আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন না হওয়ায় গত কয়েক বছর ধরেই এ খাতের ব্যবসা আশানুরূপ বাড়ছে না। কোরবানির পশুর চামড়া কেনা থেকে চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন, রপ্তানি- প্রতি পদে পদে সমস্যার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে এ খাত।
চামড়া ব্যবসায়ীদের অনেকে অভিযোগ করছেন, চাহিদামতো ঋণ না পাওয়ায় সময়মতো চামড়া কিনতে পারছেন না তারা। পরে ধারদেনা করে কাঁচা চামড়া কেনা হচ্ছে। সময়মতো কাঁচা চামড়া কিনতে না পারায় এর গুণগত মান কমে যাচ্ছে। ফলে এই চামড়া দিয়ে তৈরি পণ্যের মান ভালো হয় না এবং ভালো দামও পাওয়া যায় না। তারা আরও বলেছেন, গত ২০ বছরেও সাভার শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। ফলে কারখানায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখা সম্ভব হয় না। এসব কারণে চামড়া ব্যবসার সংকট কাটছে না।
অন্যদিকে প্রতিবছর ঈদুল আজহা ঘিরে চামড়া সংগ্রহ নিয়েও চলে নৈরাজ্য। সরকারের বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে কমে কিনতে বিভিন্ন অজুহাতও দেন ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহিন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রতিবছর ঈদুল আজহার আগে সরকার ব্যাংকঋণ দিয়ে থাকে। বেশির ভাগ ট্যানারির মালিক এ অর্থ দিয়ে চামড়া কিনে থাকেন। গত কয়েক বছর ধরে আমাদের প্রয়োজনের অর্ধেকও ঋণ পাচ্ছি না। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী সময়মতো চামড়া কেনা সম্ভব হয় না।’
তিনি বলেন, অর্থ সংগ্রহ করে চামড়া কিনতে গিয়ে অনেকে দেরিতে কিনে থাকেন। এতে কাঁচা চামড়ার গুণগত মান কমে যায়। দেরিতে কেনা চামড়া দিয়ে পণ্য তৈরি করা হলে তার দাম ভালো আসে না। এ বিষয়ে সরকারকে আরও আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন।
এবার ঈদুল আজহার আগে চামড়া কেনা এবং কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে ২৩২ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে ব্যাংকগুলো, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৩৮ কোটি টাকা কম। ২০২৪ সালে চামড়া কেনার জন্য ২৭০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছিল ব্যাংকগুলো। চামড়া খাতে খেলাপি প্রবণতা বেশি হওয়ায় প্রতিবছরই কমছে ঋণের পরিমাণ।
চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী অন্যতম প্রতিষ্ঠান এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসিম মঞ্জুর খবরের কাগজকে বলেন, কোরবানির পশুর চামড়া প্রতি জেলায় জেলায় সংরক্ষণের জন্য আধুনিক ব্যবস্থা থাকতে হবে। সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে চামড়া বেচাকেনায় কোনো ধরনের অনিয়ম হবে না। এ ব্যবস্থা বেসরকারি উদ্যোগেও হতে পারে। আবার সরকারি উদ্যোগেও হতে পারে।
চামড়া খাতের শীর্ষ এই ব্যবসায়ী বলেন, ব্যবসায়ীরা নিয়মকানুন মেনে ব্যবসা করতে চান। সব ব্যবসায় কিছু ব্যক্তি সিন্ডিকেট করেন। এ জন্য তো সব ব্যবসায়ীরা দায়ী নন। সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পিছিয়ে থাকার কারণে গত এক দশকে বাংলাদেশের চামড়া রপ্তানি কমছে। অথচ চামড়া একসময় তিনটি প্রধান রপ্তানি পণ্যের একটি ছিল। ২০১৭ সালে ঢাকার হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে (এসটিআইই) স্থানান্তর, করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মারাত্মক প্রভাবও চামড়া রপ্তানি কমার অন্যতম কারণ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর মাসে দেশের চামড়া রপ্তানি ১১.৬৫ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৬২.৪৮ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে এই রপ্তানি ছিল ৭০.৭২ মিলিয়ন ডলার।
গত অর্থবছরে চামড়া রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১২৩ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন ডলার, যা ২০১৪ অর্থবছরে ছিল ৩৯৭ দশমিক ৫৪ মিলিয়ন ডলার। ২০১৫ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার এবং গত এক দশক ধরে তা বিলিয়ন ডলারের ওপরে আছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৯৬১ দশমিক ৪৯ মিলিয়ন ডলার।
লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ২৫ বছর আগেও চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের মোট রপ্তানির ৭৫ শতাংশেরও বেশি অংশ ছিল চামড়ার। কিন্তু তা কমে এখন প্রায় ১৩ শতাংশে নেমে এসেছে। কারখানাগুলোতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে পণ্য উৎপাদন করতে না পারলে রপ্তানি আরও কমে যেতে পারে। ট্যানারি ও সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে পরিবেশগত মান না মানা চামড়া রপ্তানি কমে যাওয়ার একটি বড় কারণ। এসব কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা দাম কম দিয়ে থাকেন।
চামড়া খাতে পরিবেশদূষণ রোধ, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা ও রপ্তানি বাড়াতে ২০০৩ সালে সাভারের হেমায়েতপুরে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত চামড়া শিল্পনগরী স্থাপনের উদ্যোগ নেয় সরকার। আধুনিক এ ট্যানারিশিল্প প্রকল্পটিতে ব্যয় করা হয় ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকা। এরপর ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলোকে সাভারে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে বরাদ্দপ্রাপ্ত ১৬২টি ট্যানারির মধ্যে বর্তমানে উৎপাদনে রয়েছে ১৪০টি। সেখানে এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি সিইটিপি।
বিটিএর সাধারণ সম্পাদক মো. শাখাওয়াত উল্লাহ খবরের কাগজকে বলেন, সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে দুর্বল কমপ্লায়েন্সের কারণে দেশের ব্যবসায়ীরা ইউরোপ, উত্তর আমেরিকাসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারের খুচরা বিক্রেতাদের কাছে চামড়া বিক্রি করতে পারেন না। দুর্বল কমপ্লায়েন্স ট্যানারিমালিকদের লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ পেতে বাধা হয়ে হয়ে দাঁড়িয়েছে। এলডব্লিউজি সনদ না থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো দাম পাওয়া যায় না। অনেক দেশ পণ্যও কিনতে চায় না।
লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ বা এলডব্লিউজি হলো চামড়া খাতের একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন। বিশ্বব্যাপী পরিবেশগতভাবে চামড়া সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণে বিষয়টি তদারকি করে তারা। ভারতে ১৩৯টি, চীনে ১০৩টি, ইতালিতে ৬৮টি, ব্রাজিলে ৬০টি, তাইওয়ানে ২৪টি, স্পেনে ১৭টি, দক্ষিণ কোরিয়া ও তুরস্কে ১৬টি এবং ভিয়েতনামে ১৪টি ট্যানারি এ সনদ পেয়েছে। বাংলাদেশের মাত্র ১০টি প্রতিষ্ঠান এ সনদ পেয়েছে ।