প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে কৃত্রিম পায়ে হাঁটার চেষ্টা করছেন জুলাইযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম। তিনি হাঁটেন আর চিকিৎসকরা তা পর্যবেক্ষণ করেন। ঠিকঠাক হাঁটার জন্য একজন তাকে ‘ব্রিফ’ করেন। কৃত্রিম পায়ে ভালোভাবে হাঁটা-চলা রপ্ত করতে পারলেই মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরবেন শফিকুল।
সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে ‘ব্র্যাক কৃত্রিম পা সংযোজন ও চিকিৎসাকেন্দ্রে’ (বিএলবিসি) গিয়ে এমনটি জানা যায়। এখানে কেবল শফিকুল নন, তার মতো আরও অনেকেই জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে পঙ্গুত্ববরণ করার পর কৃত্রিম হাত ও পা বা অঙ্গ সংযোজন করে জীবনে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। তারা খবরের কাগজকে বলেন, পা হারিয়ে তাদের মনে হয়েছিল আর কখনোই তারা হাঁটতে পারবেন না। কিন্তু ব্র্যাক তাদের নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়েছে। তাদের চিকিৎসা ও নিবিড় যত্নে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে ব্র্যাকের ওই প্রতিষ্ঠানটি।
ব্র্যাক কৃত্রিম পা সংযোজন ও চিকিৎসাকেন্দ্রের তথ্যমতে, জুলাই আন্দোলনের সময় থেকেই সহিংসতায় হাত বা পা হারানো ৩৪ জনকে চিকিৎসা ও সহায়তা দিয়েছে ব্র্যাক। এদের মধ্যে কৃত্রিম হাত সংযোজন করা হয়েছে ৬ জনের এবং পা সংযোজন করা হয়েছে ২৮ জনের। তাদের কেউ কেউ এরই মধ্যে বাড়ি ফিরে গেছেন, কেউবা শিগগিরই যাবেন।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় গত বছরের ১৬ জুলাই গাজীপুরের সফিপুর আনসার-ভিডিপি একাডেমির সামনে পুলিশের গুলিতে আহত হন শফিকুল ইসলাম। এরপর তার ডান পা কেটে ফেলা হয়। ব্র্যাক শফিকুলকে কৃত্রিম পা দিয়েছে। এখন তিনি নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন। আবারও ফিরে যেতে চান কর্মজীবনে। শফিকুলের ডান পা এখন অনেকটা রোবটের পায়ের মতো। তার কথা বলতে গেলে তিনি কৃত্রিম পা দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করে দেখালেন।
আলাপকালে শফিকুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনি প্রথমে গাজীপুরের শহিদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখান থেকে পঙ্গু জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর) হাসপাতালে পাঠানো হয়। পঙ্গুতে দুই মাস চিকিৎসা শেষে গ্রামের বাড়ি বগুড়ায় চলে যান। কিছুদিন পর অবস্থার অবনতি হলে আবারও পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে চিকিৎসকরা জানান, শফিকুলের পায়ে পচন ধরেছে, কেটে ফেলতে হবে। পরে চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে তার ডান পা কেটে ফেলা হয়।
তিনি বলেন, ‘পঙ্গুতে থাকতেই ব্র্যাকের চিকিৎসকরা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে তাদের সহায়তায় ব্র্যাক সেন্টারে চিকিৎসার জন্য আসি। এখন পায়ে থেরাপি দেওয়া হচ্ছে ও কৃত্রিম পা লাগিয়ে হাঁটার চেষ্টা করছি। কৃত্রিম পা দেওয়া থেকে শুরু করে চিকিৎসার সব খরচ বহন করেছে ব্র্যাক।’
পরিবারের কথা জিজ্ঞাসা করতেই কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে শফিকুলের। তিনি বলেন, ‘দুজন কন্যাসন্তান আছে, একজন কলেজে পড়ে।’ জানান, তিনি ইজিবাইক চালাতেন। অসুস্থ হওয়ার পর থেকে আয় বন্ধ। দুই ভাই মাসে কিছু টাকা দেন তা দিয়ে একবেলা খাবার জোটে সন্তানদের।’ এসব করুণ অবস্থা বলতে গিয়ে শফিকুলের দুই চোখ ভিজে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। এ সময় তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।
এই চিকিৎসাকেন্দ্রে আরও যারা চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন জাহিদ খান, জহিরুল ইসলাম ও জোবায়ের হাসান। জুলাই আন্দোলনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন তারা। ১৯ জুলাই রামপুরায় বাম হাতের কবজিতে গুলি লাগে জাহিদের। জাহিদ বরিশাল সরকারি কলেজের অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্র। জহিরুল ৫ আগস্ট উত্তরায় গুলিবিদ্ধ হন ও জোবায়ের ১৯ জুলাই রামপুরায় গুলিবিদ্ধ হন। তাদের দুজনের ডান হাতে গুলি লাগে।
জাহিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সরকারের পতনের জন্য রাস্তায় নামি। পুলিশের গুলি আমাকে দমাতে পারেনি। ওই দিন দুপুরে রামপুরায় ছাত্রদের মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। একটি গুলি বাম হাতের কবজিতে লাগে।’
তিনি বলেন, ‘শিক্ষাজীবন নিয়ে এখন শুধুই অনিশ্চয়তা। আমাকে কে চাকরি দেবেন। পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। বাবা-মায়ের অনেক স্বপ্ন ছিল। সব শেষ হয়ে গেছে। এখন চোখে-মুখে শুধু অন্ধকার দেখি!’
আহত জহিরুল ও জোবায়ের খবরের কাগজকে জানান, দুজনই বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করতেন। তারা ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। অসুস্থ হওয়ার পর থেকে নিদারুণ কষ্টে দিন কাটছে তাদের পরিবারের সদস্যদের। ওই দুই তরুণ আরও জানান, সরকারের কাছ থেকে এই এক বছরে এক লাখ টাকা ও হেলথ কার্ড পেয়েছেন। এই টাকায় কিছুই হয় না। ব্র্যাকের চিকিৎসা না পেলে তারা সেরে উঠতে পারতেন না।
ব্র্যাক জানায়, জুলাই আন্দোলনের সময় থেকে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে তাদের কয়েকটি টিম কাজ করেছে। আন্দোলনে যারা গুলিবিদ্ধ বা বিভিন্নভাবে আহত হয়েছেন তারা তাদের তালিকা করে চিকিৎসা দিয়েছে। এই তালিকায় ঢাকার ১৩টি হাসপাতাল ছাড়াও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতাল রয়েছে। প্রথমে তারা ৪১৬ জনের একটি তালিকা করে। তাদের ২৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়। হাত বা পা হারানো ৩৪ জনকে চিকিৎসা দেওয়া ছাড়াও ৬১ জনকে চিকিৎসা উপকরণ, ৪৮ জনকে ফিজিওথেরাপি, ৮০ জনকে ওষুধসহ মেডিকেল সার্ভিস ও সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং সেবা দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে ব্র্যাক কৃত্রিম পা সংযোজন ও চিকিৎসাকেন্দ্রের চিকিৎসক ডা. শাহিনুল হক রিপন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ব্র্যাকের উদ্যোগে বিনামূল্যে তাদের থাকা-খাওয়া ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। হাত বা পা হারানো ৩৪ জনকে চিকিৎসা ও সহায়তা দিয়েছে ব্র্যাক।’
তিনি বলেন, ‘দেশের যেকোনো দুর্যোগে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোই আমাদের লক্ষ্য। ব্র্যাক দেশ ও মানুষের সেবায় কাজ করে যাচ্ছে। এ-সংক্রান্ত ৫ বছরের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এখন যারা চিকিৎসা নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন, তারা আগামী পাঁচ বছর সব ধরনের ফলোআপ সেবা পাবেন।’
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এর আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে জুলাই মাসজুড়ে আন্দোলন হয়। ছাত্র-জনতার এ অভ্যুত্থানকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বলা হয়। সরকার প্রতিবছর ৫ আগস্ট ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ ঘোষণা করেছে। দিনটিতে সাধারণ ছুটি থাকবে।