আগামী অর্থবছরের বাজেটে সরকারের আয় বাড়াতে গিয়ে প্রায় ৩০০ খাতে নতুন করে কর আরোপ করা হচ্ছে। প্রচলিত-অপ্রচলিত শতাধিক খাতে শুল্ক, কর ও ভ্যাট বাড়ানো হচ্ছে বলে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর এরই মধ্যে বেশ কিছু পণ্যে বাড়তি ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আরোপ করে। তখন থেকে সেগুলো কমানোর জোরালো দাবি জানানো হলেও তা বাজেটে বহাল রাখা হচ্ছে। সরকারের নেওয়া এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে আগামী অর্থবছরে জিনিসপত্রের দাম আরও এক ধাপ বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, সরকারের আয় বাড়াতে গিয়ে এখন যেখানে রাজস্ব নেই বিশেষভাবে নিত্যপণ্য, সাধারণ মানুষের বেশি ব্যবহৃত পণ্যসহ শিল্প খাতে- নতুন রাজস্ব (শুল্ক, কর ও ভ্যাট) আরোপ করা হলে বা বাড়ালে কিংবা এরই মধ্যে আরোপিত উচ্চ হারের রাজস্ব বহাল রাখা হলে জনজীবনে খরচ বাড়বে। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। এক কথায় বলা যায়, মূল্যস্ফীতি উসকে দেওয়া হবে। সুতরাং সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে হলে রাজস্বের ভার না বাড়িয়ে সরকারকে অন্যভাবে আয় বাড়াতে হবে।
এ বিষয়ে প্রণীত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বলা যায়, তৈরি পোশাক খাতে আরোপিত কর হার ৮ থেকে ১০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এ খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল তুলা এবং মানবসৃষ্ট তন্তুর ওপরও নতুন করে অগ্রিম কর আরোপ করা হচ্ছে। এসব কারণে তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন খরচ বাড়বে। পোশাক খাতের সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মো. হাতেম খবরের কাগজকে বলেন, আমাদের দেশের তৈরি পোশাক খাতের বিভিন্ন কারখানাতে উৎপাদিত কাপড়ের বড় অংশ দেশের বাজারে বিক্রি হয়। এ সবই সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে। উৎপাদন খরচ বাড়লে এসব পণ্যের দামও বাড়বে।
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেট ঘোষণার পরেই পণ্যের দাম বাড়ে। অন্যদিকে ১ জুলাই থেকে অর্থাৎ নতুন অর্থবছরের শুরু থেকে বাজেটের ঘোষণা অনুযায়ী দাম কমে। আগামী বাজেটে নিত্যপণ্যের ওপর অগ্রিম কর আরোপ করা হলে নিশ্চিতভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। এতে সাধারণ মানুষ বিপাকে পড়বে।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু খবরের কাগজকে বলেন, অগ্রিম কর হলো যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করা হবে তার কর কত হবে তা মোটা দাগে হিসাব করে আমদানির আগেই সরকারের কোষাগারে অগ্রিম জমা দিতে হয়। এতে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ পড়ে যায়। রাজস্ব আইন অনুসারে পাওনা পরিশোধের পর অগ্রিম করের বাকিটা ফেরত দেওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের দেশে তা হয় না বলেই চলে। পরের চালানের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। আমাদের দেশের বেশির ভাগ ব্যবসায়ী পুঁজিসংকটে থাকেন। বাধ্য হয়েই ভোক্তার কাছ থেকে অগ্রিম কর পণ্যের দামের সঙ্গে যোগ করে আদায় করে থাকেন। এত বেশিসংখ্যক পণ্যে বিশেষ করে নিত্যপণ্যে অগ্রিম কর আরোপ করা হলে দাম বাড়বে। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে।
এনবিআর সূত্র জানায়, চাল, ডাল, আলু, ছোলা, ভোজ্যতেল ও ভুট্টার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, সার, অপরিশোধিত তেল, চিনিতে অগ্রিম কর আরোপ করা হবে। সার, অপরিশোধিত তেল, চিনি এবং চিকিৎসা সরঞ্জামাদিও অগ্রিম করের আওতায় আনা হচ্ছে। কম্পিউটার প্রিন্টার, রাউটার, মডেম, বিমান ইঞ্জিন ও বাসসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স ও শিল্প-কারখানার যন্ত্রপাতির ওপরও অগ্রিম কর বসবে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর শতাধিক পণ্য ও সেবা খাতে বাড়তি ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আরোপ করেছে। এতে এসব খাতে খরচ বেড়েছে। ফলে ভোক্তাকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। একপর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বাড়তি রাজস্বের বোঝা কমানোর দাবি জানালে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান আগামী বাজেটে তাদের দাবি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত মেনে এরই মধ্যে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক বাড়িয়েছে সরকার। আগামী বাজেটেও তা বাড়াচ্ছেন বলে গণমাধ্যমে জানতে পেরেছি। এতে রাজস্ব কিছুটা বাড়লেও সাধারণ মানুষের ব্যয় বহুগুণে বাড়বে, চাপে পড়বেন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। সরকারের এ ধরনের পদক্ষেপের সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তার ব্যয়ভারে।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, আগামী বাজেটের আকার হতে পারে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। যা চলতি বছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা কম। বাজেটের আকার কমলেও বাড়ানো হচ্ছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ, যা ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের শুরুতে এই হিসাব ছিল ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। বড় অঙ্কের ঘাটতি হওয়ায় চলতি অর্থবছরের মাঝামাঝি সংশোধন করে লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়, ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আগামী অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।