মাদকের কেনাবেচা ও সেবন যেন মহামারিতে রূপ নিয়েছে। কী শহর, কী গ্রাম, সবখানেই এখন মাদকের ভয়ানক থাবা পড়েছে। মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতায় প্রতিনিয়ত মরণনেশায় জড়াচ্ছে শিশু-কিশোর বা উঠতি বয়সী তরুণরা। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে দেদার ঢুকছে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল, আইস ও কোকেনের মতো বিদেশি ভয়ানক মাদক। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় গাঁজার চাষাবাদ বা সেবনও বেড়েছে মারাত্মকহারে। চক্রের তৎপরতা এতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, সরকারি হিসেবেই মাত্র সাত বছরে মাদকসেবীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণের বেশি।
এমন এক প্রেক্ষাপটে আজ ২৬ জুন পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস। এই দিবস উপলক্ষে গতকাল বুধবার সচিবালয়ে এক সভা শেষে কথা বলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘দুটি জিনিস আমরা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারিনি- একটি হলো মাদক, আরেকটি দুর্নীতি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো, কিন্তু মাদক আমরা কমিয়ে এনেছি এটা আমি কোনোদিন বলিনি। সবার সাহায্য-সহযোগিতা দরকার, এটা কমিয়ে আনতে হবে।’
এদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) অর্থায়নে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে- দেশে বর্তমানে মাদকসেবীর সংখ্যা প্রায় ৮৩ লাখ। অথচ, মাত্র সাত বছর আগেও ২০১৮ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের এক সমীক্ষায় দেশে মাদকাসক্ত ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ৩৫ লাখের কিছু বেশি। এই সাত বছরে দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণের বেশি।
মাদকাসক্তি যেভাবে বেড়েছে তাতেও বোঝা যায় মাদকের বিস্তার কতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কেননা চলতি মাসেই গত ১৩ দিনে (১২ থেকে ২৪ জুন) কেবলমাত্র বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ছয়টি অভিযানে মোট ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৮০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে। বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, ওই ইয়াবার সবগুলোই উদ্ধার করা হয়েছে মায়ানমার সীমান্তবর্তী কক্সবাজারের টেকনাফ-উখিয়া অঞ্চল থেকে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিজিবি ছাড়াও র্যাব, পুলিশ, ডিএনসি ও কোস্টগার্ডসহ অন্য সংস্থাও নিয়মিত অভিযান চালিয়ে প্রতিদিনই মাদকদ্রব্য উদ্ধারসহ জড়িতদের গ্রেপ্তার করে যাচ্ছে। কিন্তু তারপরও থামানো যাচ্ছে না মাদকের আগ্রাসন। মাদক যখন বেশি ধরা পড়ে তখন সাধারণত তৎপরতা বৃদ্ধির বিষয়টিও জানান দেয়। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও সজাগ বলে মনে হয়। তারপরও কয়েক স্তরের গোয়েন্দা নজরদারি সত্ত্বে সীমান্তে যেভাবে মাদকের ঢল দেখা যাচ্ছে তাতে ভয়ানক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সচেতন মহলে। অনেকের মনে আবার ‘শর্ষের মধ্যেই ভূত’ আছে কি না সেটা নিয়েও দেখা দিচ্ছে প্রশ্ন।
সচিবালয়ে এই বিষয়ে গতকাল কথা বলেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘মাদক হচ্ছে বাংলাদেশে একটা সামাজিক ব্যাধি। এর সঙ্গে আমাদের অফিসাররা আছে, সংবাদমাধ্যমের লোকজন আছে, অন্য গোষ্ঠীর লোকজন আছে- সবাই আছে এর মধ্যে, আমি স্বীকার করছি। আমরা আমাদের সাধ্যমতো অভিযান চালাচ্ছি।’ পরে ওই বক্তব্যের সূত্র ধরে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘এই বিষয়ে যদি কারও জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। যার নামই আসুক, আমরা কাউকে ছাড় দেব না।’
ডিএনসির বার্ষিক প্রতিবেদনে (২০২৪) বলা হয়েছে, বিশ্ব বাজারে মাদকের চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে। এতে মাদকের বাজার দিন দিন বড় হচ্ছে। বিশ্বায়নের এই যুগে প্রযুক্তির কল্যাণে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য। বাংলাদেশ মাদক উৎপাদন বা তৈরি করে না। তবে ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ চোরাচালানের গোল্ডেন ট্রায়াংগেল ও গোল্ডেন ক্রিসেন্টে পড়ায় পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তৈরি মাদকদ্রব্য বাংলাদেশকে চোরাচালানের রুট হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। এ কারণে দেশেও মাদকের চাহিদা বৃদ্ধি ও বাজার তৈরি হয়েছে, যা উদ্বেগজনক।
ডিএনসির ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (ডিডি) খোরশিদ আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশ সরাসরি মাদক উৎপাদনকারী দেশ নয়। তবে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রতিবেশী দেশগুলো (মায়ানমার ও ভারত) থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে অনেক ধরনের মাদক প্রবেশ করছে।’ তিনি জানান, ‘ঢাকা মাদকের একটি বড় বাজার। তবে দেশের সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে চোরাচালানের মাধ্যমে মাদক দেশে ঢুকছে। সেগুলো বিভিন্ন কৌশলে ঢাকায় আনা হচ্ছে। এসব বিষয়ে আমরাও দৃঢ়ভাবে কাজ করে যাচ্ছি।’
এ প্রসঙ্গে সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশে মাদকের যে ভয়াবহতা লক্ষ্য করা হচ্ছে- তার কয়েকটা দিক রয়েছে। মাদকের সহজলভ্যতা বেড়েছে, চাইলে অনলাইনে এবং অফলাইনে মাদক কেনাবেচা করা যাচ্ছে। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বা যারা দায়িত্বে রয়েছেন, কেউই ঠিকমতো তাদের দায়িত্ব পালন করছেন না। এর ফলে দেশে মাদকের ভয়াবহতা বাড়ছে। মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে যে জিরো টলারেন্সের কথা বলা হচ্ছে, আসলে সেটি দেখা যাচ্ছে না।’
ড. তৌহিদুল হক আরও বলেন, মাদক সেবন ও কেনাবেচা এমন একটি অপরাধ, যার সঙ্গে সব অপরাধের যোগসাজশ রয়েছে। মাদক বন্ধ করা না গেলে অন্য অপরাধও কমানো যাবে না। ফলে মাদকের সামাজিক যে ক্ষতি সেটা ভয়াবহ। সমাজ, পরিবার সর্বোপরি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই মাদকের থাবায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ জন্য সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যেমন আরও কঠোরতা প্রদর্শন করতে হবে, তেমনি পরিবার বা অভিভাবকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
মাদকবিরোধী অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী অন্যতম প্রধান সংস্থা হচ্ছে- র্যাব। গতকাল র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘মাদকবিরোধী অবস্থানে র্যাব বরাবরই জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করে থাকে। মাদকের বিরুদ্ধে আগেও যেভাবে র্যাব সোচ্চার ছিল, এখনো তেমনিভাবেই কাজ করে যাচ্ছে। মাদকের অনেক গডফাদারকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এসব অভিযানও চলমান আছে। প্রতিদিনই বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, গাঁজা-হেরোইন আটকসহ জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।’
১৩ দিনে বিজিবির ছয়টি অভিযানে ৫ লাখ ৬৯ হাজার ইয়াবা উদ্ধার:
গত ২৪ জুন টেকনাফের হোয়াইক্যং বিজিবি চেকপোস্টে কক্সবাজারগামী একটি বাসে ডগ স্কোয়াডের তল্লাশি অভিযানে ৯ হাজার ৮০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ সময় বাসের চালক ও হেলপারকে আটক করে বিজিবি। তার আগে ২২ জুন টেকনাফের সীমান্তবর্তী মির্জাজোড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করেছে বিজিবি। তার আগের দিন ২১ জুন বান্দরবানের ঘুমধুম সীমান্তে অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ২০ হাজার পিস ইয়াবাসহ এক রোহিঙ্গা যুবককে আটক করে বিজিবি। ১৮ জুন নাফ নদে জেলের ছদ্মবেশে মাদক পাচারের সময় ১ লাখ ২০ হাজার পিস ইয়াবাসহ মায়ানমারের দুজন নাগরিককে আটক করেছে বিজিবি। তার আগের দিন তথা ১৭ জুন টেকনাফের লেদা ও নোয়াপাড়া সীমান্তবর্তী আদমের জোড়া বেড়িবাঁধ এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ১০ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করে বিজিবি। এ ছাড়া ১২ জুন বিজিবির অভিযানে টেকনাফের নাফ নদের সীমান্তবর্তী মির্জাজোড়া এলাকা থেকে আরও ৫০ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়।
বার্ষিক প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান যা বলছে:
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) এবারে মাদকসংক্রান্ত বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে যাচ্ছে। যেখানে ডিএনসি ছাড়াও মাদকবিরোধী অভিযান চালানো সব সংস্থার তথ্য একসঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। এতে ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাত বছরের পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বর্তমানে প্রধান মাদক হিসেবে পরিচিত ইয়াবা ২০২৪ সালে উদ্ধার করা হয়েছে ২ কোটি ২৮ লাখ ৫৭ হাজার ৭৫১ পিস। তার আগের বছর ২০২৩ সালে ইয়াবা উদ্ধারের সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ২৯ লাখ ৭৭ হাজার ২১৯ পিস এবং তার আগে ২০২২ সালে আরও কিছু বেশি উদ্ধার হয়। ২০২১ সালে অবশ্য সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৫ কোটি ৩০ লাখ ৭৩ হাজার ৬৬৫ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়, যা তার আগে ২০১৮ সালের উদ্ধারের প্রায় সমপরিমাণ।
অন্যদিকে হেরোইন উদ্ধার হয় ২০২৪ সালে ৫০২ কেজি ৬৮৬ গ্রাম। তার আগে ২০২৩ সালে ৭০০ কেজি ৯২৮ গ্রাম উদ্ধার হয়েছিল। অবশ্য তার আগের বছরগুলোতে তুলনামূলক কম উদ্ধার হয়েছে। তবে কোকেনের মতো ভয়ানক মাদকদ্রব্য উদ্ধারের পরিমাণ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। ২০২৪ সালে ১৩০ কেজি ১৮ গ্রাম কোকেন উদ্ধার হয়েছে। যা ২০২৩ সালে ছিল ১৩ কেজি ৩ গ্রাম। তার আগের বছরগুলোতেও কম পরিমাণ উদ্ধার হলেও ২০১৮ সালে অবশ্য উদ্ধার হয়েছিল ২৭২ কেজি কোকেন। এরকম বিভিন্ন মাদকদ্রব্য উদ্ধারের যে পরিসংখ্যান দেখা গেছে, তাতে করে ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে উদ্ধারের পরিমাণ কম দেখা যায়।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনসহ নানা কারণে মাদকবিরোধী অভিযানেও ভাটা পড়ে।