উন্নত দেশের উদাহরণ দিয়ে হঠাৎ করে ওষুধের জেনেরিক নাম লেখার প্রচলন করা হলে কার্যকর ওষুধ পেতে নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে পারেন রোগীরা। তুচ্ছ হয়ে পড়তে পারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভিজ্ঞতা, মতামত, দিকনির্দেশনা। রোগীকে ওষুধ দেওয়ার সিদ্ধান্ত চলে যেতে পারে বিক্রেতার হাতে। তখন বিক্রেতা বেশি লাভের আশায় ক্রেতাকে গছিয়ে দিতে পারেন নিম্নমানের ওষুধ। ঝুঁকি দেখা দেবে ভেজাল ওষুধ বিস্তারের। স্বাস্থ্যসেবায় তৈরি হতে পারে মারাত্মক বিশৃঙ্খল অবস্থার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনই দেশে ওষুধের জেনেরিক নাম প্রেসক্রিপশনে লেখার সময় আসেনি।
জেনেরিক নাম (Generic Name) বলতে সাধারণত ওষুধের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কোনো ওষুধের প্রধান উপাদানের বৈজ্ঞানিক নাম। অন্যভাবে বললে, এটি ওষুধের মূল নাম। এটি কী ধরনের উপদান দিয়ে ওষুধটি তৈরি করা হয়েছে তা নিশ্চিত করে। বিশ্বব্যাপী এই নাম একই হয়ে থাকে। বিভিন্ন দেশের চিকিৎসকরা সাধারণত জেনেরিক নাম ব্যবহার করে ওষুধের প্রেসক্রিপশন করে থাকেন।
গত ৫ মে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সুপারিশে জেনেরিক নামে ওষুধ লেখার বিষয়টি এসেছে। কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, শুরুতে ২৫ শতাংশ ওষুধের জেনেরিক নাম প্রেসক্রিপশনে লিখতে হবে। পাঁচ বছরের মধ্যে শতভাগ ওষুধ জেনেরিক নামে লিখতে হবে। কিন্তু এ বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা বিতর্ক এবং অনেক ধরনের সংশয় তৈরি হয়েছে। চিকিৎসক, রোগীসহ বিভিন্ন ধরনের স্টেকহোল্ডারের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
সবুজ নামের এক রোগী বলেন, ‘ফার্মেসিতে ওষুধ কিনতে গেলে বিক্রেতা বিভিন্ন সময় ডাক্তারের লেখা নির্দিষ্ট ওষুধ না দিয়ে অন্য কোম্পানির ওষুধ দিয়ে দেন। আবার ডাক্তারের লেখা ওষুধটি দোকানে না থাকলে বিক্রেতা অনেক সময় ক্রেতার মতামত না নিয়ে অন্য ওষুধ ধরিয়ে দেন। তবে সব বিক্রেতা এমন নন। অনেকে জিজ্ঞেস করেন। আমার সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা বহুবার ঘটেছে। বাসায় এসে প্রেসক্রিপশন মিলিয়ে নির্ধারিত ওষুধ না পেয়ে ফার্মেসিতে ফিরে গিয়ে ওষুধ বদলেও এনেছি।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে সব কোম্পানির ওষুধের গুণগত মান এক নয়। ওষুধের জেনেরিক নাম লিখলে রোগীরা মানসম্পন্ন ওষুধ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। ওষুধ বেচাবিক্রি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়তে পারে। ভেজাল ওষুধ কেনাবেচার সিন্ডিকেট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বেশির ভাগ দেশই ব্র্যান্ডেড জেনেরিক ওষুধের ওপর নির্ভরশীল। শুধু ইউরোপ ও আমেরিকায় জেনেরিক ড্রাগ রয়েছে। কারণ সেখানে সব কোম্পানি একই ধরনের কোয়ালিটি মেইনটেইন করে। বাংলাদেশের ফার্মেসিতে গ্র্যাজুয়েট রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্ট নেই। জেনেরিক নামে প্রেসক্রিপশন করতে হলে দেশের প্রতিটি ফার্মেসিতে ফার্ম-ডি করা ফার্মাসিস্ট লাগবে। একই সঙ্গে সব ধরনের ওষুধের কোয়ালিটি একই হতে হবে। যেহেতু দেশে এ ধরনের প্রস্তুতি নেই, সেহেতু এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে বিপজ্জনক ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট ফার্মাসিস্ট প্রফেসর মুনির উদ্দিন আহমেদ সোশ্যাল মিডিয়ায় বলেছেন, ‘জেনেরিক নামে ওষুধ লিখলে দোকানদারদের হাতে সোনার হরিণ তুলে দেওয়ার মতো অবস্থা হবে। তারা তখন নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ ক্রেতার কাছে বিক্রি করে প্রচুর মুনাফা অর্জন করার সুযোগ পাবে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ঔষধ প্রশাসনের (ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) জনবল সীমিত, নকল ওষুধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে অক্ষম। ফলে ওষুধশিল্পের সুনাম দেশে-বিদেশে ক্ষুণ্ন হবে। ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো গবেষণা ও উন্নয়নে প্রতিনিয়ত বিনিয়োগ করে নতুন ওষুধ উদ্ভাবন করে। জেনেরিক নাম ব্যবহারের ওপর জোর দিলে কোম্পানিগুলোর উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ড কমে যেতে পারে, যা দীর্ঘ মেয়াদে দেশের এই উদীয়মান শিল্পকে বিশ্ব প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে দেবে।
তারা বলছেন, বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্প উচ্চমানের ব্র্যান্ডেড ওষুধ উৎপাদনে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। দেশে উৎপাদিত ব্র্যান্ডেড ওষুধের নামের সঙ্গে রোগীরা পরিচিত। জেনেরিক নাম ব্যবহারে রোগীরা চিকিৎসার সময় বিভ্রান্তিতে পড়বেন, বিশেষ করে বয়স্ক বা লেখাপড়া জানেন না এমন রোগীদের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। আবার একজন চিকিৎসককে জেনেরিক নাম লিখতে একাধিক উপাদানের নাম লিখতে হবে। কখনো কখনো তা ৩২টির মতোও হতে পারে। যেমন- এ টু জেড মাল্টিভিটামিন।
বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির কোষাধ্যক্ষ হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন, ‘ইউরোপ, জাপান বা চায়নায় যে হাইস্পিডের ট্রেন আছে, যেগুলো ২৫০ কিংবা ৩০০ কিলোমিটার বেগে চলে। এখন ওই ট্রেন এনে কমলাপুর স্টেশন থেকে কি চালানো সম্ভব? না। কারণ সেই কাঠামো নেই। জেনেরিক নামের বিষয়টিও তেমন। এটা ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রে চলে। যেখানে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন সরাসরি চলে যায় ফার্মেসিতে। ফার্মেসি ওষুধ দিয়ে দেয়। এর বাইরে আপনি নিজে গিয়ে ফার্মেসিতে যদি মাথা ঠুকে মরেও যান তারা আপনাকে ওষুধ দেবে না। ডাক্তারের কাছে যেতেই হবে। যুক্তরাষ্ট্রে যে প্রোডাক্টগুলো ফার্মেসিতে রাখা হয়, তার মান নিশ্চিত করে এফডিএ। এফডিএর স্ট্যান্ডার্ডে না পড়লে কেউ প্রোডাক্ট বানাতে এবং বিক্রি করতে পারবে না। আমাদের এখানে কি বুকে হাত দিয়ে আমরা বলতে পারি সব ওষুধের মান একই রকম? আমাদের ডাক্তার, ফার্মেসি এবং ইন্ডাস্ট্রিগুলোও ওই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ১০ বছর পর আমরা এটা করার লক্ষ্য নিয়ে এগোতে পারি। তার আগে আমাকে ইন্ডাস্ট্রি, ডাক্তার এবং ফার্মেসি- সবকিছু ওই পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। যখন যেকোনো ওষুধ আপনি একই মানের খেতে পারবেন, কোম্পানিগুলো এবং সরকার বলতে পারবে সব একই মানের। তখন এটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব।’