আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহায় বা কোরবানির ঈদে ঢাকাবাসীর পশুর চাহিদা মেটাতে রাজধানীতে ১৮টি অস্থায়ী পশুর হাট বসাচ্ছে উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। ইতোমধ্যে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দরপত্র আহ্বান করেছে সংস্থা দুটি। অন্য বছর পশুর হাটের সংখ্যা বেশি হলেও এবার জনগণের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে তিনটি হাট স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট। উত্তর সিটির আওতাধীন গাবতলীর পশুর হাটে টেন্ডারসংক্রান্ত ঝামেলা ও সরকারের বড় অঙ্কের আয় হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি থাকায় হাটটি নিজেরাই পরিচালনার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। এ ছাড়া বিগত বছরের দরপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি বছর পশুর হাটের সরকারি ইজারা মূল্য বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে।
এবারের ঈদুল আজহায় পশুর হাটে ক্রেতা ও বিক্রেতার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর পাশাপাশি মাঠে থাকবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা।
সার্বিক প্রস্তুতির বিষয়ে উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ খবরের কাগজকে বলেন, ‘এবারের কোরবানির ঈদে ক্রেতা ও বিক্রেতা নির্বিঘ্নে পশু কেনাবেচা করতে পারবেন। কোনো ধরনের টেন্ডারবাজি ও সিন্ডিকেট চলবে না। কোনো ধরনের জুলুম সহ্য করা হবে না। সেই লক্ষ্যে আমরা ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে কথা বলেছি। তারা মাঠে থাকবে। এর পাশাপাশি পুলিশ, র্যাব ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা মাঠে কাজ করবেন। চুরি-ছিনতাই মোকাবিলায় প্রতিটি পশুর হাটে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো থাকবে।’
গাবতলীর হাটের বিষয়ে এই প্রশাসক বলেন, ওই হাটের দরপত্র আহ্বান নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। তাই সিটি করপোরেশন নিজেই হাটটি পরিচালনা করবে। যদি সিটি করপোরেশন ভালো লাভে পরিচালনা করতে পারে, তাহলে আর হাট ইজারা দেওয়া হবে না। কোনো টেন্ডার আহ্বান করা হবে না। কাউকে চাঁদাবাজি-সন্ত্রাস করতে দেওয়া হবে না।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবারের কোরবানির ঈদে পশুর চাহিদা মেটাতে প্রথমে উত্তরে ১০টি ও দক্ষিণে ১১টি অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর সিদ্ধান্ত হয়। তবে হাইকোর্টের রায়ের কারণে তিনটি হাট স্থগিত হচ্ছে। বাকি হাটগুলোর ইজারা দেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
দরপত্র অনুযায়ী, উত্তর শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাবের খালি জায়গায় অস্থায়ী হাট বসাচ্ছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। ওই হাটের সরকারি ইজারা মূল্য ধরা হয়েছে ১ কোটি ৭৪ লাখ ৭২ হাজার ৩৩৪ টাকা। পরিচ্ছন্নতা ফি ৮ লাখ ৭৩ হাজার ৬১৭ টাকা। গত বছর এই হাটের ইজারা মূল্য ছিল ১ কোটি ৩০ লাখ টাকার বেশি।
পোস্তগোলা শ্মশানঘাটের পশ্চিম পাশে নদীর পাড়ে খালি জায়গার হাটে সরকারি ইজারা মূল্য ২ কোটি ৩৯ লাখ ৯৮ হাজার ২০০ টাকা। পরিচ্ছন্নতা ফি ১৩ লাখ ৪৯ হাজার ৯১০ টাকা। গত বছর এই হাটের ইজারা মূল্য ছিল ২ কোটি ২৪ লাখ।
দনিয়া কলেজের পূর্ব পাশে ও ছনটেক মহিলা মাদ্রাসার পূর্ব-পশ্চিমের খালি জায়গার সরকারি ইজারা মূল্য ৪ কোটি ৭২ লাখ ৫ হাজার ৬১১ টাকা। পরিচ্ছন্নতা ফি ২৩ লাখ ৬০ হাজার ২৮১ টাকা। আগেরবার এ হাটের মূল্য ছিল ৪ কোটি ১৮ লাখ টাকা।
সাদেক হোসেন খোকা মাঠের দক্ষিণ পাশের খালি জায়গা ও ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনাল অস্থায়ী হাটের সরকারি মূল্য ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৬৪ লাখ ১৫ হাজার ২৮০ টাকা। পরিচ্ছন্নতা ফি ২৩ লাখ ২০ হাজার ৭৬৪ টাকা। রহমতগঞ্জ ক্লাবের খালি জায়গা অস্থায়ী হাটের সরকারি মূল্য ধরা হয়েছে ৬২ লাখ ৬৭ হাজার ৭৪ টাকা। পরিচ্ছন্নতা ফি ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৩ হাজার ৫৪ টাকা। ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজি কলেজের পূর্ব পাশের খালি জায়গায় অস্থায়ী হাটের সরকারি মূল্য ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৯৪ লাখ ৫৭ হাজার ৪০০ টাকা। পরিচ্ছন্নতা ফি ২৪ লাখ ৭২ হাজার ৮৭০ টাকা। কমলাপুর সাদেক হোসেন খোকা কমিউনিটি সেন্টারের পূর্ব পাশের খালি জায়গা অস্থায়ী হাটের মূল্য ছিল ৩ কোটি ৭৫ লাখ ২৪ হাজার টাকা। পরিচ্ছন্নতা ফি ছিল ১৮ লাখ ৭৬ হাজার ২০০ টাকা। শ্যামপুর কদমতলী ট্রাক স্ট্যান্ডের খালি জায়গা অস্থায়ী হাটের সরকারি মূল্য ৬৬ লাখ ৯৬ হাজার ২০ টাকা। পরিচ্ছন্নতা ফি ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৮০১ টাকা।
এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১০টি অস্থায়ী হাটের মধ্যে ভাটারা সুতিভোলা খালসংলগ্ন খালি জায়গার সরকারি ইজারা মূল্য ৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। উত্তরা দিয়াবাড়ী ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টরসংলগ্ন বউবাজার এলাকার খালি জায়গা ৮ কোটি ৯০ লাখ। মোহাম্মদপুর বছিলার ৪০ ফুট রাস্তাসংলগ্ন খালি জায়গা ২ কোটি ২০ লাখ টাকা। ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসংলগ্ন খালি জায়গার ইজারা মূল্য ৬৪ লাখ ২ হাজার ৪০০ টাকা। খিলক্ষেত থানাধীন ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের মস্তুল চেকপোস্টসংলগ্ন পশ্চিম পাড়ার খালি জায়গা ১ কোটি ৭ হাজার ৫০০ টাকা।
মিরপুর-৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইস্টার্ন হাউজিংয়ের খালি জায়গা ১ কোটি ৩৮ লাখ ১৬ হাজার ৭৮৬ টাকা। ভাটুলিয়া সাহেব আলী মাদ্রাসা থেকে ১০ নম্বর সেক্টর রানাভোলা স্লুইসগেট পর্যন্ত খালি জায়গা ৮১ লাখ ২০ হাজার টাকা। মিরপুর কালশী বালুর মাঠের খালি জায়গা ৮০ লাখ টাকা। খিলক্ষেত বনরূপা আবাসিক এলাকার খালি জায়গা সরকারি ইজারা মূল্য ধরা হয়েছে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এদিকে প্রতিটি হাটে সরকারি মূল্যের ১০ শতাংশ পরিচ্ছন্নতা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।
হাইকোর্টের রায়ে স্থগিত হওয়া তিনটি হাটের মধ্যে রয়েছে আফতাবনগর (ইস্টার্ন হাউজিং) ব্লক, ই, এফ, জি, এইচ সেকশন-১ ও ২-এর খালি জায়গা। এ হাটের সরকারি মূল্য ধরা হয়েছে ১ কোটি ৪৯ লাখ ৩ হাজার ৬০০ টাকা। পরিচ্ছন্নতা ফি ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৪৫ হাজার ১৮০ টাকা। গত ৪ মে বিচারপতি কাজী জিনাত হক ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকার হাইকোর্ট বেঞ্চ এই হাট বসানোর ওপর স্থগিতাদেশ দেন।
মেরাদিয়া বাজারের পূর্ব পাশে খালপাড়ের খালি জায়গা অস্থায়ী পশুর হাটের সরকারি মূল্য ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৪ লাখ ৫৭ হাজার ৭২২ টাকা। পরিচ্ছন্নতা ফি ১৫ লাখ ২২ হাজার ৮৮৬ টাকা। হাইকোর্ট নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় মেরাদিয়ার পশুর হাট স্থগিত করা হয়েছে। গত ২৯ এপ্রিল বিচারপতি কাজী জিনাত হক ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকার দ্বৈত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
বাড্ডা ইস্টার্ন হাউজিং আফতাবনগরের এম-৪, এম-৫ ও এন-৪ ব্লক (লেকের উত্তর পাশে আংশিক), সানভ্যালির (আংশিক) খালি জায়গা ১ কোটি ৭৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা। গত সোমবার বিচারপতি কাজী জিনাত হক ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর ওপর রুলসহ স্থগিতাদেশ দেন।
উত্তর সিটির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা ফারজানা খানম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আসন্ন কোরবানির ঈদ উপলক্ষে এবার উত্তর সিটি করপোরেশনে ১০টি পশুর হাট বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সেই অনুযায়ী আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। দরপত্র আহ্বানও করা হয়েছে।’
বাড্ডা ইস্টার্ন হাউজিং হাটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘হাইকোর্ট স্থগিত করলে তো আমাদের কিছু করার নেই। তবে আমাদের কাছে এখনো রায়ের কপি আসেনি। জানিয়ে দেওয়া হবে।’
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি কর্মকর্তা কাইজার মোহাম্মদ ফারাবী খবরের কাগজকে বলেন, ‘সব কার্যক্রম চলছে, আমাদের প্রস্তুতিও ব্যাপক রয়েছে। দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। যারা শর্ত পূরণ করতে পারবেন, তারাই ইজারা পাবেন।’