ঝিনাইদহ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যার কারণ উদঘাটন করতে পারেনি বাংলাদেশ ও ভারতের কোনো তদন্ত সংস্থা। গত বছরের ১৩ মে কলকাতায় খুন হন সাবেক এমপি আনার। বহুল আলোচিত ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতে এবং বাংলাদেশে আলাদা দুটি মামলা হয়। তবে ঘটনার পর এক বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই এই হত্যাকাণ্ডের স্পষ্ট কারণ বের করতে পারেনি।
ঢাকার আদালত সূত্রে জানা গেছে, আনোয়ারুল আজীম আনারকে কলকাতায় হত্যার উদ্দেশ্যে গুম করার মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ আগামী ২৭ মে ধার্য করা হয়েছে। গত ২১ এপ্রিল আদালত এই আদেশ দেন। ওই দিন মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য ছিল। তবে ওই দিন মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) প্রতিবেদন দাখিল করেনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এম এ আজহারুল ইসলাম প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নতুন দিন ধার্য করে আদেশ দেন।
একবছরেও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা না দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিত জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের প্রধান পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী গতকাল সোমবার রাতে দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, খুন হওয়া এমপি আনার এবং তাকে যারা খুন করেছে, তারা সবাই তো তৎকালীন সরকারি দল আওয়ামী লীগের লোক। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় খুনিরা পার পেয়ে যাচ্ছিল। ফলে পুলিশ প্রতিবেদন দিতে পারেনি।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও ৯ মাস পেরিয়ে গেছে মনে করিয়ে দিলে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর ঢাকায় পুলিশে ব্যাপক রদবদল হয়েছে। ১-২ মাস মাত্র, পুলিশে স্বাভাবিকতা এসেছে। আশা করি, এখন প্রতিবেদন জমা দিতে পারবে পুলিশ। তা ছাড়া আমরাও প্রসিকিউশন থেকে বিষয়টি ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করব।
এদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, সাবেক সংসদ সদস্য আনার হত্যা মামলার তদন্তভার পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) হস্তান্তর করা হয়েছে। ডিবির তদন্তের অগ্রগতি ও মামলার ডকেট এখন হস্তান্তর প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এই মামলাটি এখন সিআইডি তদন্ত করবে।
ডিবি পুলিশ এই মামলায় এ পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে। এই সাতজন হলেন- সৈয়দ আমানুল্লাহ আমান ওরফে শিমুল ভূঁইয়া, ফয়সাল আলী সাজী ওরফে তানভীর ভূঁইয়া, শিলাস্তি রহমান, ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু, ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক কাজী কামাল আহমেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবু, মোস্তাফিজুর রহমান ও ফয়সাল আলী। তারা বর্তমানে কারাগারে আছেন। এই সাতজনের মধ্যে সাইদুল করিম মিন্টু ছাড়া বাকি ছয়জনই আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
এদিকে, ২০২৪ সালের ২০ ডিসেম্বর জানা গেছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনায় উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষ আনোয়ারুল আজীমেরই। প্রয়াতের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস (ডরিন) এর আগের মাসে কলকাতায় গিয়ে ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (ডিএনএ) নমুনা পুলিশকে দিয়েছিলেন। দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বরাত দিয়ে তখন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল- ডিএনএ বিশ্লেষণ করেই জানা গেছে উদ্ধারকৃত খণ্ডবিখণ্ড লাশ আনোয়ারুল আজীমেরই। কলকাতার সেন্ট্রাল ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে ডরিনের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার পরে জানা গেছে, দেহাবশেষ প্রয়াত সংসদ সদস্য আনারেরই।
২০২৪ সালের ১২ মে ভারতে যান তৎকালীন সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম। সেখানে তিনি পূর্বপরিচিত গোপাল বিশ্বাসের পশ্চিমবঙ্গের বরানগরের বাড়িতে ওঠেন। চিকিৎসা করাতে যাবেন বলে পরের দিন ১৩ মে গোপালের বাড়ি থেকে বের হন তিনি।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, ওই দিন রাতেই নিউটাউনের সঞ্জীবা গার্ডেনের বহুতল আবাসনের ‘বিইউ-৫৬’ ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটে তাকে হত্যা করা হয়। মামলার তদন্ত করে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানতে পারে, বাংলাদেশের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের মধ্যে স্বর্ণপাচারসহ আইনবহির্ভূত একাধিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশি নাগরিক সিয়াম হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ভারতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানতে পারে যে, আনোয়ারুল আজীমকে খুন করে, তার দেহ খণ্ডখণ্ড করে তা নষ্ট করার কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি। দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়া আরেক অভিযুক্ত ‘কসাই’ জিহাদ ধারালো অস্ত্র দিয়ে আনোয়ারুলের শরীর থেকে মাংস আলাদা করে প্লাস্টিকের বড় ব্যাগে ঢোকান। লাশের টুকরো পরে একটি খাল এলাকায় ফেলা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরে ওই খালসংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু হাড় উদ্ধার করে। সেগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়।
এ ছাড়া বহুতল আবাসন সঞ্জীবা গার্ডেনের সেপটিক ট্যাংক থেকেও প্রায় ৪ কেজি পচা মাংস উদ্ধার করে তা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় সেন্ট্রাল ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে। দেহের সেসব অংশের সঙ্গে তার কন্যার ডিএনএ মিলিয়ে দেখা হয়।
এদিকে গত বছরের আগস্টে উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাত জেলা আদালতে প্রায় ১২০০ পাতার চার্জশিট জমা দেওয়া হয়। এতে তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি সাবেক এমপি আনার হত্যার ঘটনায় অন্যতম দুই আসামি কসাই জিহাদ হাওলাদার ও মোহাম্মদ সিয়ামকে অভিযুক্ত করেছে। একই সঙ্গে হত্যা করার আগে এবং পরে আনারের লাশ নিয়ে তারা যা করেছে, তার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে চার্জশিটে। তবে চার্জশিটে হত্যার কারণ সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা।