জাতীয়ভাবে তিন বছর পরপর ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করতে হবে। যৌন হয়রানিসহ সব ধরনের সহিংসতা থেকে সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিতে রাষ্ট্রকে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। শ্রমিকদের জন্য এমন সব সুবিধা নিশ্চিতের সুপারিশ করে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে শ্রম সংস্কার কমিশন গতকাল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নারী শ্রমিকের মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করতে হবে। শিশু-কিশোর ও জবরদস্তিমূলক শ্রম বন্ধে সরকারকে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শ্রমিকের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির জন্য শ্রম আদালতের সংখ্যা বাড়াতে হবে, মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে ও অযথা হয়রানি বন্ধে উদ্যোগ নিতে হবে। ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী ও শ্রমিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা ফৌজদারি মামলা বাতিল করতে হবে। শ্রমিকের জন্য নিরাপদ কাজ ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ, দুর্ঘটনায় যথাযথ ক্ষতিপূরণ এবং নিজের ও পরিবারের সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। দুর্ঘটনায় বা অবহেলার কারণে নিহত-আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য ক্ষতিপূরণ সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে নির্ধারণ করা হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার গত ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিআইএলএস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদকে প্রধান করে ১০ সদস্যের একটি শ্রম সংস্কার কমিশন গঠন করে।
কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ড. মাহফুজুল হক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র টিইউসির চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সভাপতি তপন দত্ত, বাংলাদেশ লেবার কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট এ কে এম নাসিম, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি এম কামরান টি রহমান, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের সভাপতি চৌধুরী আশিকুল আলম, বাংলাদেশ লেবার ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শাকিল আখতার চৌধুরী, আলোকচিত্রী ও শ্রমিক আন্দোলনের সংগঠক তাসলিমা আখতার এবং একজন ছাত্র প্রতিনিধি।
শ্রমিকের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে শ্রম সংস্কার কমিশন। দেশে আট কোটি শ্রমজীবী মানুষ আছেন। তার মধ্যে ৮৫ শতাংশ বা সাত কোটি শ্রমিকের আইনি সুরক্ষা নেই। শ্রমবিষয়ক সংস্কার কমিটি এই শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিতের সুপারিশ করেছে।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয়ভাবে ন্যূনতম ঘোষিত মজুরি মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় এবং খাতভিত্তিক মজুরি নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শ্রমিক ও তার পরিবারের মর্যাদাকর জীবনযাপন উপযোগী মজুরি নিশ্চিত করতে হবে।
শ্রম কমিশনের রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী সব কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়ন ও সহিংসতাবিরোধী নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। একই সঙ্গে অভিযোগ সেল ও নিষ্পত্তি কমিটি গঠন করা জরুরি।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রম আইনের অধিকার লঙ্ঘন প্রতিকারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। বিরোধ নিষ্পত্তি ও আইনানুগ প্রাপ্য অর্জনের জন্য পরিচালিত কোনো কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ ও বলপ্রয়োগ বন্ধ করতে হবে। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রমিকের অধিকার বিবেচনায় না রেখে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব না।
প্রাতিষ্ঠানিক, অপ্রাতিষ্ঠানিক, কৃষি, গৃহভিত্তিক, অভিবাসী, স্বনিয়োজিত শ্রমিকসহ সবার জন্য রাষ্ট্রকে শ্রম আইনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। নিজের ও পরিবারের মর্যাদাকর জীবনযাপন উপযোগী ন্যায্য মজুরি (লিভিং ওয়েজ), উন্নয়নে ন্যায্য অংশীদারত্ব ও হিস্যা প্রাপ্তির অধিকার থাকতে হবে। অধিকার সুরক্ষা ও ন্যায্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে শ্রমিকরা সংগঠিত হতে পারবে। শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করতে দেশের সংবিধান, আইএলও কনভেনশন ও কর্মক্ষেত্রে মৌলিক নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে।
কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, শ্রমিক নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার আইনি অধিকার পাবে। শ্রমিকের জন্য খাত ও পেশাভিত্তিক সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকবে।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত, স্বনিয়োজিতসহ সকল শ্রমিকের পেশাগত ও আইনি সুরক্ষা ও সামাজিক স্বীকৃতি হিসেবে পরিচয়পত্র প্রদান ও নিবন্ধনের ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকার জরুরি ভিত্তিতে ‘জাতীয় শ্রমশক্তি নিবন্ধনব্যবস্থা ও তথ্যভান্ডার’ গড়ে তুলবে।
কমিশনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শ্রমিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে। ট্রেড ইউনিয়ন শর্ত শিথিল করে সংগঠন করার অধিকার দেওয়া হবে। দর-কষাকষির ক্ষেত্রে অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ ও জবাদিহি কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও তথ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সংস্কার করতে হবে। জবাবদিহিমূলক শ্রম প্রশাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে স্থায়ী শ্রম কমিশন গঠন করতে হবে। স্থায়ী শ্রম কমিশন গঠনের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে অবিলম্বে শ্রম মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি ‘জাতীয় সামাজিক সংলাপ ফোরাম’ গঠনে করতে হবে।
কমিশনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শ্রমিকের সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার প্রাপ্তির (কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, মৃত্যু, কর্ম-অক্ষমতা, অসুস্থতা-অবসর, মাতৃত্বকালীন সুবিধা বা যেকোনো প্রতিকূল অবস্থা) সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন, কেন্দ্রীয় তহবিলের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান ও শ্রমিক আন্দোলনে নিহত সকল শ্রমিককে রাষ্ট্র কর্তৃক শহিদের স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে। এ ছাড়া শ্রম খাতে দুর্ঘটনা বা অবহেলার কারণে নিহতদের ক্ষতিপূরণ ও আহতদের পুনর্বাসন এবং চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্র পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে রানা প্লাজা, তাজরীন গার্মেন্টস, হাসেম ফুডসসহ উল্লেখযোগ্য কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় দায়ীদের দ্রুত বিচার ও শাস্তির আওতায় আনতে হবে।