সারা বছরই রাজধানীর সড়কে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলমান থাকে। বর্ষা মৌসুমে রাস্তা কাটাছেঁড়া আরও বেড়ে যায়। ঢাকার যেকোনো সড়কে পথ চলতে কিছু দূর পরপর হঠাৎ চোখের সামনে উদয় হয় রাস্তা খুঁড়ে তোলা ময়লা-আবর্জনা, মাটি আর বালুর স্তূপ। তা মেরামত করতে গিয়ে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ সময় লাগায় দুই সিটি করপোরেশনসহ অন্য সংস্থাগুলো। ফলে একদিকে যেমন কাজে ধীরগতি, অন্যদিকে বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় সারা বছর ভোগান্তি নিয়েই দিন কাটাতে হয় সাধারণ মানুষকে। তবে এবার এসব জনদুর্ভোগ কমিয়ে আনতে সমন্বয় করে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন।
উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ খবরের কাগজকে বলেন, ‘সাধারণ জনগণের দুর্ভোগ কমিয়ে আনতে আমরা সচেতনতার সঙ্গে কাজ করছি। ইতোমধ্যে জনসেবা-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্তদের নিয়ে বৈঠক-সভা করেছি। সামনের দিনগুলোতে যাতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ না হয়, সে বিষয়টিকে প্রধান্য দিয়ে কাজ হবে। আগের মতো কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আমরা হতে দেব না।’
এবার বর্ষা মৌসুমে কোনোভাবেই সড়ক খোঁড়া হবে না বলে জানান এই প্রশাসক। মোহাম্মদ এজাজ বলেন, উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন খোঁড়া সড়কগুলো মেরামত হয়ে গেছে। মিরপুরের দিকে দু-একটি সড়কের উন্নয়নকাজ হচ্ছে, সেগুলো চলতি মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। আগামী ৩০ তারিখের পর কোনোভাবেই সড়ক খুঁড়তে দেওয়া হবে না। খুব বেশি প্রয়োজন হলে সড়ক খোঁড়া হবে, তবে তা শর্ত সাপেক্ষে এবং নিদিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে।
ঢাকার প্রধান সায়েদাবাদ সড়ক, মিরপুর সড়ক, কল্যাণপুর, মোহাম্মদপুর, মানিকনগরের রাস্তাগুলোতে বছরজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ি চলে। সড়কের এমন ক্ষত-বিক্ষত করার প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় দুই সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, বিটিসিএল, বিপিডিসি, ইন্টারনেটসহ সেবাদানকরী প্রতিষ্ঠানগুলো। নগরবাসীর অভিযোগ, সরকারি-বেসরকারি এসব সংস্থার মধ্যে কোনো সমন্বয়ই নেই। ফলে এক প্রতিষ্ঠান রাস্তা খোঁড়ার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান তা মেরামত করে না। আর সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা শুধু সড়ক ক্ষত-বিক্ষত করার অনুমতি দিয়ে দেন। তা সঠিকভাবে যথাসময়ে মেরামতের দায়িত্ব আর তারা নিতে চান না।
সচেতন নাগরিকরা জানিয়েছেন, বেশির ভাগ সময় রাস্তা বন্ধ করে এই খোঁড়াখুঁড়ির প্রতিযোগিতা চালানো হয়। ফলে অন্য সড়কগুলোতে যানবাহনের চাপ বেশি পড়ে আর এতে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। দীর্ঘ ভোগান্তির পর সড়ক মেরামত হলেও ওই একই সড়কে অন্য প্রতিষ্ঠান এসে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করে। ফলে ভোগান্তি আর শেষ হয় না।
গত কয়েক মাসে সড়কে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে জনদুর্ভোগ ও দীর্ঘ যানজটের বিষয়টি অবশেষে নজরে আসে প্রশাসনের। গত ১২ মার্চ ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সদর দপ্তর গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে। সেখানে বলা হয়, রাজধানীতে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির আগে এখন থেকে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও ঠিকাদারদের ডিএমপির অনুমতি নিতে হবে।
এই শর্ত ভেঙে ঢাকা মহানগর এলাকায় যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটালে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কিছু সংস্থা বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দিনের বেলায় বিভিন্ন ইউটিলিটি সার্ভিসের কাজের জন্য রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করে থাকে, যা আবার মেরামত করতে অনেক সময় সাত-আট মাস লেগে যায়। প্রায় সব ক্ষেত্রে যানবাহন চলাচলের জন্য বিকল্প রাস্তা তৈরি না করেই খোঁড়াখুঁড়ি করা হয়। সব খোঁড়াখুঁড়ির ক্ষেত্রে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জায়গা কেটে ফেলা হয়।
এ ব্যাপারে ডিএমপি বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- ডিএমপির সদর দপ্তরের সম্মতি ছাড়া রাস্তা কাটাকাটি বা খোঁড়াখুঁড়ির কাজ শুরু না করা। সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টার মধ্যে কোনো রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কাজ না করা। এ ক্ষেত্রে রাতে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কাজ করে সকালে যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। রাস্তা কাটার আগে নিশ্চিত করতে হবে কাজ শুরু এবং শেষ করার সময় (অর্থাৎ কোন তারিখে কাজ শুরু এবং শেষ হবে তা) আগেই ঘোষণা করতে হবে এবং যথাসময় অবশ্যই কাজ শেষ করতে হবে।
রাজধানীর ধানমন্ডি, হাতিরপুল, মিরপুর রোডের দারুসসালাম, কল্যাণপুর, শ্যামলী ও ৬০ ফিট সড়ক এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে মহানগরের ব্যস্ততম এসব সড়কে দীর্ঘ যানজট তৈরি হচ্ছে।
রাজধানী থেকে বের হওয়ার পথে গাবতলীর রাস্তায় এখন চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। শ্যামলী থেকে টেকনিক্যাল পর্যন্ত পাইপলাইন বসানোর জন্য রাস্তা খোঁড়ার কারণে প্রশস্ত সড়কটি সরু হয়ে আছে। সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির উপকরণ রাস্তার ওপরই ফেলে রাখা হয়েছে। রাস্তা সরু হওয়ার কারণে গাড়ির গতি কমে যাচ্ছে, ফলে তীব্র যানজট তৈরি হচ্ছে প্রতিদিন।
রাস্তার এক পাশ দিয়ে যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা রাখা হলেও খুঁড়ে রাখা মাঁটি, রাস্তার ভাঙা অংশ এবং পাইপ রাখার কারণে বাকি অংশ দিয়ে যান চলাচল প্রায় কঠিন। উত্তরবঙ্গের দিকের দূরপাল্লার গাড়িগুলো ওই সড়ক দিয়ে চলাচল করে। এর ফলে সন্ধ্যার পর শ্যামলী থেকে গাবতলী পর্যন্ত দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় ধরে যানজটে বসে থাকতে না পেরে অনেক যানবাহন উল্টো দিকের রাস্তা ব্যবহার করছে।
ঢাকা দক্ষিণের মানিকনগর ওয়াসা রোড সড়কটি পুরোটাই ক্ষত-বিক্ষত করে রাখা হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের পাইপলাইন বসানোর কাজ চলছে পাঁচ থেকে ছয় মাস ধরে। এই দীর্ঘ সময় ধরে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে এলাকার বাসিন্দাদের। সড়কটির এমন হাল হয়েছে যে রিকশা চলাচল দূরের কথা, একজন মানুষের পক্ষেও স্বাভাবিকভাবে হাঁটা সম্ভব হয় না। অথচ ওই রাস্তার দুপাশেই আবাসিক এলাকা।
সায়েদাবাদ মোড় থেকে যাত্রাবাড়ীর দিকে যাওয়ার পথে উত্তর যাত্রাবাড়ী এলাকার সড়ক গর্তে ভরা। সায়েদাবাদের পাশে গোলাপবাগ মাঠের দক্ষিণ দিকের সড়কের অবস্থাও বেহাল। আর হানিফ ফ্লাইওভারের নিচের সড়কে রয়েছে বড় বড় গর্ত।
অবশ্য অব্যবস্থাপনার কারণে জনদুর্ভোগের কথা স্বীকার করেছেন দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মো. জিল্লুর রহমান। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে আপনারা (সাংবাদিকরা) আমাদের পরামর্শ দিতে পারেন। যদি সঠিক পরামর্শ কার্যত ভূমিকা রাখে, আমরা তা গ্রহণ করব।’
সেবাদানকারী তিনটি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, ‘জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট এসব প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন কাজে সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি করে। এ ক্ষেত্রে মাঝেমধ্যে সমন্বয় হয় না। এটা স্বীকার করতে অসুবিধা নেই। কিন্তু আমরা যখন অনুমতি দিয়ে থাকি তখন বলে দেওয়া হয়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে। কিন্তু এটি সব সময় হয়ে উঠে না, এটি আমাদের একটা ব্যর্থতা। তবে এবার আমরা সবার সঙ্গে বসে কথা বলেছি। সমন্বয়ের মাধ্যমে আমরা চেষ্টা করছি সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে।’