অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে এখন বেশি রেমিট্যান্স আসছে। রপ্তানি আয়ও আসছে বেশি। আমদানি ব্যয়েও বেশি বাড়ছে না। এমন বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পরবর্তী অর্থছাড়ে অন্যতম শর্ত দিয়েছে ডলারের দর বাজারভিত্তিক করা।
এটা না করলে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির ঋণছাড়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এখনই ডলারের দর বাজারভিত্তিক করা সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দিয়েছে আইএমএফকে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, উপযুক্ত সময় এলে অবশ্যই ডলারের দর বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ মুদ্রা বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করবে কি না, তার ওপর নির্ভর করছে আইএমএফের কাছ থেকে ঋণের কিস্তি পাওয়ার বিষয়টি।
বাজারভিত্তিক করার মানে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি মুদ্রা টাকার মান কত হবে, তা ঠিক হবে বাজারে। তবে বাংলাদেশ এখনই মুদ্রার বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দিতে চায় না। এ নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে কয়েক দফায় সরাসরি এবং ভার্চুয়ালি বৈঠক হলেও এখন পর্যন্ত সমঝোতা হয়নি। তবে আলোচনা চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আশাবাদী।
বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, এখনই ডলারের দর বাজারভিত্তিক করা হলে মুদ্রাবাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। ডলারের দাম বেড়ে গেলে আমদানি পণ্যের দাম আরও বাড়বে। দেশে যেখানে এমনিতেই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি, তা আরও বেড়ে যেতে পারে। এ বিষয়টিই আইএমএফকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এমন বাস্তবতায় ডলারের দর এখনই বাজারভিত্তিক করা উচিত কি না, এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তাদের কেউ কেউ বলেছেন, এখনই ডলারের দর বাজারভিত্তিক করা উচিত। আবার কেউ কেউ বলছেন, বাজার যদি সঠিকভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে ডলারের দর অবশ্যই বাজারভিত্তিক হওয়া উচিত। যদিও আমাদের দেশের মুদ্রাবাজারে নানা রকম সমস্যা আছে। সামগ্রিকভাবে ডলারের দর বাজারভিত্তিক করার এখনই উপযুক্ত সময় নয়।
এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তাফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, বাজার যদি সঠিকভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে ডলারের দর বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে চাহিদা এবং জোগানের ভিত্তিতে দর নির্ধারিত হয়। এটাই উত্তম চর্চা। আইএমএফও হয়তো সেই জায়গা থেকেই ডলারের দর বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার প্রতি বেশি জোর দিয়েছে।
আইএমএফের পরামর্শ অবশ্যই ভালো, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- এখনই বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত হবে কি না? তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের বাজার যদি দক্ষ এবং ভালো হতো, তাহলে কোনো সমস্যা হতো না। কিন্তু আমাদের ডলারের বাজারে নানা রকম সমস্যা আছে।
এই মুহূর্তে যদি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে হঠাৎ করে ডলারের দাম অনেক বেশি বেড়ে গিয়ে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। এতে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হবে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আমাদের রেমিট্যান্স এবং রপ্তানি আয় বাড়লেও রিজার্ভ খুব বেশি বাড়ছে না। ১০ মাস ধরে আকুর দায় পরিশোধের পর রিজার্ভ ২০ বিলিয়নেই ঘোরাফেরা করছে। এটা খুব বেশি না। অর্থাৎ রিজার্ভকে এখনো স্বস্তিদায়ক একটা অবস্থায় নিয়ে যেতে পারিনি।
রেমিট্যান্স বাড়ছে। তবে সেটা কতদিন টেকসই হবে, বলা যাচ্ছে না। রপ্তানিতে ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, সেটাও অনিশ্চিত। ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কের প্রভাবে বিশ্ববাজারেও একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। এদিকে ভারত-পাকিস্তানে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, সেটাও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। সামগ্রিকভাবে ডলারের দর বাজারভিত্তিক করার এখনই সঠিক সময় নয়। আরও কিছুটা সময় দেখা উচিত। পরিস্থিতি যখন আমাদের নিয়ন্ত্রণে আসবে, তখনই ডলারের দর বাজারভিত্তিক করা উচিত। এখনই মনে হয়, সেই সঠিক সময় নয়।’
একই বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ডলারের দরকে বাজারের ওপর ছেড়ে না দিয়ে ধরে রাখা হয়েছিল। এ কারণে দেশের রিজার্ভের ক্ষয় হয়েছে, টাকার রেকর্ড অবমূল্যায়ন ঘটেছে, মূল্যস্ফীতি উসকে উঠেছে। ভুল নীতির কারণে দেশের মানুষ ও অর্থনীতি বিপদে পড়েছে। রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি না করে বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে সাময়িকভাবে দর বাড়ত। কিন্তু ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে দর সংশোধন হতো।
তিনি বলেন, ডলার দরকে বাজারভিত্তিক করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো আগের নীতিতেই রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো আগের নিয়মেই অর্থাৎ ক্রলিং পেগের মাধ্যমেই ডলারের দর নির্ধারণ করছে।
তিনি আরও বলেন, ডলারের দর এখন বাজারের ওপর ছেড়ে না দিলে আর কখন করা হবে? কারণ এখন লেনদেনের ভারসাম্য ভালো আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের দাম কমেছে, অন্যান্য পণ্যের দামও কমার দিকে, আমদানি চাহিদাও কম, তাই চাপ আসার শঙ্কা কম। তাই সব মিলিয়ে এখনই ডলারের দর বাজারভিত্তিক হওয়া উচিত। তবে ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কের প্রভাবে রপ্তানি খাতে বিরূপ প্রভাবের আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়টিকেও বিবেচনায় রাখতে হবে।
একই বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা এখনো চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক একটু সতর্কতা অবলম্বন করতে চাইছে। আইএমএফ কেবল ডলারের দর বাজারভিত্তিক নিয়ে গো ধরে আছে, এটা আমার কাছে খুব বেশি যুক্তিসংগত মনে হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে পরিস্থিতি আরও একটু দেখা দরকার। আর এখন যে দর, অর্থাৎ ১২২ টাকা আছে, সেটার আশেপাশেই হয়তো থাকবে। তার পরও কোনো ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। আমি ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থানকে সঠিক বলেই মনে করছি। আইএমএফের উচিত হবে বাংলাদেশ ব্যাংককে এই সময়টা দেওয়া।’
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে এই মুহূর্তে ডলারের দর বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে সেটা কোনদিকে যাবে তা বলা মুশকিল। বর্তমানে ডলারের বাজার অনেকটাই স্থিতিশীল হয়ে আসছে। আমাদের রেমিট্যান্স অনেক বেড়েছে, রপ্তানি আয়ও বেড়েছে। ফলে আমদানি দায় পরিশোধে আমাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তবে রপ্তানিতে ট্যারিফ নিয়ে একটা জটিলতা চলছে, যা এখনো শেষ হয়নি।
আগামী তিন মাস পর এই খাতে কী হবে, সেটা বলা মুশকিল। তাই ডলারের দর বাজারের ওপর ছাড়তে হলে ওই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এদিকে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে আবার যুদ্ধ। এই মুহূর্তে ডলারের দর বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হলে আবার টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন হতে পারে। আবার রিজার্ভও কমে যেতে পারে। আইএমএফের উচিত, ডলারের দর বাজারভিত্তিক করার ওপর কড়াকড়ি আরোপ না করে রাজস্ব বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া।’