কোরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এরই মধ্যে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এ বিষয়ে একাধিক বৈঠকে বসেছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা। এসব বৈঠকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোনো ধরনের অজুহাত দেখিয়ে কম দামে চামড়া কেনা যাবে না। ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমিয়ে কিনলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বৈঠকে চামড়া ব্যবসায়ীরা কোরবানির চামড়া ন্যায্যমূল্য দিয়ে কেনার আশ্বাস দিয়েছেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা দুই দিনের জন্য ব্যবসা করতে আসিনি। ন্যায্যদামে চামড়া কিনে থাকি। তবে কেউ যদি সরকার নির্ধারিত দামে খুচরা পর্যায় থেকে চামড়া কিনে আমাদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করার চেষ্টা করে, তবে তা ঠিক হবে না। আমাদেরও চামড়া কিনে ব্যবসা করতে হবে। তাই সরকারের বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে বেশি দামে চামড়া কেনা সম্ভব হবে না। আমরা কোরবানির পশুর চামড়া কেনার প্রস্তুতি নিয়েছি।’
ব্যবসায়ী এই নেতা বলেন, ‘কোনো সিন্ডিকেট করে চামড়া কম দামে কিনলে তা ঠিক হবে না। আমরা সিন্ডিকেটের সদস্যদের শাস্তির আওতায় আনার আহ্বান জানাই।’
শাহিন আহমেদ বলেন, ‘এবার চামড়া ব্যবসায়ীদের অনেকেই পুঁজিসংকটে আছেন। সরকারের কাছে ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর আবেদন করা হলেও তা কাজে দেয়নি। ঋণ বাড়ানো হয়নি।’
ঈদে কোরবানির পশুর চামড়া কেনা এবং কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে ২৩২ কোটি টাকা ঋণ দেবে ব্যাংকগুলো, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৩৮ কোটি টাকা কম। ২০২৪ সালে চামড়া কেনার জন্য ২৭০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছিল ব্যাংকগুলো। চামড়া খাতে খেলাপি প্রবণতা বেশি হওয়ায় প্রতিবছরই কমছে ঋণের পরিমাণ।
চামড়া খাতের আরেক ব্যবসায়ী এপেক্স ফুট ওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসিম মঞ্জুর খবরের কাগজকে বলেন, ‘চামড়া পাচাররোধে সরকারকে কঠোর অবস্থানে থাকতে হবে। এতে দেশে কোরবানির পশুর চামড়ার বাজার স্থিতিশীল থাকবে।’
এবার ঈদুল আজহার সময় কোরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, পশু আনা-নেওয়া, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ সার্বিক বিষয়ে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহম্মদ ইউনূস।
এরই মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে কোরবানির চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এ বছর ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম গত বছরের তুলনায় ৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। ঢাকায় গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। অন্যদিকে ঢাকার বাইরে গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। খাসির চামড়ার ক্রয়মূল্য প্রতি বর্গফুট ২২ থেকে ২৭ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম ২০ থেকে ২২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
চামড়া খাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন বলেন, ‘দেশে কাঁচা চামড়ার চাহিদা না থাকলে প্রয়োজনে চামড়া রপ্তানি করা যাবে। চামড়া রপ্তানিসংক্রান্ত যে বিধিনিষেধ ছিল, সেটি প্রত্যাহার করেছে সরকার। কাঁচা চামড়া সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে এ বছর ৩০ হাজার টন লবণ বিনামূল্যে মাদ্রাসা ও এতিমখানায় সরবরাহ করা হবে।
এরই মধ্যে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে বলা হয়েছে, ‘বিভিন্ন গোয়েন্দা রিপোর্ট থেকে জানা যায়, পশুর চামড়ার দাম নিয়ন্ত্রণে একটি সিন্ডিকেট রয়েছে।
কোনো সিন্ডিকেট বা অব্যবস্থাপনার কারণে মানুষ কোরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত যেন না হয়, সে বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিগত সময়ে চামড়া খাতের কিছু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে কোরবানির পশুর চামড়া বেচাকেনায় অস্থিরতা তৈরি করেছে। সাধারণ মানুষ কোরবানির পশুর চামড়ার ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সমাজের কম আয়ের মানুষরা। যারা এই চামড়া বিক্রির টাকার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। এই অব্যবস্থাপনার অবসান হওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।’
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় শিল্প মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে ইটিপির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর জোর বাড়াতে নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে এবার কোরবানির পরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও কঠোর নজরদারি করার কথা বলেছে।
সীমান্তে নজরদারি: এরই মধ্যে ট্যানারির মালিকদের বিভিন্ন সংগঠন থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে কোরবানির পশুর চামড়া সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পাচারের পাশাপাশি বন্দর দিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় পাচারেরও আশঙ্কা করা হয়েছে। এ বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে জোরালো আবেদন জানানো হয়েছে।
লবণ মাখিয়ে কাঁচা চামড়া কিছুটা শুকিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় পরিবহনে করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে বলেও আবেদনে বলা হয়েছে। এ জন্য ঈদুল আজহার দিন থেকে পরের ১৫ দিন বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকার বন্দরে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।