মঙ্গলবার (১৩ মে) বেলা সাড়ে ১১টা। আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের গেটে দেখা যায় একটি ব্যানার। সেখানে লেখা আছে- ‘চিহ্নিত এই দালালসহ অন্য প্রতারকদের থেকে সতর্ক থাকুন।’ ওই ব্যানারে চারজনের ছবি। ব্যানারটির ওপরে আরও ১৮ জনের ছবি সংবলিত একটি ল্যামিনেশন করা কাগজ লাগানো। গেটের বাইরে-ভেতরে আনসার সদস্যদের প্রহরা ।
গেটের ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায়, ভবনের নিচতলার বাইরে সারিবদ্ধ বেঞ্চে অসংখ্য সেবাপ্রত্যাশী বসে আছেন। ভেতরে এগিয়ে গেলে দেখা যায় ১০০ নম্বর কক্ষ। সেখানে একটি সাইনবোর্ডে লেখা- ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা/বয়স্ক/অসুস্থ/প্রতিবন্ধী/শিশু বায়োএনরোলমেন্ট’। ওই কাউন্টারের সামনে নারী সেবাপ্রত্যাশীরা লাইনে দাঁড়িয়ে ও বসে ছিলেন।
ওই কাউন্টারে থাকা পাসপোর্ট কর্মকর্তাকে উত্তেজিত হয়ে কথা বলতে দেখা যায়। সেখানে থাকা কয়েকজন গ্রাহক অভিযোগ করেন, ‘আমার সব ধরনের কাগজ আবেদনপত্রে যুক্ত করে দেওয়া হলেও পাসপোর্ট কর্মকর্তা তা জমা নিচ্ছেন না। কিছু বলছেনও না। এতে কয়েক দিন ধরেই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে চেয়ারে বসে আবেদনপত্রের কাগজপত্র গোছাচ্ছিলেন রফিক আহমেদ (ছদ্মনাম)। তিনি রাজধানীর উত্তরখানের চামুরখান এলাকা থেকে এসেছেন। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি গত ৭ মে আমার ছেলে ও স্ত্রীর পাসপোর্টের জন্য আবেদনপত্র জমা দিতে এসেছিলাম। ওই দিন আমাদের দুজনের জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মনিবন্ধন সনদ যাচাই করতে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পারিনি। পর দিন এসেছিলাম, আরও কাগজ লাগবে বলে ওই দিন জানানো হয়। এরপর তিন দিন সরকারি ছুটি। গত সোমবার এসেছিলাম। আমার ছেলের ফর্ম জমা দিয়েছি, তার ছবি ও বায়োমেট্রিক সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু আমার স্ত্রীর আবেদনপত্র জমা নিচ্ছে না। পাসপোর্ট কর্মকর্তা বলেছেন- নামজারি, বাড়ির ট্যাক্স পেপার লাগবে। পরে আমি সেগুলো দিয়েছি। এসব দেখে তিনি বলেন, হবে না। আমি তাকে বললাম কেন হবে না? পরে তিনি জানান- ‘বায়া দলিল’ (জমির মূল বা আদি দলিল) লাগবে। আজ আমি এগুলোও নিয়ে এসেছি।’
তিনি বলেন, ‘দালালদের দৌরাত্ম্য নেই ঠিকই,এখন পাসপোর্ট করতে হলে অনেক ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। কেন হবে না জানতে চাইলেই কর্মকর্তা উত্তেজিত হয়ে যান।’
এদিকে গ্রাহকরা বলছেন, আগে পুলিশ ভেরিফিকেশন ছিল। তখন পাসপোর্ট অফিসের কাজ এত জটিল ছিল না। কিন্তু এখন পাসপোর্ট অফিসে অনেক জটিলতা। আবার অনেকের জন্য এখানে জটিলতা নেই। কারণ এখানকার কিছু কর্মকর্তা নিজেদের লোক বলে কক্ষের ভেতরে নিয়ে আবেদন ফর্ম জমা নিচ্ছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের বেলায় সেটি হচ্ছে না।
পাসপোর্ট অফিস ভবনের নিচতলায় গিয়ে দেখা যায় পাশাপাশি ১০৬ ও ১০৮ নম্বর কাউন্টার, আর সামনে অসংখ্য মানুষের ভিড়। ভেতরে নিরাপত্তা ও সিরিয়াল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে ছিল ৫ জন আনসার সদস্য।
যারা নতুন পাসপোর্টের আবেদনপত্র নিয়ে এসেছেন, তাদের প্রথমে ১০৮ নম্বর কাউন্টার থেকে টোকেন নিতে হচ্ছে। সেখানে প্রথমে জাতীয় পরিচয়পত্র ভেরিফিকেশন করা হচ্ছে এবং ওই টোকেন নিয়ে তাদের অন্য সিরিয়ালে বসানো হচ্ছে। ১০৬ নম্বর কাউন্টারে একজন একজন করে আবেদনপত্র যাচাই করা হচ্ছিল। সেখানেও কাগজে ঘাটতি থাকলে আবেদনপত্র ফিরিয়ে দেওয়া হয় এবং যাদেরটা রাখা হচ্ছিল, তাদের বায়োএনরোলমেন্টের জন্য তারিখ দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার বেলা পৌনে ৩টার দিকেও এই সিরিয়াল অনেক দীর্ঘ ছিল। এরপর ভবনের পাঁচতলায় ৫০৩ ও ৫০৫ নম্বর কাউন্টারে পুরুষ এবং চতুর্থ তলার ৪০৪ ও ৪০৫ নম্বর কাউন্টারে নারীদের বায়োএনরোলমেন্ট সংগ্রহ চলছিল। সেখানেও লাইন দেখা গেছে।
ধানমন্ডি ১৫ নম্বর থেকে এসেছেন মো. রাসেল। তিনি বলেন, ‘গতকাল (সোমবার) ঢাকা পশ্চিম (মোহাম্মদপুর) পাসপোর্ট অফিস থেকে আবেদন করেছিলাম। আমার বড় ভাই আবেদনটি করে দেন। আজ (মঙ্গলবার) পাসপোর্ট ডেলিভারি দেওয়ার কথা রয়েছে। তাই নিতে এসেছি। আমি ১১৩ নম্বর কাউন্টার থেকে টোকেন নিয়ে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু কাউন্টারে দুপুর ২টার পর যেতে বলা হয়েছে। পেলে আলহামদুলিল্লাহ। নয়তো আবার আসতে হবে।’
এদিকে রাব্বি নামে আরেকজন বলেন, ‘তার আবেদনপত্র জমা দিতে ১৫ হাজার টাকা লেগেছিল। গতকাল (সোমবার) তার আবেদনপত্র উত্তরা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে জমা দেওয়া হয়েছিল। আজ (মঙ্গলবার) তাকেও পাসপোর্ট ডেলিভারি দেওয়ার কথা। তাই তাকে আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে আসতে বলেন তার এক বড় ভাই।
ফরিদপুরের রাজবাড়ী জেলা থেকে মো. কাউসার নামের এক যুবক তার বাবার সঙ্গে আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে এসেছেন।
তিনি বলেন, ‘সোমবার ইমার্জেন্সি ক্যাটাগরিতে রাজবাড়ী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে আবেদন করেছি। সরকারি ফি লেগেছে ১৩ হাজার ৫০০ টাকা। আজ (মঙ্গলবার) ডেলিভারি দিবে আগারগাঁও থেকে, তাই ভোরে বাসে করে রাজবাড়ী থেকে এখানে এসেছি। এখন যদি আজ না পাওয়া যায় তবে কষ্ট করে আবার আসতে হবে। কারণ ঢাকায় আমাদের কোনো আত্মীয় থাকে না। তাই থাকার জায়গা নেই।’
নারীদের জন্য আলাদা কাউন্টারের ব্যবস্থা থাকলেও সেখানেও ভিড় ছিল অনেক। এদিকে পাসপোর্ট অফিস ভবনের গেটে দায়িত্বরত আনসার সদস্য মো. সুজন খবরের কাগজকে বলেন, ‘দালালের প্রকোপ যাতে দেখা না দেয়, তাই আমাদের ১০ থেকে ১২ জন আনসার সদস্য বাইরে নিরাপত্তায় রাখা হয়। এ ছাড়াও এখানে অহেতুক দাঁড়িয়ে থাকা যানবাহনও আমরা নিয়ন্ত্রণে আনার কাজ করছি।’
গেটের বাইরে দালাল চক্রের সদস্যদের উৎপাত দেখা না গেলেও আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিস থেকে একটু এগিয়ে মূল সড়কে দেখা যায় ছাতার নিচে অসংখ্য ভাসমান ফটোকপি ও কম্পিউটারের দোকান। তারা বসে আছেন, পথচারীদের কেউ ওই ফুটপাত ধরে গেলেই ডেকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে- ‘পাসপোর্টের কোনো কাজ আছে নাকি?’ তারা পাসপোর্টসংক্রান্ত কাজগুলো করেন বলে জানিয়েছেন দায়িত্বরত আনসার সদস্যরা।