অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় ৯ মাস অতিবাহিত হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে খাদের কিনারে ফেলে যাওয়া দেশের অর্থনীতিকে স্বাভাবিক অবস্থায় আনতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। এ সময়ে অর্থনীতির ক্ষত ঠেকানো গেলেও অর্থনীতিতে এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীলতা ফেরেনি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ জন্য আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
১৮ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা ঋণের দায় রেখে গত ৫ আগস্ট ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে শেখ হাসিনা সরকার। এরপর ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। সেই থেকে অর্থনীতিতে ব্যাপক সংস্কারের ঘোষণা দেন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণের চেষ্টাও চলছে। দীর্ঘদিনের অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত হাসিনা সরকার পরিবর্তনের পর দেশের সর্বস্তরের মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিলেন। কিন্তু দিন যতই যাচ্ছে, মানুষের আশার আলো ফিকে হতে শুরু করেছে।
বিভিন্ন সংস্থার হালনাগাদ তথ্য বলছে, দু-একটি বাদে অর্থনীতির অধিকাংশ সূচক এখনো নিম্নমুখী। সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। নিত্যদিনের যন্ত্রণা হয়ে উঠেছে ঊর্ধ্বমুখী মুল্যস্ফীতি। এটি একদিকে মানুষের সঞ্চয়ের টুঁটি চেপে ধরছে, অন্যদিকে ক্রেতার সক্ষমতায় চিড় ধরিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাজারে। এতে সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্যেও যেমন তৈরি হয়েছে স্থবিরতা, তেমনি সরকারের রাজস্ব আয়েও বিরাট ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
আবার সরকারের আয় কমে যাওয়ায় ব্যাংক থেকে ঋণ করার প্রবণতা বাড়ছে, যা কমিয়ে দিচ্ছে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ। বৈদেশিক বিনিয়োগ ও ঋণ পরিস্থিতিতেও চলছে ভাটা। আর বিগত সরকারের লুটপাটের সবচেয়ে বড় থাবা পড়েছিল ব্যাংক খাতে। লুটের অধিকাংশ টাকাই দেশ থেকে পাচার করে দিয়েছে। সেই পাচারের অর্থ দেশে ফেরাতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে নতুন সরকার।
নতুন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নিয়ে বলেছিলেন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরকার চিত্র উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো। শেয়ারবাজারের পরিস্থিতি তো আরও করুণ। সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে আপাতত খুব বেশি সুখবরের আভাস মিলছে না।
তবে নানা সংকটের মধ্যেও আশার খবর হচ্ছে, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল হয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স অব্যাহতভাবে বাড়ছে। ফলে স্থিতিশীল রয়েছে রিজার্ভও। বিদেশি ঋণ পাওয়ারও বেশ কিছু আশ্বাস পাওয়া গেছে। ডলারের বাজারও স্থিতিশীল রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, বিগত সরকার অর্থ পাচার, দুর্নীতি, অনিয়ম আর লুটপাট করে দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছিল। সেই জায়গা থেকে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে পরিস্থিতি উত্তরণের চেষ্টা করছে। কিছু জায়গায় সফলতা এসেছে। কিছু জায়গায় আরও অনেক কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, এই সরকারের সময়ে সবচেয়ে বড় সফলতা হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারকে স্থিতিশীল করা। এটা না হলে পুরো অর্থনীতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ছিল। এই সরকার দায়িত্ব নিয়ে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারকে স্থিতিশীল করেছে। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় অব্যাহতভাবে বাড়ছে, ফলে রিজার্ভ স্থিতিশীল রয়েছে। আর একটি বড় সফলতা হচ্ছে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পেরেছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আদানির বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে কি না, সেই আশঙ্কাসহ নানা ধরনের সংকট ছিল। তার পরও এই সরকার বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রেখেছে। বিদায়ী বছরের শেষ প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধিও কিছুটা বেড়েছে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে দেশে বিনিয়োগ বাড়ছে না। আগামীতে কী হবে, সেটাও পরিষ্কার না। তবে বিগত সরকারের সময়ে সবচেয়ে বেশি আশঙ্কাজনক অবস্থায় ছিল দেশের ব্যাংকিং খাত। খাতটা ভেঙে পড়বে কি না, সেই আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। তবে এখন পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়িয়েছে সেটা না বললেও সেই আতঙ্কটা এখন আর নেই। কিছু কাজ হয়েছে, কিছু হচ্ছে। রপ্তানিতেও আগামী জুন পর্যন্ত একই প্রবৃদ্ধি থাকবে। তবে ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক নিয়ে আগামীতে একধরনের অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
দেশের অর্থনীতিকে যদি রোগীর সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে বলতে হবে ৫ আগস্ট পর্যন্ত রোগী যে আইসিইউতে ছিল, আট মাস পর সেখান থেকে বেডে এসেছে, কিন্তু পুরোপুরি সেরে উঠতে আরও অনেক সময় লাগবে। আগামী দিনে অনেক অনিশ্চয়তা আছে, ঝুঁকিও আছে। এখন যে জায়গায় দেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। সামনে এগোতে হবে। তবে বেশ কিছু জায়গায় রক্তক্ষরণটা বন্ধ করা গেছে। কিছু জায়গায় চিকিৎসা শুরু করা হয়েছে। তবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে আরও দ্বিগুণ গতিতে এগোতে হবে সরকারকে। মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে দেশের মানুষকে এখনো স্বস্তি দিতে পারেনি সরকার। দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আরও বাড়ছে। বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীলতা আসেনি। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখনো আসছেন না। আর দেশীয় বিনিয়োগকারীদের অধিকাংশই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এই অবস্থায় সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই সঙ্গে রাজস্ব আদায়েও মনোযোগ বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে সংস্কার উদ্যোগ চলছে। এখন দেশ থেকে অর্থ পাচারও অনেকাংশে কমেছে। তবে পাচারের অর্থ ফেরাতে সরকারকে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। আর রপ্তানি আয় বাড়াতে পণ্যবৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। এই বিষয়গুলোতে সরকার কার্যকর উদ্যোগ নিলে দেশের অর্থনীতি দ্রুত সময়েই ঘুরে দাঁড়াবে।
ঘাটতি রাজস্বেই যত দুশ্চিন্তা
সরকারের অর্থায়নের প্রধান উৎস হলো রাজস্ব খাত। এখানকার বড় ঘাটতি থেকেই অর্থনীতির সব সমস্যার সূত্রপাত। বিগত সরকারের সবচেয়ে বড় সমালোচনার জায়গা ছিল রাজস্ব আয়ের ঘাটতি।
চলতি অর্থবছর ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) সার্বিকভাবে শুল্ক ও কর আদায় হয়েছে ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। আর ৯ মাসে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা। সেই হিসাবে আলোচ্য সময়ে ঘাটতির পরিমাণ হয়েছে ৬৫ হাজার কোটি টাকা।
লাগামহীন মূল্যস্ফীতি
আড়াই বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির তাপে পুড়ছেন দেশের মানুষ। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের শ্রমিক এবং দিনমজুরদের এই বিষয়ে ক্ষোভ ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ে। সেই জায়গা থেকেই তারা সরকার পরিবর্তনের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের উচ্ছ্বাস ছিল অন্য রকম। কিন্তু আট মাস পর এসে তাদের মুখে আগের সেই উচ্ছ্বাস দেখা যায় না। নতুন গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর নীতি সুদহার তিন দফায় বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এতে ঋণের সুদহারও বাড়ছে। তার পরও মূল্যস্ফীতির পাগলা ঘোড়ার লাগাম টানা যাচ্ছে না। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা বাস্তবতায় এক বছরের বেশি সময় ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশে ঘোরাফেরা করেছে। সম্প্রতি তা ৯ শতাংশে নামলেও তা খুব বেশি স্থায়ী হবে না বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রতিবেদন বলছে, গত মার্চে মূল্যস্ফীতি আবার কিছুটা বেড়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ হয়েছে।
আমদানিতে গতি নেই
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশে দীর্ঘদিন ধরে আমদানিতে চলছে কড়াকড়ি ও নানা বিধিনিষেধ। এই সরকারও সেসব বিধিনিষেধ পুরোপুরি তুলে দেয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) আমদানিতে ঋণপত্র বা এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি দুটিই কমেছে। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি কমেছে মূলধনি যন্ত্রপাতি এবং শিল্পের প্রয়োজনীয় মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে ২৫ শতাংশ আর মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি কমেছে ৯ শতাংশ। এ সময় ভোগ্যপণ্য আমদানিও কিছুটা কমেছে।
বিনিয়োগে স্থবিরতা
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পদক্ষেপে একদিকে কমছে আমদানি, অন্যদিকে বাড়ছে ব্যাংকঋণের সুদহার। ফলে নতুন বিনিয়োগে যেতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। এতে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদাও কমে যাচ্ছে। সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারি শেষে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকটি আরও কমে ৬ দশমিক ৮২ শতাংশে নেমে গেছে, যা সর্বনিম্ন। সেই সঙ্গে লক্ষণীয়ভাবে কমছে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধির হার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুসারে, বিদায়ী বছরের ডিসেম্বর শেষে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ১০ শতাংশ, যা আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১০ দশমিক ১৬ শতাংশ।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে সামনের দিনগুলোতে উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
শঙ্কামুক্ত নয় রপ্তানি আয়
দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস রপ্তানি খাত। এখন পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হলেও তা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছে না। জুলাই-আগস্ট মাসে উৎপাদন খাতে যে ধাক্কা লেগেছিল, তা কাটিয়ে দেশের পণ্য রপ্তানি বাড়তে শুরু করেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রপ্তানি হয়েছে ৩২ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় তা সাড়ে ১০ শতাংশ বেশি। তবে এখনো লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে রয়েছে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকটি।
ঋণ করে দেশ পরিচালনার পথেই সরকার
হাসিনা সরকারের সময়ে রাজস্ব ঘাটতির বিপরীতে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে সরকারের ব্যয় অত্যধিক বেড়েছে। ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিয়েই সেই ঘাটতি পূরণ করেছে সরকার।
আগের সরকারের ধারাবাহিকতায় ঋণ নিয়ে দেশ পরিচালনার দিকেই ঝুঁকছে নতুন সরকার। তবে আশার দিক হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ না নিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকেই বেশি ঋণ নিচ্ছে সরকার। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ ৯৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তবে একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ নেয়নি সরকার। উল্টো আগের নেওয়া ঋণের ৪১ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করেছে। ফলে আলোচ্য সময়ে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নেওয়া নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা।
ব্যাংকে গ্রাহকের আস্থা এখনো পুরোপুরি ফেরেনি
বিগত সরকারের সময়ে অর্থনীতি ধ্বংসের মূল আয়োজন ছিল ব্যাংকিং খাতে লুটপাট ও অর্থ পাচারকে কেন্দ্র করে। সরকারে প্রভাববিস্তারকারী সালমান এফ রহমানসহ আরও কয়েকজনের নিয়ন্ত্রণে ছিল বেশ কয়েকটি ব্যাংক। এসব ব্যাংকে জমা রাখা গ্রাহকের অধিকাংশ টাকাই পাচার হয়ে গেছে। এখন ব্যাংকে ঘুরে ঘুরেও গ্রাহকরা টাকা তুলতে পারছেন না। এতে ব্যাংক খাতের প্রতি গ্রাহকের আস্থা তলানিতে নেমে এসেছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, গ্রাহকের আমানতের সর্বোচ্চ সুরক্ষা দেওয়া হবে। এ জন্য গ্রাহকদের আরও কিছুটা সময় ধৈর্য ধারণ করতে হবে। সংকটে পড়া ১১টি ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
খেলাপি ঋণের উদ্বেগ কমছে না
বিগত সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির অভাব ও ছাড় দেওয়ার মানসিকতার কারণে ব্যাংকিং খাতে বিদ্যমান খেলাপি ঋণের চিত্র অর্থনীতিতে ভয়ংকর রকমের উদ্বেগ তৈরি করেছে। লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে খেলাপি ঋণ। কেবল টাকার অঙ্কে নয়, বেড়েছে শতকরা হিসেবেও। বিদায়ী বছরের ডিসেম্বরে বিতরণ করা ঋণের ২০ দশমিক ২০ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে। এ সময় খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, আগের সরকারের সময়ে দেশে ঋণখেলাপিদের তিরস্কারের পরিবর্তে পুরস্কৃত করা হয়েছে। এটা ব্যাংক খাতের জন্য অশনিসংকেত। বর্তমান সরকারকে সেই একই পথে না হেঁটে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, যদিও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ফলে আগামীতে খেলাপি ঋণ আরও বাড়বে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
বাড়ছে রেমিট্যান্স, স্থিতিশীল রয়েছে রিজার্ভ
নতুন সরকারের সবচেয়ে আশার দিক হচ্ছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স অব্যাহতভাবে বাড়ছে। এর ফলে রিজার্ভও বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে। সেই সঙ্গে ডলারের বাজারেও স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। বলা হয়ে থাকে- যে দেশে যত বেশি রিজার্ভ, সেই দেশ অর্থনৈতিকভাবে তত বেশি টেকসই হয়। যেকোনো সংকট মোকাবিলায় সক্ষমতাও বেশি থাকে। বাংলাদেশের রিজার্ভ পরিস্থিতিও একেবারে মন্দ ছিল না। তবে বিগত সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ভুল নীতি’র কারণে তা কমে উদ্বেগজনক অবস্থায় নেমে যায়। সেই জায়গা থেকে নতুন সরকারের কয়েকটি উদ্যোগে স্থিতিশীল রয়েছে রিজার্ভ। আইএমএফের ব্যালান্স অব পেমেন্টস অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল (বিপিএম ৬) অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ২২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
পাচারের অর্থ ফেরাতে সরকারের উদ্যোগ
শেখ হাসিনার শাসনামলে সাবেক প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা দেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের সঙ্গে মিলে ব্যাংকিং খাত থেকে ১৭ বিলিয়ন ডলার পাচার করেছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। নজিরবিহীনভাবে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে বর্তমান সরকার নানা ধরনের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে চুক্তিও হয়েছে। এই কাজে বিশ্বব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা সহযোগিতা করছে। বিএফআইইউর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেছেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই পুরোটা না হলেও কিছু পরিমাণে পাচার করা অর্থ দেশে ফেরত আসবে।