ঘিঞ্জি জনবসতি। স্বল্প আয়ের মানুষের বসবাস, কোনো রকমে আছে মাথা গুঁজে। সেখানে কারও আবার চলে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকার এমন ১০টির বেশি বস্তির চিত্র প্রায় এমনই। বস্তিগুলোর এমন প্রেক্ষাপটের আড়ালে রয়েছে ভয়ানক অপরাধের চিত্র। যেখানে দিনের বেলায় সবকিছু স্বাভাবিক দেখা গেলেও রাতে তা রূপ নেয় অপরাধের স্বর্গরাজ্যে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, মোহাম্মদপুরের ওই সব বস্তিতে অধিকাংশ রাতেই জুয়ার আসর, মাদক ও অস্ত্র কেনাবেচার হাট বসে। এ ছাড়া চোর-ডাকাত, ছিনতাইকারী ও দাগি অপরাধীদের আত্মগোপনের আশ্রয়স্থল হিসেবেও ব্যবহার হচ্ছে ওই সব বস্তি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মোহাম্মদপুরে রয়েছে দশের বেশি বস্তি বা এ রকম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। এর মধ্যে জেনেভা ক্যাম্প, টাউন হলসংলগ্ন জেনেভা ক্যাম্প, কৃষি মার্কেটসংলগ্ন বস্তি, বাঁশবাড়ী বস্তি, জান্নাতবাগ বস্তি, মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার এলাকার বটতলা বস্তি অন্যতম। এ ছাড়া পলিথিনের গলি, ক্যানসার গলি, বোটঘাট এলাকাতেও গড়ে উঠেছে ছোট-বড় বস্তির আবাসস্থল। এসব এলাকা ঘিরেই গড়ে উঠেছে পেশাদার অপরাধীদের আখড়া।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানান, কিছু বস্তির বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। যেখানে বলা হচ্ছে, একাধিক বস্তিতে খুপরিঘরগুলোর ভেতরেও রয়েছে গোপন সুড়ঙ্গ। মূলত অপরাধ ঘটানোর পর কোনো বিপদ দেখলে অপরাধীরা ওই সুড়ঙ্গে নিরাপদে পালাতে পারছে। এ ছাড়া বস্তির বাসিন্দাদের মধ্যে রয়েছে অপরাধীদের একাধিক সোর্স। এতে নিরাপত্তা বাহিনী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযানে গেলে আগেই খবর পৌঁছে যায় অপরাধীদের কাছে।
অন্যদিকে এই বস্তিগুলোতেই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যসহ প্রায় কয়েক শ সশস্ত্র ক্যাডার সক্রিয় রয়েছে বলেও জানা গেছে। এরা খুন, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজিসহ বিভিন্ন লোমহর্ষক অপরাধে ভাড়ায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব সশস্ত্র ক্যাডারকে লালন-পালন ও নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেন স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের নেতারাও। এই অপরাধীরাই উত্তপ্ত করে রাখে মোহাম্মদপুর এলাকা। এমনকি সরকার পতনের পর লুট হওয়া অস্ত্রের একটি অংশ নানাভাবে এখানে থাকতে পারে বলে মনে করছে এলাকার ওপর নজর রাখা গোয়েন্দা সূত্রগুলো। এসব অস্ত্র দিয়ে এখন সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা।
গত বুধবার মোহাম্মদপুর বাঁশবাড়ী ও রায়েরবাজারসহ একাধিক বস্তি ঘুরে দেখা যায়, বস্তিতে বসবাসরতদের অধিকাংশই নিম্ন আয়ের মানুষ। বস্তিতে প্রবেশের জন্য রয়েছে সরু রাস্তা। এ ছাড়া টিনের খুপরিঘর। একটা ঘরের সঙ্গে একটা গা ঘেঁষে লাগানো। আরও রয়েছে টিনের ও কাঠের দোতলা ঘর। ওপরের তলায় পরিবার নিয়ে অনেকে বাস করলেও নিচের তলায় রয়েছে ভাঙারি, সবজি, রিকশা-ভ্যানের টায়ার ও মোবাইলের ফ্লেক্সিলোডের দোকান। বস্তির ঘিঞ্জি পরিবেশে খুপরিঘরগুলোয় ঠাসাঠাসি করে থাকতে হয় বাসিন্দাদের। সুপেয় পানীয় জলের অভাব, অনুন্নত পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা ও গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগবিহীন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ প্রায় প্রতিটি বস্তিতে। ভেতরে বিকট দুর্গন্ধ, নাকে কাপড় দিয়ে হাঁটতে হয়।
বাঁশবাড়ী বস্তিতে ভাঙারি ব্যবসা করেন স্বামীহারা বয়োজ্যেষ্ঠ ফিরোজা বেগম। ৪০ বছর ধরে এই বস্তিতে থাকছেন তিনি। ফিরোজা খবরের কাগজকে বলেন, ফরিদপুরে নদীতে ভিটেবাড়ি হারিয়ে ৪০ বছর ধরে এই বস্তিতে থাকছেন তিনি। বস্তির বিভিন্ন অপরাধের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘খারাপ লোক তো আছেই। তয় আগুনে এই বস্তির অর্ধেক পুড়ছে। অহন শুনছি বাকি যা আছে, সব ভাইঙ্গা ফেলব। কোথায় যামু জানি না।’
এই বস্তিতে খুপরিঘরে দুই সন্তান নিয়ে বাস করেন আসমা বেগম। তার স্বামী খসরু রিকশা চালান। ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে থাকছেন এই বস্তিতে। তিনি বলেন, ‘বাইরে ভাড়া থাকার ট্যাকা নাই। তাই ঘর উঠাইয়া থাকতাছি। ঘর ভাইঙ্গা দিলে রাস্তায় থাকতে হইব।’ বস্তির অনেকে চুরি, ছিনতাই, মাদক, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত বলে যে অভিযোগ রয়েছে সে বিষয়ে জানতে চাইলে আসমা বলেন, ‘রাত হইলে পুলিশ আইসা ধইরা নিয়ে যায়।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি জানান, দাগি অপরাধীরা দিনের বেলায় তুরাগ নদের ওপারে বিভিন্ন জমির পাশে লুকিয়ে থাকে। সন্ধ্যার পর তারা বেরিয়ে মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন বস্তিতে আশ্রয় নেয়। রাতে বসে তাদের জুয়ার আসর। এ ছাড়া প্রকাশ্যে মাদক ও অস্ত্রের কেনাবেচাও হয় বস্তির কথিত হাটে। রাতভর এসব অপকর্ম চালিয়ে দিনের আলো ফোটার আগেই অপরাধীরা আবারও গা ঢাকা দেয়।
মোহাম্মদপুরের বাঁশবাড়ী বস্তি এলাকার বাসিন্দা ওমর ফারুক খবরের কাগজকে বলেন, চিহ্নিত সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলাল জামিন পাওয়ার পর থেকে তিনি মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এই এলাকায় তার নামে অনেকেই চাঁদাও তুলছেন বলে অভিযোগ আছে।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, কেবল পিচ্চি হেলাল নন, উঠতি অনেক সন্ত্রাসী, ছিনতাইকারী, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা মোহাম্মদপুরসহ আশপাশের এলাকাতে আতঙ্ক বাড়িয়েছে। বিশেষ করে গত বছরের ৫ আগস্টের পর মোহাম্মদপুর অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছিল। ভয়ংকর রূপে সামনে আসে এলাকার কিশোর গ্যাংসহ দাগি অপরাধীরা। যদিও সেনাবাহিনী, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় অপরাধ অনেকটা কমেছে, কিন্তু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলেও মনে করেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলী ইফতেখার হাসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘মোহাম্মদপুরে দশের অধিক বস্তি রয়েছে। এসব বস্তিতে চোর-ডাকাত, পেশাদার ছিনতাইকারীরা আশ্রয় নিয়ে বিভিন্ন অপরাধ কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। মোহাম্মপুরে ৯০ শতাংশ অপরাধ করছে এই বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া অপরাধীরা।’ তিনি বলেন, ‘রায়েরবাজারের পলিথিনের গলি, ক্যানসার গলি ও বোটঘাট এলাকায় অপরাধীরা বেশি সক্রিয়। এসব এলাকাসহ মোহাম্মপুরজুড়ে পুলিশের নিয়মিত অভিযান ও টহল অব্যাহত রয়েছে। তবে বস্তির কারণে অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। এই বস্তিগুলো মোহাম্মদপুরের বিষফোড়ায় পরিণত হয়েছে।’
ওসি আলী ইফতেখার হাসান আরও বলেন, জেনেভা ক্যাম্প ও এই বস্তিগুলো মাদকের আখড়া। বস্তিতে বসবাসরতদের অধিকাংশই নিম্ন আয়ের মানুষ। ভাসমান এসব মানুষ চুরি, ছিনতাই, মাদক, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। রাস্তার পাশে ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে শিশু কোলে অনেক নারী বসে মাদক বিক্রি করেন। তারা অপরাধীদের সোর্স হিসেবেও কাজ করেন। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বস্তির নিম্ন আয়ের মানুষকে পুনর্বাসন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। তাতে অপরাধের মাত্রা অনেকটাই কমে যাবে।
একদিকে অপরাধ চিত্র, অন্যদিকে বস্তির সাধারণ মানুষের বসতির কষ্ট থেকে উত্তরণের বিষয়ে কথা হয় টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. উমর ফারুকের সঙ্গে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘ভৌগোলিক কারণে মোহাম্মদপুর হচ্ছে রাজধানীর অন্যতম অপরাধপ্রবণ এলাকা। জেনেভা ক্যাম্পের কারণে এই এলাকার অপরাধ সংস্কৃতি আগে থেকেই গড়ে উঠেছে। যেহেতু এখন অপরাধের কারণ শনাক্ত করা গেছে, সেহেতু সমাধানের পথও রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘জেনেভা ক্যাম্পসহ বস্তিতেগুলোতে নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস রয়েছে। তাদের অনেকেই চুরি-ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক বিক্রি করে পেট চালায়। এটাকে অনেকেই পেশা হিসেবে নিয়েছে । অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সরকারকে এসব মানুষের জন্য প্রণোদনানির্ভর কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। শুধু পুনর্বাসন করে কোনো ফল পাওয়া যাবে না। তাদের জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন অর্থনৈতিকভিত্তিক পুনর্বাসন। এ ছাড়া দাগি আসামিদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’