্বাভাবিক নিয়মে আদায় করতে পারছে না ব্যাংকগুলো। বারবার সুবিধা ও ছাড় দেওয়ার পরও এসব ঋণ ফেরত দিচ্ছেন না খেলাপিরা। আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে এসব ঋণ আদায়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা হলেও নিষ্পত্তি হচ্ছে খুবই কম। আগের মামলা নিষ্পত্তিতে গতি কমে যাওয়া ও নতুন মামলা বাড়ায় মামলার স্তূপ কমছে না। ব্যাংকাররা বলছেন, প্রয়োজনের তুলনায় অর্থঋণ আদালতের সংখ্যা কম হওয়া ও বিচারকের অভাব এবং আইনি মতামতের জন্য ব্যাংকের আইনজীবীকে পর্যাপ্ত সময় ও সহায়ক জামানতের পর্যাপ্ত দলিলাদি সরবরাহ করতে না পারায় অর্থঋণ আদালতে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়।
এই বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিদ্যমান আইনের মাধ্যমে যে লোকবল নিয়োগ আছে, তারা যদি সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে তাহলেই এর সঠিক সমাধান হবে। সেটা না করে আইন পরিবর্তন করে বা লোকবল পরিবর্তন করে কোনো লাভ হবে না। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান যদি সঠিকভাবে কাজ না করে এবং এর জন্য দণ্ডবিধি আরোপ না হয়, তাহলে কোনো সমস্যারই সমাধান হবে না। তিনি বলেন, ঋণ বিতরণ করলে কিছু তো খেলাপি হবেই। কিন্তু নিষ্পত্তির জায়গাটা যদি কার্যকর থাকে, তাহলে ব্যবস্থাপনাটা সহজ হয়। এ জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনাটা ঠিক থাকতে হবে। লোকবলের দক্ষতা বাড়াতে হবে, অটোমেশন নিশ্চিত করতে হবে। এখন অর্থঋণ আদালতে মামলা যেন ঝুলে না থাকে, ফাইল যেন পড়ে না থাকে, সেই বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে হবে।’
জানা গেছে, সারা দেশে মাত্র ৩টি অর্থঋণ আদালত আছে। ঢাকায় দুটি এবং চট্টগ্রামে একটি। মামলা ঝুলে থাকলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হন এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুবিধাভোগীরা।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আইনি প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতাসহ বিভিন্ন কারণে অর্থঋণ আদালতে মামলা নিষ্পত্তিতে ধীরগতি দেখা যায়। প্রথমত, অর্থঋণ আদালতের সংখ্যা কম। ফলে জেলা পর্যায়ে মামলার কোনো কার্যক্রম নেই। এই কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িতদের দক্ষতা কম, সেই সঙ্গে বিচারকের সংখ্যাও কম। এসব কারণে মামলার জট বাড়তে থাকে। আরও একটি প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে অর্থঋণ আদালত থেকে যে কেউ গিয়ে স্টে অর্ডার বা স্থগিতাদেশ নিতে পারেন। এর জন্য কোনো অর্থদণ্ড দিতে হয় না। যেটা অন্য কোনো আদালতে সম্ভব না। আমাদের যে আইন আছে, সেটা খারাপ না। কিন্তু এই আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে অনেকেই এর অপব্যবহার করছেন। আরেকটা সমস্যা হচ্ছে মামলার তারিখ পাওয়া যায় না। বছরে ৩ থেকে ৪টার বেশি তারিখ পাওয়া যায় না। এসব কারণেই মামলার দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয় এবং মামলাজট বাড়তেই থাকে। এই সমস্যার সমাধান কেবল বাংলাদেশ ব্যাংকের একার পক্ষে করা সম্ভব হবে না। এখানে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু কাজ বা উদ্যোগ নিতে হবে। সেই সঙ্গে স্থগিতাদেশ নেওয়ার সময়ই যেন ২০-৩০ শতাংশ অর্থদণ্ড দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।’
একই বিষয়ে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, অর্থঋণ আদালতের মামলাজটের ধীরগতি কমাতে এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে কিছু ডকুমেন্টটেশন তৈরি করছি যেগুলোর মাধ্যমে খেলাপি ঋণ দ্রুত আদায় করা যাবে। রিট পিটিশনের প্রবণতা কীভাবে কমানো যায়, সে বিষয়েও আমরা অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে কথা বলেছি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোর লিগ্যাল টিম শক্তিশালী করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, সামগ্রিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় আদায় কার্যক্রম সুসংহত করার ক্ষেত্রে ব্যাংকের আইন বিভাগ বা লিগ্যাল টিমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকিং সেক্টরে বিদ্যমান খেলাপি ঋণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অর্থ ঋণ আদালতে মামলাধীন। অনেক খেলাপি ঋণের বিপরীতে ঋণগ্রহীতা সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ বা আপিল বিভাগে রিট পিটিশন করেছেন। যথাযথ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ব্যাংকের লিগ্যাল টিমকে আরও শক্তিশালী করা হলে বিচারাধীন মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা যাবে। ফলে একদিকে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায় হবে, অন্যদিকে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।