সিলেট নগরীর উত্তর-পূর্ব এলাকাজুড়ে টিলার বিরাট বেষ্টনী। পরিবেশবাদীদের চোখে এগুলো প্রাকৃতিক ঢাল। প্রকৃতির সেই ঢাল এখন আর আগের মতো নেই। নগরায়ণের প্রভাব ও সরকারি প্রকল্পের অবকাঠামোয় কাটা পড়ছে টিলা। তবে এ প্রবণতার বিপরীত চিত্র ছিল শত বছর আগে। শতাব্দীর প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমসি কলেজ টিলাগড় এলাকায় স্থানান্তরে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছিল টিলা রক্ষা করে। টিলার চূড়ায় বা টিলার ঢালে বিভিন্ন স্থাপনা স্থাপনে ছিল টিলাবান্ধব প্রকল্প।
প্রায় ১০০ বছর পর টিলা রক্ষা করে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের আরেক দৃষ্টান্ত স্থাপন হতে চলেছে সিলেট নগরীর বিমানবন্দরের পাশে বাইশটিলা এলাকায়। প্রকল্প প্রস্তাব থেকে শুরু করে নকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে টিলা রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়ায় সিলেট জেলা পরিষদের এ প্রকল্পটি টিলাবান্ধব হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
সিলেট অঞ্চলে টিলাবান্ধব প্রকল্প বাস্তবায়নের ইতিহাস নেই বললেই চলে। তথ্য তালাশে জানা গেছে, এমসি (মুরারিচাঁদ) কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৮৯২ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠার প্রায় ৩০ বছর পর ১৯২১ সালে কলেজটি সিলেট শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে টিলাগড় এলাকার ‘থ্যাকারে টিলা’ নামক স্থানে স্থানান্তর হয়। স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে, ১৭ শতকের শেষভাগে যখন ব্রিটিশ সরকার সিলেট প্রশাসনিক কার্যক্রম তথা কালেক্টরেট সাজায়, তখন টিলাভূমি বেছে নেওয়া হয়েছিল। সিলেটের প্রথম কালেক্টরেট (ডিসি) উইলিয়াম ম্যাইকপিস থ্যাকার তার দাপ্তরিক ভবন নির্মাণ করেছিলেন টিলার চূড়ায়। বর্তমানে এমসি কলেজের অধ্যক্ষের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত সেই টিলাটি অবিকল থাকায় নাম হয়েছে ‘থ্যাকারের টিলা’।
এমসি কলেজ ক্যাম্পাসের ১২৪ একর জায়গার পুরোটা টিলাভূমি। প্রথম অবকাঠোমো নির্মাণ হয় ১৯২১ সালে। নির্মাণরীতিতে সেমিপাকা আসাম প্যাটার্নের স্থাপনা স্থাপন করার মূলে ছিল টিলা রক্ষা করা। মূল ভবন নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন তৎকালীন আসামের গভর্নর স্যার উইলিয়াম মরিস। নির্মাণ শেষে ১৯২৫ সালে উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন আসামের গভর্নর স্যার উইলিয়াম রীড।
শত বছর আগে সরকারিভাবে টিলাবান্ধব সেই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও পরবর্তী সময়ে তা আর অনুসরণ হয়নি। টিলাগড় এলাকা থেকে শুরু করে সিলেট নগরীর উত্তর-পূর্ব-পশ্চিমে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি অসংখ্য সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি দুগ্ধ খামার, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস স্থাপনে অর্ধশত টিলা কাটা হয়েছে বলে প্রকল্পের নথিতেই উল্লেখ রয়েছে। বাইশটিলায় বাস্তবায়নাধীন সিলেট জেলা পরিষদের প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, টিলা কেটে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রবণতার মধ্যে জেলা পরিষদের প্রকল্পটি হয়ে উঠেছে একটি টিলাবান্ধব প্রকল্পের দৃষ্টান্ত। যার পুরোটা প্রকল্প বাস্তবায়নের পর দৃশ্যমান হবে।
বাইশটিলার অবস্থান সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লাগোয়া। নিরিবিলি পরিবেশ ও প্রকৃতি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। সবুজ-পাহাড়-টিলা আর হাওর-বিলের জলরাশি সেখানকার প্রাকৃতিক আকর্ষণ। বাইশটিলার লালবাগ দক্ষিণপাড়ায় সিলেট জেলা পরিষদের নিজস্ব জায়গা ‘ন্যাচারাল পার্ক’ প্রস্তাবিত এলাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
জেলা পরিষদ জানায়, বাইশটিলায় জেলা পরিষদের মোট ৫৬ একর জায়গা রয়েছে। এ জায়গার একটি অংশ বিমানবন্দরের রানওয়ের সংরক্ষিত সীমানাপ্রাচীর সম্প্রসারণে ছেড়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে পাঁচটি টিলা ও একটি জলাশয় মিলিয়ে মোট ৪০ একর জায়গা রয়েছে। ন্যাচারাল পার্ক প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে সেখানকার প্রকৃতিকে প্রাকৃতিক রাখতে। প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রকল্প হিসেবে কাজটি শুরু হয়। ইতোমধ্যে ৪০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে সিলেট জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সন্দ্বীপ কুমার সিংহ খবরের কাগজকে বলেন, প্রকৃতিকে প্রকৃত রেখেই প্রকল্পের কাজ চলছে। বাস্তবায়নের পর গোটা বাইশটিলা এলাকা নতুনরূপে দেখা যাবে বলে আমরা আশাবাদী।
প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, টিলার চূড়ায় ওপেন কটেজের পাশাপাশি ওয়াশরুম, লেকের ওয়াকওয়ে, ঘাট ও সৌন্দর্যকরণের কাজ চলছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থপতির স্থাপত্য ভাবনা হলো একটি টিলার চূড়ায় অবস্থান করে যাবতীয় সব কাজ সম্পন্ন করারে সুযোগ থাকা। যেমনটি হয়েছিল ১৭ শতকের শেষভাগে থ্যাকারের টিলায়। এর প্রায় ২০০ বছরের মাথায় তা অনুসরণ করে এমসি কলেজের অবকাঠামো নির্মাণে সরকারি কাজে প্রচলন হয়েছিল সেমিপাকা আসাম প্যাটার্নের স্থাপত্য নির্মাণ। যার ধারাবাহিকতায় সিলেট অঞ্চলে অসংখ্য সরকারি স্থাপনা হয়েছে সেমিপাকা আসাম প্যাটার্নে।
পুরো প্রকল্পের নকশা করেছেন স্থপতি রাজন দাশ। টিলাকে অবিকল রেখে স্থাপনা নির্মাণের চ্যালেঞ্জ জয়ে টিলাভূমিতে এই স্থপতির প্রথম স্থাপত্যকর্ম রয়েছে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারটি তার নকশায় স্থাপিত। তবে সেই টিলার পুরোটা সুরক্ষা হয়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রকল্প বাস্তবায়নের তোড়জোড়ে।
প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের নাম বাইশটিলা ন্যাচারাল পার্ক। প্রকৃতিকে নষ্ট না করার প্রথম ধাপের কাজ সম্পন্নে স্থপতির নকশা প্রণয়নের সময় পুরো এলাকা জরিপ করা হয়েছে। এখানকার টিলাগুলোর মধ্যে একটি টিলা আইসোলেটেড (বিচ্ছিন্ন)। স্থপতির চোখে এটি ‘নিঃসঙ্গ টিলা’ বলে চিহ্নিত করা হয়। টিলার চূড়ায় স্থাপনা স্থাপন করা হবে। টিলাটির চারপাশে রয়েছে জলাশয়। শুষ্ক মৌসুমে সেখানে হাঁটুজল থাকে। জলাশয়ের গভীরতা বাড়িয়ে ছোট ছোট নৌকা চলাচলের সুযোগ তৈরি করা হবে, যা টিলায় যাতায়াতে সরাসরি পথ-সংযোগ প্রাকৃতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করবে। এতে এয়ারপোর্টসংলগ্ন এলাকার নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে। প্রধান সড়কের দিকে একটি পারাপারের ঘাট বা বোট-ইয়ার্ড থাকবে। যেখান থেকে টিলাসংলগ্ন ঘাটে নৌকা ভিড়বে এবং টিলার ভাঁজে ভাঁজে থাকা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে যেতে হবে। টিলার গায়ে বসার ছাউনিও থাকবে।
সেকালে থ্যাকারের টিলা থেকে এ কালের বাইশটিলার ‘নিঃসঙ্গ টিলা’ নিয়ে স্থপতি রাজন দাশ তার স্থাপত্যকর্মের বাস্তবায়ন যেন দিব্য চোখে দেখছিলেন। ভবিষ্যৎ দৃশ্যপট সম্পর্কে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রকৃতির লীলাখেলা প্রাকৃতিকভাবে দেখতে আমরা নিঃসঙ্গ টিলার নিঃসঙ্গতা চিরতরে ঘোচাতে চাই। প্রথম ধাপের কাজ শেষে টিলার ঢালে ঋতুভিত্তিক গাছগাছালি রোপণ করা হবে। আলাদা করে চিহ্নিত করা থাকবে বর্ষার গাছ, বসন্তের গাছ। এর মধ্যে এমনও ভাবনার বাস্তবায়ন চিন্তা রয়েছে যে, বছরের ছয়টি ঋতুতে প্রকৃতির ছয় রকম সাজে সজ্জিত হবে এলাকা। যাতে একেক ঋতুতে প্রকৃতির একেক সাজ দেখা যায়।’
এদিকে টিলাবান্ধব প্রকল্পটি নিয়ে পরিবেশবাদীরা কী ভাবছেন? জানতে চাইলে ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম চৌধুরী কিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা বিশ্ব ধরিত্রী দিবস পালনের সময় বলেছি যে, সিলেট অঞ্চলের টিলাভূমি নিঃশেষ হচ্ছে প্রশাসনিক ব্যর্থতায়। এর মধ্যে সরকারি উদ্যোগে এ রকম একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। সেখানে আগে প্রকৃতি রক্ষায় এলিয়েন বৃক্ষ (বিদেশি গাছ) লাগিয়ে বনায়নের নামে সবুজের ক্ষতি করা হয়েছে। সেই সব অপসারণ দরকার। প্রকল্পটির পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে সুন্দর একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে। পাশাপাশি সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে টিলা রক্ষার বিষয়টি প্রাধান্য পাবে।’