রাজধানীতে এখন গলির রাস্তার পাশাপাশি প্রধান সড়কেও খোঁড়াখুঁড়ি করে উন্নয়নের কাজ চলছে। কোনো নিয়ম না মেনেই দিনের পর দিন চলছে এসব কাজ। বিকল্প ব্যবস্থা না রেখে সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির ফলে একদিকে জনদুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কয়েক মাস বেশি সময় অপচয় হচ্ছে দেশের সেবা সংস্থাগুলোর।
রাজধানী থেকে উত্তরবঙ্গগামী যানবাহনের জন্য প্রধান রাস্তা গাবতলীর সড়কটি। ঢাকার অভ্যন্তরীণ যানবাহন চলার পাশাপাশি দূরপাল্লার গাড়ি চলে এই সড়ক দিয়ে। সেই রাস্তার (পশ্চিম পাশে) শ্যামলী থেকে টেকনিক্যাল পর্যন্ত কেটে ফেলায় সড়কের প্রস্থ কমে গেছে।
খোঁড়াখুঁড়ি করে বৈদ্যুতিক লাইনের কাজ চালাচ্ছে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো)। সংস্থাটির কাজ ধীরগতিতে চলায় গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে প্রতিদিনই লেগে থাকছে যানজট। সড়কের কিছু স্থান ফুটপাতসহ কেটে ফেলা হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে সাধারণ মানুষ রাস্তার অবশিষ্ট অংশ দিয়ে হাঁটাচলা করছেন। বিকল্প ব্যবস্থা না রাখায় চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন পথচারীরা।
সরেজমিন দেখা যায়, শ্যামলী স্পেশালাইজড হাসপাতাল থেকে টেকনিক্যাল মোড় পর্যন্ত চতুর্মুখী যানজট লেগে আছে। কারণ গাবতলীমুখী রাস্তাটির একাংশ খোঁড়াখুঁড়ির ফলে প্রশস্ত সড়কটি সরু হয়ে গেছে। আবার খোঁড়া সড়কেই রাখা হয়েছে মাটি, ইটের কণা, বালি, পাইপ, মাটি খোঁড়া ও সড়ক নির্মাণসামগ্রী। সন্ধ্যার পর সড়কটিতে চলা দূরপাল্লার বাস-ট্রাক-লরিগুলোর চাপ বাড়তে থাকে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে অন্যান্য যানবাহন। সরু রাস্তায় গাড়ি ধীরগতিতে চলাচলের কারণে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। ফলে এটুকু রাস্তা ৫ মিনিটে পার হওয়ার কথা থাকলেও যানবাহনের চাপে সময় লাগছে প্রায় ১ ঘণ্টা। বিগত দেড় মাসের বেশি সময় ধরে এই সড়কে এমন অবস্থা চলছে।
রাজধানী থেকে নাটোরের উদ্দেশে গাড়ি চালাচ্ছিলেন হানিফ পরিবহনের চালক মোহাম্মদ শরিফ। শ্যামলীর পরে এক স্থানে বসে আছেন ২০ মিনিট। বিরক্ত প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমরা সন্ধ্যার পর ঢাকা থেকে বের হই। কোথাও কোনো যানজট না থাকলেও টেকনিক্যালের দিকে এলেই জ্যাম শুরু হয়। এটুকু রাস্তা পর হতে লাগে ১ ঘণ্টার মতো। এই গরমে এক জায়গায় বসে থাকলে শরীর মানে না।’
ফুটপাত কেটে ফেলায় বাধ্য হয়ে শ্যামলীর স্পেশালাইজড হাসপাতালের সামনের সড়ক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন এক নার্স। তিনি বলেন, এখানে হাঁটার কোনো জায়গা রাখেনি। রাস্তায় ধুলোবালি মুখে নিয়েই প্রতিদিন চলাচল করতে হচ্ছে। আর কতদিন এভাবে চলবে কে জানে! কেউ কিছু বলেও না। কষ্ট তো হয় সাধারণ মানুষের। দেখার তো কেউ নেই।
কাজে ধীরগতির কারণ জানতে চাইলে উপস্থিত এক নির্মাণকর্মী বলেন, ‘এটি বিদ্যুৎ লাইনের বড় কাজ। সে তুলনায় লোকবল কম। আর বিদ্যুতের কাজ চলা অবস্থায় চাইলেও সড়ক মেরামত করা যায় না। কারণ রাস্তা খোঁড়া অবস্থায় রেখে বারবার লাইন টেস্ট করতে হয়। রাস্তা মেরামত করে লাইন টেস্ট করলে কোথাও খারাপ লাইন ধরা পড়লে আবার রাস্তা খোঁড়া লাগে। তাই বারবার না খুঁড়ে আগে বিদ্যুতের লাইনের কাজ শেষ করে সড়ক ঠিক করতে হয়।’
একই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে আদাবরের বাসিন্দাদের। শ্যামলী রিং রোডের এই সড়কটির মাধ্যমে মোহাম্মদপুর, ঢাকা উদ্যান, চাঁদ উদ্যান, বসিলা, কেরানীগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের সহজ রাস্তা এটি। আদাবরের এমন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক খুঁড়ে বৈদ্যুতিক লাইন বসাচ্ছে ডেসকো। এই কাজও ধীরগতিতে চলছে। কয়েকটি স্থানে লাইনের কাজ শেষে সিটি করপোরেশন রাস্তাটি মেরামত করলেও আদবর থানার সামনে থেকে শিয়া মসজিদের দিকে বিভিন্ন স্থানে এখনো খোঁড়া অবস্থায় পড়ে আছে। আর ভাঙা সড়কে ধুলোবালির আবরণ পড়ে আছে আশপাশের বসতবাড়িতে। নিতান্ত বাধ্য হয়েই প্রতিদিন এই পথে আসা-যাওয়া করছেন কর্মজীবী, শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।
সড়কে কাজ করা শ্রমিকরা জানান, রাস্তা সংস্কার করতে আরও এক থেকে দুই মাস সময় লাগতে পারে।
ঢাকা মহানগর উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৫-এর আওতাধীন আদাবর ও শ্যামলীর (ইউটান পর্যন্ত) একাংশ পড়েছে। সড়কের এমন বেহাল অবস্থার বিষয়ে জানতে এই অঞ্চলের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার (উপসচিব) দায়িত্বে রয়েছেন আ ন ম বদরুদ্দোজা। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই দুটি সড়কে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো) কাজ করছে। সিটি করপোরেশন থেকে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। আমরা দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য বারবার তাগাদা দিচ্ছি। এখানে তারা (ডেসকো) দেরি করছে। আমি নতুন এসেছি। এখনো বিস্তারিত জানি না।’
শ্যামলীর পর টেকনিক্যাল এলাকাটি উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৪-এর আওতায় পড়েছে। অঞ্চলটির আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার (উপসচিব) দায়িত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ডেসকোর কাজ চলমান থাকায় গাবতলীর সড়কের এই অবস্থা হয়েছে। তাদের কাজে ধীরগতি হচ্ছে। সিটি করপোরেশন থেকে দ্রুত কাজ শেষ করতে প্রেশার দেওয়া হয়েছে। আপনারাও দিতে পারেন, যাতে কাজ দ্রুত শেষ হয়।
সিফাত/