জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করে রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে দুটি বিভাগ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা। তবে রাতের আঁধারে অধ্যাদেশ জারি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা। এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দুই বিভাগের যাত্রা শুরু করার পরামর্শ দিয়ে বিশ্লেষকরা বলেছেন, না হলে এ পদক্ষেপে সুফল মিলবে না।
রাষ্ট্রপতির ৭৬ নম্বর অধ্যাদেশের মাধ্যমে ১৯৭২ সালে এনবিআর প্রতিষ্ঠিত হয়। গতকাল ৫৩ বছর পর রাষ্ট্রপতির আরেক অধ্যাদেশ জারি করে তা দুই ভাগ করা হলো। বর্তমান সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, ‘৫০ বছরেরও বেশি সময় আগে প্রতিষ্ঠিত এনবিআর ধারাবাহিকভাবে তার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৭.৪ শতাংশ, যা এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম। বিশ্বব্যাপী এ অনুপাত গড়ে ১৬.৬ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় এ অনুপাত ১১.৬ শতাংশ। জনগণের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বাংলাদেশকে অবশ্যই কর-জিডিপি অনুপাত কমপক্ষে ১০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য এনবিআর পুনর্গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। করনীতি প্রণয়ন এবং তা কার্যকর করার জন্য একটি একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেওয়া উচিত নয়- এই ধরনের ব্যবস্থা স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি করে। এটি ধীরগতিসম্পন্ন ও অদক্ষতা বাড়ায়। বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে আসছেন, বিদ্যমান নীতিমালাগুলো প্রায়ই ন্যায্যতা, প্রবৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার চেয়ে রাজস্ব সংগ্রহকে অগ্রাধিকার দেয়।’
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) নতুন সভাপতি হয়েছেন ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ। তিনি খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘এনবিআর নীতিনির্ধারণ এবং নীতি বাস্তবায়ন এই দুই ভাগে ভাগ করার সরকারি সিদ্ধান্তকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। এটি আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, যার বাস্তবায়নে দেশের রাজস্ব প্রশাসনে এক নতুন যুগের সূচনা ঘটাবে।’
তিনি আরও বলেন, নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন এই দুটি কাজ আলাদা করার মাধ্যমে একদিকে যেমন নীতি প্রণয়ন আরও স্বচ্ছ, সময়োপযোগী ও গবেষণাভিত্তিক হবে, অন্যদিকে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াও আরও অধিক কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার সুযোগ তৈরি হলো। এতে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি হবে এবং করদাতাদের সেবার মান উন্নত হবে।
ব্যবসায়ী এই নেতা আরও বলেন, এই সংস্কার উদ্যোগের ফলে রাজস্ব আহরণে দক্ষতা বাড়বে, করের আওতা বৃদ্ধি পাবে এবং কর প্রশাসনের প্রতি করদাতাদের আস্থা দৃঢ় হবে। এর ফলে সরকারের রাজস্ব লক্ষ্য পূরণ যেমন সহজ হবে, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমবে। কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার নীতি প্রণয়নের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে।
ব্যবসায়ী এই নেতা স্বাগত জানালেও খুশি নন এনবিআরসংশ্লিষ্টরা। সরকারের এ সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধিতা করে তারা এ অধ্যাদেশ সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন। সংশোধন করা না হলে বড় আন্দোলনের ঘোষণাও দিয়েছেন। এনবিআর কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ‘৫৩ বছর ধরে সরকারের রাজস্বের প্রধান জোগানদাতা সংস্থা এনবিআর বিলুপ্ত করে দেওয়া হচ্ছে, অথচ এ নিয়ে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করা হলো না কেন?’
বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) বিভিন্ন দাতা সংস্থা থেকেও এনবিআর বিলুপ্ত করে নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করার সুপারিশ করেছে। গত বছরের ৫ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর রাজস্ব সংস্কার কমিশন গঠন করেন। এই কমিশন থেকেও একই প্রস্তাব করা হয়। তবে প্রস্তাবে এই দুই বিভাগের প্রধান হিসাবে যোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হলেও অধ্যাদেশে প্রশাসন বিভাগ থেকেও নিয়োগ দেওয়ার কথা স্পষ্ট করা হয়েছে। এখানেই আপত্তি করেছেন এনবিআরের কর্মকর্তারা।
এনবিআরের সাবেক সদস্য ও রাজস্ব সংস্কার কমিশনের সদস্য ফরিদ উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, বহু দিন ধরে এনবিআরের বাইরে থেকে প্রধান পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে রাজস্ব খাতের গতি যেমন আসার কথা ছিল তা আসেনি বলে অনেকে অভিযোগ করেছেন। আমরা যে সংস্কার প্রস্তাব করেছি সেখানে রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে যিনি যোগ্য তাকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলছি। অধ্যাদেশে এই প্রস্তাব অন্যভাবে আনা হয়েছে।
রাজস্ব সংস্কার কমিশনের আরেক সদস্য ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘আমরা সংস্কার কমিশন থেকে যেসব প্রস্তাব করেছি তার সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হলে রাজস্ব আদায়ের সুফল পড়বে। রাজস্ব খাতে দুর্নীতি কমবে। অধ্যাদেশে আমাদের প্রস্তাবের বেশির ভাগই এসেছে। অনেকে অভিযোগ করছেন সবটা আসেনি। এদিকে এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অধ্যাদেশ ঘিরে আন্দোলন করছেন। এনবিআর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়েই অধ্যাদেশ বাস্তবায়ন করতে হবে। না হলে সংস্কারের সুফল পাওয়া কঠিন হবে।’
অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, ‘সিপিডি থেকে অনেক দিন ধরেই এনবিআর বিলুপ্ত করে নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করার পরার্মশ দিয়ে আসছি। এতে দেশের রাজস্ব আদায় কার্যক্রম গতিশীল হবে। রাজস্ব আদায় বাড়বে। তবে রাতের আঁধারে অধ্যাদেশ জারি কেন করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এ অধ্যাদেশ জারি করা উচিত ছিল। যাদের দিয়ে কাজ করাতে হবে তাদের অসন্তুষ্ট করে তো আর কোনো ভালো কিছু করা যাবে না।’
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান খবরের কাগজকে বলেন, এনবিআর ভেঙে দুটি নতুন বিভাগ- রাজস্বনীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ গঠনের সিদ্ধান্ত সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এই সংস্কারের ফলে বাংলাদেশের কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণ, রাজস্ব বৃদ্ধি ও ব্যবস্থাপনা আরও দক্ষ হবে- এমন সম্ভাবনা আছে।
তিনি আরও বলেন, ‘এই সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে এরই মধ্যে বিরোধিতা দেখা যাচ্ছে। কিছু শুল্ক ও আয়কর কর্মকর্তা নতুন আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রশাসনিক ক্যাডার কর্মকর্তাদের নিয়োগের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। এই প্রতিরোধ নতুন নয়। আমি বলব, সব সমস্যার সমাধান আছে। তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করুন। তবে সংস্কার বন্ধ করে না।’
অধ্যাদেশে যা আছে
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত বিদ্যমান কাঠামো পুনর্গঠনপূর্বক রাজস্বনীতি বিভাগ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ নামে দুটি পৃথক বিভাগ করা হয়েছে। দুই বিভাগের প্রধান হিসেবে সচিব পদের একজন করে কর্মরত থাকবেন। রাজস্বনীতি বিভাগ থেকে রাজস্বনীতি, বিধি-বিধান, প্রজ্ঞাপন, প্রণয়ন, সংশোধন এবং এসবের ব্যাখ্যা প্রদান করবেন। স্ট্যাম্প ডিউটি, আয়কর, ভ্রমণ কর, দান কর, সম্পদ কর, কাস্টমস শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (মূসক), সম্পূরক শুল্ক, আবগারি শুদ্ধ, সারচার্জ এবং অন্যান্য শুদ্ধ-করাদি, ফি আরোপ, হ্রাস বৃদ্ধি ও অব্যাহতি প্রদানসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ সমন্বিত অটোমেশন কার্যক্রম, কর আইন প্রয়োগ এবং কর আহরণ পরিস্থিতি মূল্যায়ন, রাজস্বনীতি বাস্তবায়ন বিষয়ে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করবেন। আন্তর্জাতিক দ্বৈত কর পরিহার চুক্তিসংক্রান্ত কার্যক্রম, রাজস্বসংক্রান্ত বৈশ্বিক ও স্থানীয় প্রেক্ষাপট ও পরিসংখ্যান বিচার-বিশ্লেষণ এবং করনীতিসংক্রান্ত গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনাও করবে।