প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুরোদমে (ফুল গিয়ারে) প্রস্তুতি নিচ্ছে। অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ এখন আছে। নির্বাচনের তারিখ এবং শিডিউলের বিষয়ে যথাসময়ে জানানো হবে।
মঙ্গলবার (১ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
সিইসি নাসির উদ্দিনের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-গুঞ্জন এবং জনমনে যে সংশয়-সন্দেহ ছিল, সেটা অনেকটাই দূর হলো- এমনই মনে করছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল। তারপরও নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক মহল ও জনমনে নানা ধরনের নেতিবাচক সমালোচনা এবং গুঞ্জন বন্ধ হয়নি। এ বিষয়ে সরকার ও ইসিকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এ বিষয়ে নাম না প্রকাশের শর্তে বিএনপির দায়িত্বশীল এক নেতা খবরের কাগজকে জানান, লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠকের পর বোঝা গেছে নির্বাচন বানচালে কোনো অপশক্তির অপতৎপরতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না। তারপরও এখনো কিছু মহল নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে। তবে যত ধরনের ট্র্যাপ (ফাঁদ) সৃষ্টির চেষ্টা করা হোক না কেন, সরকার ও নির্বাচন কমিশন সেই ফাঁদে পা দেবে না বলেই তিনি মনে করেন।
বেসরকারি সংস্থা ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্সের (ফেমা) প্রেসিডেন্ট মুনিরা খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক নানা বক্তব্যে নির্বাচন নিয়ে সুস্পষ্ট কিছু বার্তা দেওয়া হয়েছে। সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে প্রধান উপদেষ্টা সর্বশেষ লন্ডনে ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাব্য সময় জানিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনও বলছে, তারা সংসদ নির্বাচনকে প্রাধান্য দিয়ে সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারপরও সংস্কার, বিচার এবং নির্বাচন প্রশ্নে এখনো রাজনৈতিক মহলে নানা বিতর্ক ও সমালোচনা বিদ্যমান। কিছু দল চায় আগে সংস্কার ও বিচার করতে হবে। জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে তাদের অবস্থান। অন্যদিকে বিএনপিসহ সমমনা কিছু দল অতি প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে সবার আগে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে। আমি মনে করি, নির্বাচনের পথ সুগম করতে যত দ্রুত সম্ভব দলগুলোর নির্বাচন প্রশ্নে ঐকমত্যে আসা জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবে নির্বাচন আয়োজনকারী সংস্থা ইসিকে বিতর্কমুক্ত রেখে নির্বাচন আয়োজনে সহযোগিতামূলক মনোভাব দেখানো।’
গত ১৩ জুন লন্ডনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে তারেক রহমান প্রধান উপদেষ্টার কাছে সংসদ নির্বাচনের সময় আগামী বছরের রমজানের আগে এপ্রিল থেকে এগিয়ে ফেব্রুয়ারিতে আয়োজনের প্রস্তাব করেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা গেলে ২০২৬ সালের রমজান শুরু হওয়ার আগের সপ্তাহেও নির্বাচন আয়োজন করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সেই সময়ের মধ্যে সংস্কার এবং বিচারের বিষয়ে পর্যাপ্ত অগ্রগতি অর্জন করা প্রয়োজন হবে।’
তাদের মধ্যকার বৈঠকের পর সংসদ নির্বাচনের সময় সম্পর্কে আভাস পাওয়ায় জনমনে একধরনের স্বস্তি ফেরে। তবে এ বিষয়ে পরে বিভিন্ন মহলে নেতিবাচক আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে। তাদের অনেকের মতে, নির্বাচন বিলম্বিত হতে পারে। যদিও এর সঠিক কোনো কারণ তাদের কেউই স্পষ্ট করেননি।
লন্ডন বৈঠকের দুই দিন পর এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে সিইসি বলেন, যৌথ ঘোষণায় কারও ‘সই নেই’, ফলে সেটাকে তিনি ‘সরকারি’ ঘোষণা বলতে পারছেন না। সরকারের তরফ থেকে তাকে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানোও হয়নি।
এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং ইসলামপন্থি কয়েকটি দল বিভিন্ন সভায় নির্বাচনের আগে বিচার ও সংস্কার নিয়ে সরব দাবি তোলে। সর্বশেষ গত ২৮ জুন শনিবার ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সমাবেশে যোগ দেয় সমমনা ১২টি রাজনৈতিক দল। তারা একমঞ্চে দাঁড়িয়ে সংস্কার, বিচার এবং সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে (পিআর) নির্বাচনের পক্ষে তাদের অবস্থান তুলে ধরে।
গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের এক মাস পর বিদায় নেয় কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন ইসি। এরপর ইসির দায়িত্বে আসে এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কমিশন। কিন্তু সংস্কার প্রস্তাবের আগে বিদ্যমান আইনে গঠিত এই কমিশন পুনর্গঠনের দাবি তোলে এনসিপি। নির্বাচনের আগে দলটির এ ধরনের দাবির ফলে রাজনৈতিক মহলে নানা নেতিবাচক আলোচনার ঝড় ওঠে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়।
এমন পরিস্থিতিতে লন্ডন বৈঠকের ১১ দিনের মাথায় ঢাকায় গত ২৬ জুন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত তাদের মধ্যকার প্রায় দেড় ঘণ্টার ওই বৈঠকের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য না জানানোয় বাড়ে কৌতূহল। তারেক রহমানের সঙ্গে লন্ডন বৈঠকের পর সিইসির সঙ্গে এটিই ছিল প্রধান উপদেষ্টার প্রথম বৈঠক। গুঞ্জন ওঠে, এবার হয়তো ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করতে পারে ইসি। বৈঠকের আলোচ্য বিষয় জাতির সামনে স্পষ্ট করার দাবি তোলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ। কিন্তু সেই বৈঠকের পর প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর ও সিইসির পক্ষ থেকে কিছুই জানানো হয়নি।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের চার দিন পর গতকাল নির্বাচন ভবনের নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তাদের মধ্যকার আলোচনার বিষয়টি খোলাসা করেন। সিইসি বলেন, ‘এটা ছিল ওনার সঙ্গে আমার সৌজন্য সাক্ষাৎ। ওভাবে ফরমালি কোনো বৈঠক করিনি। প্রশ্ন উঠেছে নির্বাচন নিয়ে আলাপ হয়েছে কি না। উনি প্রধান উপদেষ্টা এবং এই মুহূর্তে ইলেকশনটা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে, ফলে এটি নিয়ে আলোচনা হবেই। স্বাভাবিকভাবেই উনি জানতে চেয়েছেন, একটা ফ্রি, ফেয়ার অ্যান্ড ক্রেডিবল ইলেকশন জাতিকে দিতে আমাদের প্রস্তুতি আছে কি না? তাকে জানিয়েছি, প্রস্তুতি ফুল গিয়ারে নিচ্ছি। নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মধ্যেই কিন্তু আমরা প্রস্তুতি নিয়ে যাচ্ছি।’ তবে সিইসি জানান, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। নির্বাচনের তারিখ এবং শিডিউলের বিষয়ে যথাসময়ে জানানো হবে।
সিইসি আরও জানান, সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন এবং অন্তর্বর্তী সরকার একই তরঙ্গে রয়েছে। ফেব্রুয়ারির সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে এ বিষয়ে তার কোনো কথা হয়নি। জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার দাবি রয়েছে কোনো কোনো দলের। সেই বিতর্ক সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নাসির উদ্দিন সাফ জানিয়ে দেন, প্রধান উপদেষ্টা স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কিছু বলছেন না। তিনি জাতীয় নির্বাচনের কথাই বলে যাচ্ছেন। তাদের মূল ফোকাস জাতীয় নির্বাচন। সিইসি বলেন, আগামীতে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়েজনে প্রধান উপদেষ্টার আন্তরিকতা প্রশ্নাতীত। তিনি এ বিষয়ে কোনো দিন আমাদের ওপর চাপ দেননি।’ ফলে প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা অনুযায়ী তারা স্বাধীন, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন জাতিকে উপহার দিতে চান।
বর্তমান ইসি কমিশন গঠন নিয়ে বিতর্ক এবং পুনর্গঠনের দাবি উঠেছে, এমন প্রশ্নে সিইসি বলেন, ‘ইসি পুনর্গঠনের কোনো বার্তা প্রধান উপদেষ্টার তরফ থেকে তাকে দেওয়া হয়নি। বর্তমান ইসিকে আগস্ট বিপ্লবের ফসল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো নানা ধরনের বক্তব্য দিতে পারে। আমরা তো উড়ে এসে এখানে জুড়ে বসিনি। সম্পূর্ণ স্বচ্ছ আইনি ও বাছাই প্রক্রিয়ায় আমাদের নিয়োগ হয়েছে। এখনো কোনো নির্বাচন করিনি, কোনো দলের প্রতি পক্ষপাত করিনি। কমিশন পুনর্গঠনের কথা কেন আসছে? আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থাশীল। তারাও নিশ্চয়ই কর্মকাণ্ড দেখে আমাদের ওপর আস্থা রাখবে। রাজনৈতিক দলের নানা রকম বক্তব্য থাকলেও দিনশেষে সমঝোতা হয়ে সবকিছুর সুরাহা হয়ে যাবে আশা করি।’
এদিকে গত সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত কোর কমিটির সভা করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সভায় ফেব্রুয়ারিতেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এমনটা ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে নির্বাচনের আগে সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে অন্তত দুটি মহড়া দিতে বলা হয়েছে। একটি মহড়া হবে সেপ্টেম্বরে, অন্যটি নির্বাচনের ঠিক আগে।
এদিকে সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র স্থাপন এবং ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৫’ গেজেট প্রকাশ করেছে ইসি। এতে নির্বাচনের জন্য ভোটকেন্দ্র স্থাপনে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) প্রধান করে কমিটি করার বিধান এবং ইভিএমে ভোট দেওয়ার জন্য কক্ষ নির্ধারণের বিষয়টি নীতিমালা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর আগে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা সংশোধনের লক্ষ্যে চূড়ান্ত খসড়ার ওপর নাগরিকদের মতামত আহ্বান করেছে নির্বাচন কমিশন। এ জন্য ১০ জুলাই পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছে সংস্থাটি।