বিমা কোম্পানির এমডি বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিমা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। কোম্পানির এমডি নিয়োগের সুপারিশ পাঠানোর আগে সেই কোম্পানিকে ১৩টি বিষয় যাচাই করে সংযুক্ত করতে নির্দেশনা দিয়েছে আইডিআরএ।
আইন অনুযায়ী, বিমা কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও নিয়োগ ও নবায়ন উভয় ক্ষেত্রেই আইডিআরএর কাছে সিইও সম্পর্কিত সব তথ্য, প্রমাণ ও দলিলসহ আবেদন করতে হয়। আইডিআরএ এসব তথ্য ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ যাচাই করে অনুমোদন দিয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব পদে আবেদনকারীরা শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার জাল সনদ দিয়ে থাকেন বলে প্রমাণিত হয়েছে।
আইডিআরএ বলেছে, সনদ জালিয়াতি ও শঠতার মাধ্যমে কয়েকজন এমডি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কোম্পানির পক্ষ থেকেও সম্প্রতি এমন কিছু এমডি নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে, যার প্রমাণ আইডিআরএর কাছে আছে। বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইবাইস, দ্য ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা, আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু সনদ যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে এমন জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এগুলো যাচাই করতে গিয়ে আইডিআরএর সময় নষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার পদ পূরণ না হওয়ায় বিমা কোম্পানিও আইনগত জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছে।
সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত নির্দেশনায় আইডিআরএ জানিয়েছে, মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ ও নবায়নের প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য কর্তৃপক্ষ বরাবর আবেদন পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট সনদ কোম্পানিকেই যাচাই-বাছাই করতে হবে। এ ক্ষেত্রে উল্লিখিত ডিগ্রি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অনুমোদিত হতে হবে। ওই প্রোগ্রামটি ইউজিসি অনুমোদিত ক্যাম্পাসে ও অনুমোদিত প্রোগ্রাম কি না, তাও যাচাই করতে হবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকেই। যেকোনো বিদেশি ডিগ্রি বা অনলাইনে প্রাপ্ত ডিগ্রির ক্ষেত্রে এর সত্যতা যাচাই করে সঠিক প্রত্যয়নপত্র এবং ইউজিসি ইস্যু করা সমতাপত্র প্রস্তাবের সঙ্গে জমা দিতে হবে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার নিয়োগ বা নবায়নের জন্য বিমাকারী প্রতিষ্ঠান যথাযথ যাচাই-বাছাই ব্যতীত কোনো সার্টিফিকেট পাঠালে এবং তা জাল প্রমাণিত হলে ওই প্রতিষ্ঠানকে বিভ্রান্ত ও হয়রানি করার দায়ে অভিযুক্ত করা হবে।
আইডিআরএ বিমা খাতের ঊর্ধ্বতন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার নিয়োগ পর্যালোচনা করে জাল সনদ শনাক্তের পর কঠোর অবস্থানের কথা ঘোষণা করে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোহাম্মদ আবদুল মতিন সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ থেকে প্রাপ্ত এমবিএ সনদ ব্যবহার করে বেস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সিইও পদে নিয়োগ পান। পরে একই সনদ ব্যবহার করে মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সিইও পদেও চুক্তি করেন। তবে সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির কন্ট্রোলার অব এক্সামিনেশনস ড. বিজয় শঙ্কর বড়ুয়া নিশ্চিত করেন যে ওই সনদটি জাল। পরে আবদুল মতিন চাকরিচ্যুত হন।
কামরুল হাসান খন্দকার ইবাইস ইউনিভার্সিটির দুটি সনদ জমা দিয়ে এমডি নিয়োগ নবায়নের জন্য আবেদন করেন। পরে বৈধতা সম্পর্কিত ইউজিসির প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে ব্যর্থ হন। এ অবস্থায় আইডিআরএ তার নিয়োগ নবায়নের আবেদন নামঞ্জুর করে।
মুহাম্মদ সাইদুল আমিন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং দ্য ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা থেকে প্রাপ্ত সনদ ব্যবহার করে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সিইও পদে নিয়োগ পান। তার সনদগুলোর বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। পরে সনদ জালিয়াতির অভিযোগে পদত্যাগ করেন।
চলতি বছরের এপ্রিলে আকিজ তাকাফুল লাইফ ইন্স্যুরেন্সে সিইও নিয়োগেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। সাজ্জাদুল করিমকে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ দিয়ে মাত্র ২৪ দিন পর সিইও পদে নিয়োগের আবেদন করা হয়। যদিও তার সিইও বা অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল না। প্রতিষ্ঠানটি চার বছর ধরে সিইও ছাড়াই পরিচালিত হয়ে আসছে, যা ছিল বিমা আইনের লঙ্ঘন।
এ বিষয়ে জেনিথ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম নুরুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রায়ই জাল সনদ এবং অভিজ্ঞতাহীনের জন্য আবেদন করা হয়। তিনি বলেন, সম্প্রতি যে নির্দেশনাটি জারি করা হয়েছে, সেটি এ খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে সহায়তা করবে।
বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নূর এ আলম সিদ্দিকী বলেন, বিমা খাতের শৃঙ্খলা ঠিক রাখার জন্য আইডিআরএ যেসব সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তা পরিপালন করা উচিত। একটা সময় ছিল, যখন অনেক ক্ষেত্রেই এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে সব নিয়মকানুন যথাযথভাবে পালন করা হয়নি। যার ফলে এখন সেগুলো বিমা খাতের বিশৃঙ্খলার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, জাল সনদ বা অভিজ্ঞতা না থাকার পরও একটি কোম্পানির এমডি নিয়োগ পেলে স্বাভাবিকভাবেই সেই কোম্পানির অগ্রগতি পিছিয়ে যাবে। একটি কোম্পানি একজন অনভিজ্ঞ এমডির হাতে চলে যাবে। আইডিআরএ নতুন নির্দেশনায় যেসব তথ্যাদি চেয়েছে, সেগুলো সঠিকভাবে জমা দিলে এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে জাল সনদের অভিযোগ থাকবে না। অভিযোগ উঠলেও এর জন্য শুধু সেই এমডি শাস্তি পাবেন না, কোম্পানিকেও দায় নিতে হবে।