স্বল্পোন্নত (এলডিসি) দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে এলে পেটেন্ট ছাড়ে ওষুধ তৈরির সুবিধা থাকবে না। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কম খরচে কাঁচামাল কেনার সুযোগও পাবে না। ফলে দেশে বেশির ভাগ ওষুধের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে কয়েক গুণ। ন্যূনতম লাভ রেখে বিক্রি করলেও তা বেশি দামেই বিক্রি হবে।
ওষুধ খাতের সংশ্লিষ্টরা বলেন, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কঠিন প্রতিযোগিতায় পড়বে দেশের ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। বড় মাপের প্রতিষ্ঠানগুলো কোনোরকমে টিকে থাকতে পারলেও বিপাকে পড়বে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। লোকসানে পড়ে অনেকে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে।
আমদানি করা ওষুধের দাম সমজাতীয় দেশি ওষুধের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। দেশে ওষুধ উৎপাদন কমে গেলে আমদানিনির্ভরতা বাড়বে। আমদানি করা ওষুধ আরও বেশি দামে বিক্রি হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাওয়া সাধারণ আয়ের মানুষের পক্ষে এখনই ওষুধের খরচ জোগাড় করা কষ্টকর। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর দাম আরও বেড়ে গেলে কষ্ট আরও বাড়বে। এ পরিস্থিতি এড়াতে এখন থেকেই জরুরিভাবে প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস (ট্রেড রিলেটেড আসপেক্টস অব ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস) চুক্তির আওতায় পেটেন্ট করা ওষুধ তৈরি করতে গেলে পেটেন্টকারীকে বিশেষ ফি দিতে হয়। ট্রিপস চুক্তিকে মেধাস্বত্ব চুক্তিও বলা হয়ে থাকে। ১৯৯৪ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সঙ্গে সদস্য দেশগুলোর এই চুক্তিটি এলডিসি দেশগুলোকে উৎপাদন ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দিয়ে থাকে। ২০২৯ সাল পর্যন্ত কোনো পেটেন্ট ফি ছাড়াই বাংলাদেশের কোম্পানিগুলো এসব ওষুধ তৈরি করতে পারবে। কিন্তু এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এই সুবিধা থাকবে না। ফলে পেটেন্ট ফি দিতে হলে ওষুধের দাম অনেক বেড়ে যাবে। এ ছাড়া বিশেষ ছাড়ে ওষুধের কাঁচামাল সংগ্রহ করার সুবিধাও থাকবে না। কাঁচামাল বেশি দামে কিনতে হবে।”
গবেষণা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জন্য সহজলভ্য ওষুধ নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। মানুষের স্বাস্থ্যসেবার ৬৭ থেকে ৭০ শতাংশ ওষুধের খরচ পকেট থেকে গুনতে হয়। দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ চাহিদা পূরণ করে ১৫১টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে দেশীয় কোম্পানিগুলো। এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসার পর ওষুধ শিল্পের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাঁচামালে আত্মনির্ভরশীল হতে হবে, ওষুধ শিল্পে গবেষণা ও উন্নয়নে গুরুত্বারোপ করতে হবে, স্বাস্থ্য খাতকে দুর্নীতিমুক্ত এবং সকলের জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্যবীমা নিশ্চিত করতে হবে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে হলে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলা হয়েছে গবেষণায়।
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) এবং ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী খবরের কাগজকে বলেন, ‘এলডিসি থেকে উত্তরণ নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য একটি গর্বের বিষয়। তবে ওষুধশিল্পের জন্য এটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এখন পর্যন্ত দেশের ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠনগুলো ট্রিপস চুক্তির আওতায় পেটেন্ট ছাড়ে জেনেরিক ওষুধ তৈরি করছে। ১৫১টি দেশে বাংলাদেশ থেকে উৎপাদিত ওষুধ রপ্তানি হয়। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এই সুবিধা থাকবে না। এতে উৎপাদন খরচ বাড়বে। ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বড় ধাক্কা খাবেন। অন্যদিকে অনেক জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দামও বাড়বে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে ওষুধশিল্প স্থানীয় চাহিদার ৯৮ শতাংশ পূরণ করে এবং রপ্তানি করে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার আয় করে। ওষুধ তৈরির ৮০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এসব কাঁচামালের প্রায় ৪০ শতাংশ চীন থেকে আর ৩০ শতাংশ কিনতে হয় ভারত থেকে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় থাকায় আমাদের দেশের উদ্যোক্তারা ওষুধের কাঁচামাল বিভিন্ন ধরনের ছাড়ে কেনার সুযোগ পায়। এলডিসি থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে এলে এই সুবিধা ক্ষেত্রবিশেষে কমবে বা থাকবে না। তাই আমদানিনির্ভরতা আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে।’
গবেষণায় বলা হচ্ছে, ট্রিপস সুবিধা হারালে রপ্তানিতে ৬.৯ শতাংশ পর্যন্ত আয় কমে যেতে পারে। ওষুধ খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই আমাদের এ অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই) বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করতে যাচ্ছে। ওষুধের গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সরকার ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. জাকির হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, “ওষুধ তৈরিতে ৪০০ ধরনের কাঁচামাল প্রয়োজন। দেশের ২১টি কোম্পানি ওষুধ তৈরির ৪১ ধরনের প্রয়োজনীয় উপাদান (এপিআই) উৎপাদন করে। তাই ওষুধ তৈরি করতে কোম্পানিগুলোকে ৮০ শতাংশ এপিআই আমদানি করতে হয়। এলডিসি থেকে বেরিয়ে এলে এপিআই আমদানিনির্ভর হওয়ায় দেশে ওষুধের দাম কমানো ও রপ্তানির বাজার ধরা চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠবে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘ড্রাগ কন্ট্রোল কমিটির অনুমোদন ছাড়া আমরা কোনো প্রোডাক্ট আনতে পারি না। সরকার যদি এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের আগে বাকি সব পেটেন্টের প্রডাক্টগুলো ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) মাধ্যমে অনুমোদন দিয়ে রাখে, তখন কোনো বহুজাতিক (মাল্টিন্যাশনাল) কোম্পানি এসে বলতে পারবে না যে তুমি বাংলাদেশে এটা উৎপাদন করতে পারবে না। এখন থেকেই এই পদক্ষেপ নিতে হবে।’
ওষুধ খাতের এই নেতা বলেন, ‘সব ওষুধের পেটেন্টের নিবন্ধন ২৬ সালের নভেম্বরের মধ্যে নিতে হবে। একই সঙ্গে দেশের কোম্পানিগুলোরও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এতে নিবন্ধিত পেটেন্টের প্রোডাক্ট দেশে তৈরি করা যাবে। সরকারকে এ বিষয়ে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। বেসরকারি খাত থেকে এরই মধ্যে যোগাযোগ শুরু করছি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘যে কাঁচামাল (মলিকিউল) গুলো দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো এখনো উৎপাদনে সক্ষম না তার দ্রুত নিবন্ধন করে নিতে হবে। যত বেশিসংখ্যক নিবন্ধন করে রাখা যায় তত ভালো। কিছু কোম্পানি এই প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ডিজিডিএ থেকে বেসরকারি খাতের সঙ্গে বসে এটা আরও গতিশীল করতে পারে। সাধারণ মানুষকে বেশি দামে ওষুধ কেনা থেকে বাঁচাতে এটা করতে হবে।’
ওষুধ খাতের এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আমাদের দেশে স্থানীয় বাজারে ওষুধের দাম বেড়ে গেলে সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপ বাড়বে। ধনীদের তেমন সমস্যা না হলেও সাধারণ আয়ের মানুষের কষ্ট বাড়বে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন ১৫১টি দেশে ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। তবে ওষুধের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে রপ্তানি কমবে। অন্যদিকে স্থানীয় বাজারে আমদানি করা ওষুধ বেশি আসবে।’ আমরা সবাই জানি আমদানি করা ওষুধের দাম একই ধরনের স্থানীয় ওষুধের চেয়ে অনেক বেশি। স্থানীয়ভাবে ওষুধ উৎপাদন কমে গেলেও আমদানি বাড়বে। একচেটিয়াভাবে ওষুধ আমদানি হলে এখনকার চেয়ে আমদানি করা ওষুধের দাম আরও বাড়ানো হবে।’
তিনি বলেন, ‘এটা ঠেকাতে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। আমদানি নিয়ন্ত্রণে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে।’
এটা ঠেকানো সম্ভব যদি এপিআই শিল্প পার্ক পুরো চালু করতে পারি। অথচ গত প্রায় তিন যুগ পার হলেও তা চালু করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ওষুধ খাতের দুর্নীতি কমাতে হবে। রাজস্ব ছাড় বাড়াতে হবে।
প্রসঙ্গত ২০০৮ সালে এপিআই শিল্প পার্ক গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৮ সালে বিসিক ওষুধ কারখানার জন্য প্লট বরাদ্দ দেয়। এখনো পর্যন্ত মাত্র চারটি কোম্পানি উৎপাদনে গেছে। বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে বাকিরা কবে যাবে তা জানা যায়নি।
বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির কোষাধ্যক্ষ ও হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন, যদি আমরা কয়েকটা কাজ করতে না পারি তাহলে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন হলে ওষুধের দাম অনেক বেড়ে যাবে। দেশের ওষুধ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এপিআই ইন্ডাস্ট্রি বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত আমাদের যে গবেষণা তা আন্তর্জাতিকমানের হতে হবে। তাহলে এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটলেও ওষুধ খাত প্রতিযোগিতার জন্য লড়াই করতে পারবে।