আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে এরই মধ্যে নতুন ভোটার তালিকা প্রস্তুত, ভোট কেন্দ্র চূড়ান্তকরণ, নির্বাচনি সামগ্রী কেনা, সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ, নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন, পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন, নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা নিয়োগ এবং কর্মকর্তাদের জন্য নির্বাচনি প্রশিক্ষণসহ তফসিল ঘোষণার পূর্ববর্তী সব কাজ পুরোদমে এগিয়ে নিচ্ছে সংস্থাটি।
বৃহস্পতিবার ( বিকেলে নির্বাচন ভবনে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সবশেষ গত ১৩ জুন লন্ডনে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংসদ ভোটের যে পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন সে অনুযায়ী সব প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি। তিনি জানান, ফেব্রুয়ারিতে ভোট করার লক্ষ্যে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ভোট গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় সব সামগ্রী কেনা এবং ডিসেম্বর মাসেই তফসিল ঘোষণার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে কমিশন। আর তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনকেন্দ্রিক বাকি কাজগুলোও এগিয়ে রাখা হচ্ছে।
গত ২ মার্চ ইসির প্রকাশিত ২০২৫ সালের হালনাগাদ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে দেশে মোট ভোটার ১২ কোটি ৩৭ লাখ। এই ভোটারদের পাশাপাশি চলতি বছরের হালনাগাদ কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রায় ৬০ লাখ নতুন ভোটারকেও আসন্ন নির্বাচনে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে ইসি। সেই লক্ষ্যে ভোটার তালিকা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশোধিত সেই আইনে ভোটার তালিকায় কারা যুক্ত হবেন, কোন সময় পর্যন্ত যুক্ত হবেন- তা নির্বাচন কমিশন যৌক্তিক বিবেচনায় নির্ধারণ করবে। এমন বিধান রেখে সংশোধিত ভোটার তালিকা আইনটি এরই মধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে করতে যাওয়া ভোটে নতুন ভোটারদের জন্য এই সুযোগ সৃষ্টিতে আইন সংশোধনের বিকল্প নেই। তবে এপ্রিলে ভোট হলে আইন সংশোধন না করেও এসব ভোটার ভোট দিতে পারতেন। কারণ প্রচলিত আইনে প্রতি বছর ২ মার্চ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়।
ইসি সচিব জানান, নির্বাচন উপলক্ষে অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপ, আরপিওসহ বিভিন্ন আইন ও বিধিমালা সংশোধন, নির্বাচন পরিচালনাসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকার ম্যানুয়াল ও নির্দেশিকা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এগুলো চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ও ঐকমত্য কমিশনের সিদ্ধান্তের আলোকে গৃহীত প্রস্তাব এবং সুপারিশের জন্য তাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
সংসদ নির্বাচনের আগে এবার ৩০০ আসনের মধ্যে ৭৫টি আসন থেকে ইসিতে জমা পড়েছে ৬৩৮টি আবেদন। এসব আবেদনকারীর বেশির ভাগ ২০০১ সাল পর্যন্ত ৮ম সংসদ নির্বাচনের সময়কার সংসদীয় আসন পুনর্বহালের দাবি করেছেন। একই সঙ্গে আবেদনকারীরা যত দ্রুত সম্ভব সীমানা পুনর্বিন্যাসের খসড়া প্রকাশের দাবি করেছেন। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, সীমানা সংশোধন চেয়ে ইসিতে জমা পড়া সব আবেদন পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতি সংসদ নির্বাচনের মতো এবারও নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নিবন্ধন চেয়ে এবার ইসিতে আবেদন করেছে ১৪৪টি নতুন রাজনৈতিক দল। এসব আবেদন বাছাই ও প্রাথমিক পর্যালোচনার জন্য ২০ জন অফিসারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে ইসির নিবন্ধিত দলের সংখ্যা ৫০। এবার আদালতের আদেশে নতুন নিবন্ধন পাওয়া ৬টি দল এবং নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা দলগুলোর মধ্যে যারা নিবন্ধন পাবে তাদের জন্য সংরক্ষিত তালিকায় নির্বাচনি প্রতীকের ঘাটতি রয়েছে। এ বিষয়ে ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, এবার জামায়াতসহ নতুন নিবন্ধন পাওয়া বেশকিছু নতুন দলের জন্য কাঙ্ক্ষিত প্রতীক নিশ্চিত করতে সংশোধিত নতুন বিধিমালায় প্রতীকের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর জন্য ইসির সংরক্ষিত তালিকায় ৬৯টি প্রতীক থাকলেও, এই সংখ্যা ১০০তে উন্নীত করা হবে।
ইসি সচিব আরও জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে তারা সব ধরনের নির্বাচনি উপকরণ কেনা শেষ করার প্রস্তুতি নিয়েছেন। সেই লক্ষ্যে একটি টেন্ডারে কিছুটা পরিবর্তন আনতে হবে, সে কার্যক্রমও চলমান। এরই মধ্যে কেনা হয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার রিম কাগজ, যার ব্যয় ৩৬ কোটি টাকা।
এ ছাড়া নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় ২১ ধরনের ফরম, ১৭ ধরনের প্যাকেট, ৫ ধরনের পরিচয়পত্র, আচরণবিধি, প্রতীকের পোস্টার, নির্বাচন পরিচালনা ম্যানুয়াল, প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল, নির্দেশিকা ইত্যাদি ছাপানোর প্রাক-প্রস্তুতি চলছে। ভোটের সরঞ্জাম কেনা বাবদ এবার ইসির বাজেট প্রায় ৯ কোটি টাকা। এরপর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা ও প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দের পর ব্যালট পেপারে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নাম ও প্রতীক সংযোজন করে ছাপানোর জন্য কাগজ কেনাসহ আনুষঙ্গিক প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সারা দেশে প্রস্তুত করা হচ্ছে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভোটকেন্দ্র। বিগত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় ১২ কোটি ভোটারের জন্য ভোটকেন্দ্র ছিল ৪৪ হাজারের বেশি। এবারের সংসদ নির্বাচনে হালনাগাদসহ প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের জন্য এবার ভোটকেন্দ্র আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সারা দেশের ক্ষতিগ্রস্ত ভোটকেন্দ্রগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সেই লক্ষ্যে গত ১৬ জুন সরকারের ৪ মন্ত্রণালয়ের সচিব ও দুই সংস্থার প্রধান প্রকৌশলীকে চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি।