ঢাকা ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
নাইজেরিয়ায় বন্দুকধারীদের হামলায় ১৭ কৃষক নিহত লাইনে বিড়াল ঢুকে পড়ায় সাময়িক বন্ধ ছিল মেট্রোরেল গাজীপুর পোশাক কারখানায় আগুন কসবায় হজযাত্রীর লাগেজ নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ১০ নিখোঁজ নাটকের অবসান, ‘গুপ্ত’ ছিলেন শিবির নেতা জিসান! যুক্তরাষ্ট্রের জয়ের পর ঐক্যের গান গাইলেন পচেত্তিনো মীনা বাজারে চাকরির সুযোগ, শুক্র-শনিবার ছুটি ইংল্যান্ডের ফুটবল ও বুট চুরি করল কে? গণমাধ্যম সংস্কারে ‘ইউনিফাইড ইনস্টিটিউশন’ গঠনের তাগিদ মদে ট্যাক্স বাড়ানোই বিরোধী দলের দুঃখ: প্রধানমন্ত্রী গোপালগঞ্জে নিখোঁজের ৩ দিন পর যুবকের মরদেহ উদ্ধার বাজেটে জনগণের স্বস্তি হলেও বিরোধী দলের অস্বস্তি: প্রধানমন্ত্রী লক্ষ্মীপুরে ইউপি কার্যালয়ে চুরি শাবিপ্রবি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ জ্বালানিপ্রতিষ্ঠানে ড. সাকিব বিশ্বকাপ উন্মাদনায় কুইজ ও রিচার্জ অফার, থাকছে জামাল ভূঁইয়ার সাথে খেলা দেখার সুযোগ গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির অগ্রণী ভূমিকা ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ উপলক্ষে ক্রাউন প্লাজা ঢাকা গুলশানে বিশেষ আয়োজন জীবের বৃদ্ধি ও বংশগতি অধ্যায় থেকে ৫টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৬ষ্ঠ পর্ব, অষ্টম শ্রেণির বিজ্ঞান গাড়ি ভেঙে ইংল্যান্ড দলের সরঞ্জাম চুরি, গ্রেপ্তার ২ কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিতে ব্যবস্থা নিন শুধু সংখ্যা বাড়াতে বিশ্বকাপে আসেনি হাইতি বোয়ালমারীতে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা যদি এই ছবিগুলো আপনি না দেখে থাকেন শেরপুরে পাহাড়ি ঢলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত কেমন ছিল প্রিয় রাসুল (সা.)-এর চুল মোবারক? কক্সবাজার সফরে প্রধানমন্ত্রী, চকরিয়া-পেকুয়ায় ব্যাপক প্রস্তুতি সরকারের জনকল্যাণ-প্রযুক্তিনির্ভর বাজেটকে স্বাগত জার্মানি বিএনপির পরমাণু সুড়ঙ্গে মাইন পুঁতেছে ইরান, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের দাবি কক্সবাজারের ‘পাতলী খাল’ পুনর্খনন উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী প্রাইম ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের ৩য় পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত
Nagad desktop

কৃত্রিম পায়ে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন ২৮ জুলাইযোদ্ধার

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৫, ১১:১৫ এএম
আপডেট: ০৮ জুলাই ২০২৫, ১১:১৮ এএম
কৃত্রিম পায়ে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন ২৮ জুলাইযোদ্ধার
ছবি: খবরের কাগজ

প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে কৃত্রিম পায়ে হাঁটার চেষ্টা করছেন জুলাইযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম। তিনি হাঁটেন আর চিকিৎসকরা তা পর্যবেক্ষণ করেন। ঠিকঠাক হাঁটার জন্য একজন তাকে ‘ব্রিফ’ করেন। কৃত্রিম পায়ে ভালোভাবে হাঁটা-চলা রপ্ত করতে পারলেই মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরবেন শফিকুল।

সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে ‘ব্র্যাক কৃত্রিম পা সংযোজন ও চিকিৎসাকেন্দ্রে’ (বিএলবিসি) গিয়ে এমনটি জানা যায়। এখানে কেবল শফিকুল নন, তার মতো আরও অনেকেই জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে পঙ্গুত্ববরণ করার পর কৃত্রিম হাত ও পা বা অঙ্গ সংযোজন করে জীবনে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। তারা খবরের কাগজকে বলেন, পা হারিয়ে তাদের মনে হয়েছিল আর কখনোই তারা হাঁটতে পারবেন না। কিন্তু ব্র্যাক তাদের নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়েছে। তাদের চিকিৎসা ও নিবিড় যত্নে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে ব্র্যাকের ওই প্রতিষ্ঠানটি। 

ব্র্যাক কৃত্রিম পা সংযোজন ও চিকিৎসাকেন্দ্রের তথ্যমতে, জুলাই আন্দোলনের সময় থেকেই সহিংসতায় হাত বা পা হারানো ৩৪ জনকে চিকিৎসা ও সহায়তা দিয়েছে ব্র্যাক। এদের মধ্যে কৃত্রিম হাত সংযোজন করা হয়েছে ৬ জনের এবং পা সংযোজন করা হয়েছে ২৮ জনের। তাদের কেউ কেউ এরই মধ্যে বাড়ি ফিরে গেছেন, কেউবা শিগগিরই যাবেন।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় গত বছরের ১৬ জুলাই গাজীপুরের সফিপুর আনসার-ভিডিপি একাডেমির সামনে পুলিশের গুলিতে আহত হন শফিকুল ইসলাম। এরপর তার ডান পা কেটে ফেলা হয়। ব্র্যাক শফিকুলকে কৃত্রিম পা দিয়েছে। এখন তিনি নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন। আবারও ফিরে যেতে চান কর্মজীবনে। শফিকুলের ডান পা এখন অনেকটা রোবটের পায়ের মতো। তার কথা বলতে গেলে তিনি কৃত্রিম পা দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করে দেখালেন। 

আলাপকালে শফিকুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনি প্রথমে গাজীপুরের শহিদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখান থেকে পঙ্গু জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর) হাসপাতালে পাঠানো হয়। পঙ্গুতে দুই মাস চিকিৎসা শেষে গ্রামের বাড়ি বগুড়ায় চলে যান। কিছুদিন পর অবস্থার অবনতি হলে আবারও পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে চিকিৎসকরা জানান, শফিকুলের পায়ে পচন ধরেছে, কেটে ফেলতে হবে। পরে চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে তার ডান পা কেটে ফেলা হয়। 

তিনি বলেন, ‘পঙ্গুতে থাকতেই ব্র্যাকের চিকিৎসকরা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে তাদের সহায়তায় ব্র্যাক সেন্টারে চিকিৎসার জন্য আসি। এখন পায়ে থেরাপি দেওয়া হচ্ছে ও কৃত্রিম পা লাগিয়ে হাঁটার চেষ্টা করছি। কৃত্রিম পা দেওয়া থেকে শুরু করে চিকিৎসার সব খরচ বহন করেছে ব্র্যাক।’

পরিবারের কথা জিজ্ঞাসা করতেই কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে শফিকুলের। তিনি বলেন, ‘দুজন কন্যাসন্তান আছে, একজন কলেজে পড়ে।’ জানান, তিনি ইজিবাইক চালাতেন। অসুস্থ হওয়ার পর থেকে আয় বন্ধ। দুই ভাই মাসে কিছু টাকা দেন তা দিয়ে একবেলা খাবার জোটে সন্তানদের।’ এসব করুণ অবস্থা বলতে গিয়ে শফিকুলের দুই চোখ ভিজে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। এ সময় তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন। 

এই চিকিৎসাকেন্দ্রে আরও যারা চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন জাহিদ খান, জহিরুল ইসলাম ও জোবায়ের হাসান। জুলাই আন্দোলনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন তারা। ১৯ জুলাই রামপুরায় বাম হাতের কবজিতে গুলি লাগে জাহিদের। জাহিদ বরিশাল সরকারি কলেজের অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্র। জহিরুল ৫ আগস্ট উত্তরায় গুলিবিদ্ধ হন ও জোবায়ের ১৯ জুলাই রামপুরায় গুলিবিদ্ধ হন। তাদের দুজনের ডান হাতে গুলি লাগে। 

জাহিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সরকারের পতনের জন্য রাস্তায় নামি। পুলিশের গুলি আমাকে দমাতে পারেনি। ওই দিন দুপুরে রামপুরায় ছাত্রদের মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। একটি গুলি বাম হাতের কবজিতে লাগে।’ 

তিনি বলেন, ‘শিক্ষাজীবন নিয়ে এখন শুধুই অনিশ্চয়তা। আমাকে কে চাকরি দেবেন। পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। বাবা-মায়ের অনেক স্বপ্ন ছিল। সব শেষ হয়ে গেছে। এখন চোখে-মুখে শুধু অন্ধকার দেখি!’ 

আহত জহিরুল ও জোবায়ের খবরের কাগজকে জানান, দুজনই বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করতেন। তারা ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। অসুস্থ হওয়ার পর থেকে নিদারুণ কষ্টে দিন কাটছে তাদের পরিবারের সদস্যদের। ওই দুই তরুণ আরও জানান, সরকারের কাছ থেকে এই এক বছরে এক লাখ টাকা ও হেলথ কার্ড পেয়েছেন। এই টাকায় কিছুই হয় না। ব্র্যাকের চিকিৎসা না পেলে তারা সেরে উঠতে পারতেন না।

ব্র্যাক জানায়, জুলাই আন্দোলনের সময় থেকে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে তাদের কয়েকটি টিম কাজ করেছে। আন্দোলনে যারা গুলিবিদ্ধ বা বিভিন্নভাবে আহত হয়েছেন তারা তাদের তালিকা করে চিকিৎসা দিয়েছে। এই তালিকায় ঢাকার ১৩টি হাসপাতাল ছাড়াও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতাল রয়েছে। প্রথমে তারা ৪১৬ জনের একটি তালিকা করে। তাদের ২৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়। হাত বা পা হারানো ৩৪ জনকে চিকিৎসা দেওয়া ছাড়াও ৬১ জনকে চিকিৎসা উপকরণ, ৪৮ জনকে ফিজিওথেরাপি, ৮০ জনকে ওষুধসহ মেডিকেল সার্ভিস ও সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং সেবা দেওয়া হয়েছে। 

এ বিষয়ে ব্র্যাক কৃত্রিম পা সংযোজন ও চিকিৎসাকেন্দ্রের চিকিৎসক ডা. শাহিনুল হক রিপন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ব্র্যাকের উদ্যোগে বিনামূল্যে তাদের থাকা-খাওয়া ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। হাত বা পা হারানো ৩৪ জনকে চিকিৎসা ও সহায়তা দিয়েছে ব্র্যাক।’ 

তিনি বলেন, ‘দেশের যেকোনো দুর্যোগে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোই আমাদের লক্ষ্য। ব্র্যাক দেশ ও মানুষের সেবায় কাজ করে যাচ্ছে। এ-সংক্রান্ত ৫ বছরের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এখন যারা চিকিৎসা নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন, তারা আগামী পাঁচ বছর সব ধরনের ফলোআপ সেবা পাবেন।’ 

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এর আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে জুলাই মাসজুড়ে আন্দোলন হয়। ছাত্র-জনতার এ অভ্যুত্থানকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বলা হয়। সরকার প্রতিবছর ৫ আগস্ট ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ ঘোষণা করেছে। দিনটিতে সাধারণ ছুটি থাকবে।

গৌরীপুর ও মুক্তাগাছায় পানির প্রকল্প: ২ বছরে অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:৪২ এএম
আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:৪৪ এএম
গৌরীপুর ও মুক্তাগাছায় পানির প্রকল্প: ২ বছরে অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার পাইকেশমোড়ে ‘লার্জ পাইপড ওয়াটার সাপ্লাই স্কিম’ প্রকল্পের কাজ মেঝে পর্যন্ত হয়েই বন্ধ রয়েছে। ছবি: খবরের কাগজ

গ্রামীণ মানুষের জন্য নিরাপদ ও আর্সেনিকমুক্ত পানি সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল সাড়ে ১২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প। ১৮ মাসের মধ্যে এই পানি সরবরাহ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রায় দুই বছর পার হয়ে গেলেও কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের বড় অংশের বিল তুলে নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী কার্যাদেশ বাতিলের জন্য প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠালেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। 

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় ‘লার্জ পাইপড ওয়াটার সাপ্লাই স্কিম’ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে। দুই উপজেলায় বাস্তবায়ন হতে যাওয়া এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ১২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স নূর অ্যান্ড কোং এই কাজ পায়।

সম্প্রতি সরেজমিনে গৌরীপুর উপজেলার পুম্বাইল গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্পের কাজ বন্ধ রয়েছে। সেখানে কোনো শ্রমিক নেই। নির্মাণকাজের কোনো তৎপরতাও দেখা যায়নি। গৌরীপুরে শুধু একটি ঘরের আংশিক ইটের গাঁথুনি দাঁড়িয়ে আছে।

মুক্তাগাছার পাইকেশ মোড় এলাকায় প্রকল্প স্থানে গিয়েও দেখা যায়, নির্মাণকাজ কেবল মেঝে পর্যন্ত হয়েছে। অথচ দপ্তরের নথিতে কাজের অগ্রগতি ২০ শতাংশ দেখানো হচ্ছে।

বাস্তবে কাজের অগ্রগতি খুব কম হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে বড় অঙ্কের বিল তুলে নিয়েছে। কত টাকা ছাড় করা হয়েছে, সেই তথ্য গোপন রাখা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, প্রকল্প ব্যয়ের মোটা অংশ এরই মধ্যে ঠিকাদারের হাতে চলে গেছে।

ময়মনসিংহ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঠিকাদারকে একাধিকবার মৌখিক ও লিখিতভাবে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় কার্যাদেশ বাতিলে প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে রহস্যজনক কারণে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় গৌরীপুর এবং মুক্তাগাছায় পাম্প স্থাপন ও ট্যাংক নির্মাণ শেষ হলে মোট ৭০০ পরিবার বিশুদ্ধ পানি পাবে। উপকারভোগীরা মিটার অনুযায়ী পানির বিল পরিশোধ করবেন। স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করেই মাসিক বিল নির্ধারণ করা হবে। 

কিন্তু প্রকল্প এলাকার বাসিন্দারা জানান, এ বিষয়ে তারা তেমন কিছু জানেন না। কেউ তাদের সঙ্গে কথা বলেননি। তবে লোকমুখে তারা জেনেছেন পানি সরবরাহের জন্য পাম্প স্থাপন করা হবে। মাসে ১০০ টাকার বিনিময়ে পানি ব্যবহার করতে পারবেন গ্রামের মানুষ।

গৌরীপুরের পুম্বাইল গ্রামের বাসিন্দা আজিজ মিয়া বলেন, ‘আমাদের বাড়িতে মোটর আছে। বিশুদ্ধ পানিই খাই। আবার সরকারি পানি নেওয়ার দরকার কী?’ মুক্তাগাছার পাইকেশমোড় এলাকার বাসিন্দা ইউসুফ আলী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে নামেমাত্র কাজ হয়। পরে আবার বন্ধ হয়ে যায়। এলাকার মানুষও এখন আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।’

মুক্তাগাছা প্রকল্পে কাজ করা শ্রমিক শফিকুল ইসলাম জানান, শ্রমিকদের সঙ্গে ২৬ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছে। কিন্তু নির্মাণসামগ্রী সময়মতো সরবরাহ না করায় কাজ দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। রড, সিমেন্টসহ প্রয়োজনীয় মালামাল ঠিকমতো না এলে কাজ এগোবে না।

নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, মুক্তাগাছা ও গৌরীপুরের এই প্রকল্পের জমি কেনা হয়নি। দুটি ইউনিটেই জমি নেওয়া হয়েছে স্থানীয়দের দানের মাধ্যমে। ফলে জমি পেতেই অনেক সময় লেগে যায়। এরপর কাজ শুরু হলেও তা চলছে ধীরগতিতে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর ঠিকাদার দ্বিতীয় দফায় মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেন। কিন্তু সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক নূর আলম টিটু কাজের ধীরগতির কথা স্বীকার করেছেন। তবে তিনি দাবি করেন, কাজে কোনো অনিয়ম হয়নি। বিল উত্তোলনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর দেননি। তবে ঠিকাদারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বিল উত্তোলনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ বিভাগের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জামাল হোসেনের দায়িত্বে থাকাকালীন এই প্রকল্প শুরু হয়েছিল। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে ফোন কেটে দেন। এরপর একাধিকবার চেষ্টা করলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ময়মনসিংহ বিভাগের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ছামিউল হক স্বীকার করেন, ঠিকাদারকে বারবার মৌখিক ও লিখিত তাগাদা দেওয়া হয়েছে। অগ্রগতি না হওয়ায় কার্যাদেশ বাতিলে প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো সিদ্ধান্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

অর্থবিল বিশ্লেষণ: পার পাচ্ছেন সম্পদশালীরা

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:০১ এএম
আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:০৩ এএম
অর্থবিল বিশ্লেষণ: পার পাচ্ছেন সম্পদশালীরা
বাজেট ২০২৬-২০২৭

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী খুব কায়দা করে প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব জাল বিছিয়েছেন। মোটাদাগে এ জালে সাধারণ মানুষকেই আটকে ফেলে বড়দের এড়িয়ে গেছেন। সম্পূরক শুল্ক কমবেশি করে হাজারের বেশি পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন। ব্যবসায়ী অর্থমন্ত্রী অর্থনীতির টানাপোড়নেও দেশি শিল্প বিকাশের অনেক পদক্ষেপ নিয়েছেন। তবে ছাড় দিলেও ছেড়ে দিলেন না। করপোরেট করহার বাড়ালেন না। 

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের অর্থবিল বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য মিলেছে। 

অর্থবিলে উপজেলা থেকে পাড়ার মোড়ের দোকানও ভ্যাটের আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে। খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্য সরবরাহের ওপর দশমিক ২ শতাংশ হারে অগ্রিম কর আরোপের কথা বলা হয়েছে। এতে প্রতি ১ হাজার টাকায় ২ টাকা অগ্রিম কর কেটে রাখা হবে। 

অর্থবিলে সাধারণ মানুষ রাজস্ব পরিশোধ না করলে বিদ্যমান আইনের কঠোরতা বহাল রাখা হয়েছে। করমুক্ত আয়সীমা আগামী পাঁচ অর্থবছর কয়েক ধাপে বাড়ানোর কথা বলে বাহবা পাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আগামী অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ছে মাত্র ২৫ হাজার টাকা, যা মূল্যস্ফীতির জাঁতাকলে পিষ্ট মানুষের জন্য তেমন স্বস্তির হবে না। অথচ সম্পদশালীদের কর ফাঁকি ও অর্থ পাচার বন্ধ করতে সেই পুরোনো ঢিলেঢালা পথেই হেঁটেছেন। প্রতিবেশী দেশ ভারতের মতো বিভিন্ন দূতাবাসে রাজস্ব দপ্তর স্থাপন করে বিদেশে পাচারকারীদের সম্পদ চিহ্নিত করা এবং সেই দেশে আইন (ল ফার্ম) সংস্থা নিয়োগে পদক্ষেপ নিতে খোদ এনবিআরের সুপারিশ থাকলেও তা বাজেটে আনা হয়নি।

ঋণদানকারী সংস্থা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে (আইএমএফ) খুশি করতে অর্থবিলে রাজস্ব অব্যাহতির সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। এতে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক বাড়লেও জনজীবনে চাপ কমবে না, বরং বাড়বে। 

এতদিন ই-টিআইএন নিয়েও অনেকে করযোগ্য আয় না থাকলে শুধু রিটার্ন দাখিল করেছেন, একটি টাকার কর দিতে হয়নি। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত অর্থবিল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, করদাতার আয় যা-ই হোক না কেন, অতি জরুরি অনেক সেবা নিতে হলে শুধু ই-টিআইএন থাকলেই হবে না, রিটার্ন জমার বাধ্যবাধ্যকতায় কঠোরতা আনা হয়েছে। শূন্য রিটার্ন নিরুৎসাহিত করে শূন্য রিটার্নধারীর আয়-ব্যয় খতিয়ে দেখার আইনি বিধান আনা হয়েছে। 

অর্থবিলে ব্যাংক হিসাব খুলতে ও ব্যাংকঋণ পেতে, পাসপোর্ট করতে, বিদেশ ভ্রমণ সম্পর্কিত কাগজপত্র সংগ্রহ করতে, বাড়ি, ফ্ল্যাট বা জমি কেনা, গাড়ি কেনা এবং এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র নবায়ন করা থেকে যেকোনো ব্যবসায়ে লাইসেন্স পাওয়া বা নবায়ন করতে ই-টিআইএন নেওয়া ও রিটার্ন জমার পক্ষে প্রমাণপত্র জমায় কঠোরতা থাকছে। বাড়ির গ্যাস, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন ইউলিটি সংযোগ নেওয়া থেকে এককালীন ৩ লাখ টাকার বেশি মূল্যের সোনা, মুক্তা বা মূল্যবান গহনাসহ যেকোনো কেনাকাটায়ও একই কঠোরতা থাকছে। অর্থবিলে সরকারি সব কাজে বা সেবা পেতে বাধ্যতামূলকভাবে ই-টিআইএন ও রিটার্ন দাখিলের পক্ষে প্রমাণপত্র দেখাতে হবে। 

আগামী প্রস্তাবিত অর্থবিলে হিমায়িত মাছ, গুঁড়া দুধ, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, মাখন, টমেটো, তাজা বা শুকনা আঙুর, কমলালেবু, আম, লেবুসহ প্রায় সব ধরনের ফল আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। সব ধরনের বিস্কুট, চকলেট ও ময়দাজাতীয় খাবার আমদানিতেও শুল্ক বাড়ানো হতে পারে। ফলে এসব পণ্যের দাম বাড়বে।

আয়কর অধ্যাদেশের ৬৮৮বি ধারা অনুসারে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থা (বিআরটিএ) ১৯৮৪ ধারায় ব্যক্তিগত যানবাহনের মালিকদের কাছ থেকে যানবাহন নিবন্ধন বা বার্ষিক ফিটনেস নবায়নের জন্য অগ্রিম আয়কর সংগ্রহ করে থাকে। ধাপে ধাপে এই অগ্রিম কর বাড়ানো হয়েছে। আগামীতে এই কর কমানোর আবেদন জানালেও অর্থবিলে গাড়ির ইঞ্জিনের ধারণক্ষমতা এবং গাড়ির মডেলের ধরনের ওপর অগ্রিম কর আগের মতোই বেশি থাকছে। 

সাধারণ আয়ের অনেক করদাতা বলেছেন, খাবারের খরচ অনেক বেড়েছে। বাসা ভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা সবকিছুই এখন বেশি। এর মধ্যে সাধারণ আয়ের মানুষের ওপর কর পরিশোধে চাপ দেওয়া হলে ভোগান্তি বাড়বে।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, বাজেট বক্তৃতায় অনেক কিছু আনা হয়নি। কিন্তু অর্থবিলে উল্লেখ করা হয়েছে। সমালোচনা এড়াতেই সরকার এটা করেছে। 

অর্থবিলে সৃজনশীল অর্থনীতি হিসেবে অনেক খাত নতুনভাবে যুক্ত করে করের আওতায় আনা হয়েছে। 

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সৃজনশীল খাত হিসেবে বিদেশে সরকার অনেক অর্থ আয় করে। ভারতেও এমন ব্যবস্থা আছে। 

অর্থবিল থেকে জানায় যায়, সৃজনশীল খাত হিসেবে উপজেলা পর্যায়ের কুটির শিল্প উৎপাদনকারীকেও আগামী অর্থবছর থেকে কর দিতে হবে। নাটক, সিনেমা বা স্টেডিয়ামে খেলা দেখার টিকিটেও কর বসানো হয়েছে। এমনকি কেউ কোনো রিসোর্টে বেড়াতে গেলেও বাড়তি কর গুনতে হবে। 

বাজেট ২০২৬-২৭ উত্থাপন আজ: আকাঙ্ক্ষা বনাম বাস্তবতার টানাপোড়েন

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ০৮:১১ এএম
আপডেট: ১১ জুন ২০২৬, ০৮:১২ এএম
বাজেট ২০২৬-২৭ উত্থাপন আজ: আকাঙ্ক্ষা বনাম বাস্তবতার টানাপোড়েন
অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক। আগামী বাজেটে বিপর্যস্ত অর্থনীতি থেকে উত্তরণ, বৈশ্বিক চাপ মোকাবিলা, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা, জ্বালানিসংকট ও বিনিয়োগে স্থবিরতা দূর করার চাপ আছে। সরকার পড়েছে বেকায়দায়। অর্থনীতির টানাপোড়েনে জন-আকাঙ্ক্ষা কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা। 

খোদ অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্বীকার করেছেন, বিগত দুই সরকারের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছেন। তলিয়ে যাওয়া অর্থনীতি আগামী বাজেটে টেনে তোলার চেষ্টা করা হবে। গতি আনতে আরও সময় লাগবে। 

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেশে কয়েক বছর ধরে শিল্পে বিনিয়োগে গতি নেই। বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি কমেছে। রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ঘাটতি হয়েছে। বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। নতুন কর্মসংস্থান নেই। মূল্যস্ফীতি বিগত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। ব্যাংক খাতে অস্থিরতা, খেলাপি ঋণ বেড়েছে, রপ্তানি আয়ে ধস নেমেছে। সবকিছু মিলিয়ে অর্থনীতিতে নাজুক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তারেক রহমান সরকারের একদিকে জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণের চাপ, অন্যদিকে বিপর্যস্ত অর্থনীতির বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সীমাবদ্ধতার মধ্যেই সরকারকে চাহিদা পূরণের চেষ্টা করতে হবে, যা কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা। 

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, এটি নতুন সরকারের প্রথম বাজেট। খুব স্বাভাবিকভাবে সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের অনেক প্রত্যাশা আছে। কিন্তু দেশের অর্থনীতি খুব খারাপ সময় পার করছে। নাজুক পরিস্থিতিতে সরকার জন-আকাঙ্ক্ষার অনেক কিছুই বাস্তবায়ন করতে পারবে না। এতে সরকারের কঠোর সমালোচনা হলেও কিছু্‌ই করার নেই। 

অর্থনীতির আরেক বিশ্লেষক এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে সরকারের নতুন ঋণচুক্তি করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। সংস্থাটি সরকারকে অনেক কঠিন শর্ত দিয়েছে। এসব শর্ত পূরণ করতে হলেও জনগণের অনেক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না। বিপর্যস্ত অর্থনীতিতে আয় বাড়ানো, আইএমএফের শর্ত মানা এবং জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণের চাপ–এই তিন মিলিয়ে সরকারকে কৌশলী বাজেট করতে হবে, যা অত্যন্ত কঠিন। তিনি বলেন, বাজেটে টানাপোড়েন তো থাকবেই।

ব্যয়ের খাত ও বেশির ভাগ খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঙ্কের বাজেট দিতে যাচ্ছে তারেক রহমানের সরকার। বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।

এই বাজেটে রাজস্ব ও অনুদান ধরা হয়েছে ৭ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এখানে মোট রাজস্ব ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে কর রাজস্ব ধরা হয়েছে ৬ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছ থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, এনবিআরবহির্ভূত কর ২৫ হাজার কোটি টাকা, করবহির্ভূত রাজস্ব ৬৬ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। বিদেশি অনুদান ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।

আসন্ন বাজেটে পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা, এ খাতে অভ্যন্তরীণ সুদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি ও বৈদেশিক সুদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। মূলধনি ব্যয় ৫৪ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা, উন্নয়ন ব্যয় ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ৩ লাখ কোটি টাকা। বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে (অনুদান বাদে) ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। 

বৈদেশিক ঋণ ১ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে নিট বৈদেশিক ঋণ ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যমাত্রা ৪৬ হাজার কোটি টাকা। 

অভ্যন্তরীণ ঋণ ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা এবং স্বল্পমেয়াদি ৬ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। ব্যাংকবহির্ভূত ঋণ ১৫ হাজার কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা ৬৮ হাজার ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আসন্ন বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা শতাংশের হিসাবে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল। বাংলাদেশের নতুন সরকার উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের এক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ঘাটতি অর্থায়নে সরকারকে বরাবরের মতো আগামীতেও বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ খাতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। 

চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ লাখ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য ছিল। সংশোধিত বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১৪ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। আগামী অর্থবছর উচ্চসুদের সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়া কমাবে সরকার। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ খাত থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১৯ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, বিএনপি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট দিতে গিয়ে প্রায় সব হিসাবেই উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা প্রাক্কলন করেছে। ঘাটতিও বড়। ব্যয়ের হিসাবও বেশি। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও উচ্চাভিলাষী। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর ব্যাপকভাবে কর আরোপ করতে হবে। অনেক মানুষকে রাজস্ব-জালে আনতে হবে। এসব মানুষের মধ্যে সাধারণ আয়ের মানুষ থাকবেন বেশি। 

তিনি আরও বলেন, সরকারকে অনেক নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতেই হবে। কারণ সরকারপ্রধান এসব অঙ্গীকার করেই ক্ষমতায় এসেছেন। এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে গিয়েও সরকারকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। ফলে আগামী বাজেট হবে সাধাণ মানুষকে চেপে ধরার বাজেট। 

অর্থসংকটে আছে সরকার। এর মধ্যেও সরকারি কর্মচারীর বেতন-ভাতা বাড়ানো হবে। আগামী বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন, নির্বাচনি ইশতেহারের বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষাজালের সম্প্রসারণ, কল্যাণকর অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপনে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড কর্মসূচির বাস্তবায়ন এবং ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ ১৩টি ইস্যু সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এর সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু করেছে সরকার, যা বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ। 

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর খবরের কাগজকে বলেন, দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের পথে। ব্যাংকগুলোতে সীমাহীন দুর্নীতি, অর্থ পাচার, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ প্রদানসহ আরও হাজারও অপতৎপরতার ফলে মাথা সোজা করে দাঁড়াতে পারছে না, খেলাপি ঋণ বেড়ে প্রায় ৩৬ শতাংশ হয়েছে এবং মূলধন ঘাটতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। রাজস্ব আদায় ২০ বছরের বেশি সময় ধরে একই জায়গায় স্থবির হয়ে আছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাজেট দেওয়া হচ্ছে। সরকারের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকছে জনপ্রত্যাশা বা জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণে।

ক্লিন ইমেজের আলী রেজাও দুদকের জালে

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ১০:২৭ এএম
ক্লিন ইমেজের আলী রেজাও দুদকের জালে
ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক এমডি ও সিইও আলী রেজা ইফতেখার

অনিয়ম-দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের (ইবিএল) সাবেক এমডি ও সিইও আলী রেজা ইফতেখারের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দেশের ইতিহাসে কোনো বেসরকারি ব্যাংকে সর্বোচ্চ মেয়াদে এমডি পদে থাকার রেকর্ড রয়েছে তার। ক্লিন ইমেজের কর্মকর্তা হিসেবেও পরিচিত রয়েছে তার। তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ আগে শোনা গেলেও এবারই প্রথম অনুসন্ধান শুরু হলো। মূলত পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফতের বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে দুদকের চলমান অনুসন্ধানের একপর্যায়ে আলী রেজা ইফতেখারের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। সেই তথ্যের ভিত্তিতে সম্প্রতি তার বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। 

দুদক সূত্রে জানা গেছে, অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে আলী রেজা ইফতেখারের বিষয়ে ৬ রকমের নথিপত্র চেয়ে ইস্টার্ন ব্যাংকের কর্তৃপক্ষের কাছে গত মাসে চিঠি দেন অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা ও উপপরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান। ওই চিঠিতে ইস্টার্ন ব্যাংকে আলী রেজা ইফতেখারের ব্যক্তিগত নথির সত্যায়িত কপি, জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের কপি, মোবাইল ও টেলিফোন নম্বরসহ বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বেতন-ভাতার সমুদয় হিসাব বিবরণী, তার নামে পরিচালিত সব ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য (চালু ও বন্ধ) এবং এ পর্যন্ত তাকে দেওয়া অবসরকালীন সুবিধাসহ সব আর্থিক লেনদেনের নথিপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে।

নথি সরবরাহের জন্য ইস্টার্ন ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে ১৭ মে পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে ইস্টার্ন ব্যাংক নথি সরবরাহে ব্যর্থ হয়। পরে গত ৩ জুন আরও ১০ কর্মদিবস সময় চেয়ে দুদকে আবেদন করে ইস্টার্ন ব্যাংক। সার্বিক বিবেচনায় ৭ কর্মদিবস সময় মঞ্জুর করে দুদক। সে অনুসারে আগামী ১৪ জুনের মধ্যে সব নথি দুদকে দাখিল করার কথা রয়েছে। 

আলী রেজা ইফতেখার ২০০৪ সালে ইবিএলের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। ২০০৬ সালে পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হন। ২০০৭ সালে তিনি ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিযুক্ত হন। চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল তিনি অবসরে যান। বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি কোনো ব্যাংকেই কোনো এমডি এত দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। দীর্ঘ সময়ে অন্তত ৫ বার তাকে এমডি পদে পুনর্নিয়োগ দেওয়া হয়। 

আলী রেজা ইফতেখার ২০১২ সালে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত এশিয়ান লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড ‘সিইও অব দ্য ইয়ার-২০১২’ পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০২০-২১ এবং ২০১৪-১৫ মেয়াদে দেশের ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

এদিকে ব্যাংকের ৮৮৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে চৌধুরী নাফিজ সরাফত ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুদক। সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের জানুয়ারি মাসে তাদের ২২টি ফ্ল্যাট জব্দের নির্দেশ দেন ঢাকা মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. জাকির হোসেন। 

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদ্মা ব্যাংকের (পূর্বে ফারমার্স ব্যাংক) চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেন নাফিজ সরাফত। ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানের পর দুই বছরে তার বিরুদ্ধে অন্তত দেড় হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে কয়েকটি মামলা দায়ের হয়েছে। একটি মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও একাধিক মামলা করেছে দুদক। 

বড় বাজেট, বড় ঘাটতি, বড় চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৮:৩৫ এএম
বড় বাজেট, বড় ঘাটতি, বড় চ্যালেঞ্জ
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

গত কয়েক বছর ধরেই দেশের অর্থনীতি সংকটে আছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে এই সংকট বেড়ে মহাসংকটে রূপ নিয়েছে। নতুন সরকার সংকট উত্তরণের পথ খুঁজতে গিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট দিতে যাচ্ছে। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব কষে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা আয়ের পরিকল্পনা করেছে।

অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। খরচের চাপে সাধারণ মানুষ কষ্টে আছে। শিল্প খাত বেহাল। দেশে বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে রেকর্ড করেছে। এমন প্রেক্ষাপটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড় বাজেট দিয়ে অর্থায়নের যে পরিকল্পনা করেছেন তা অবাস্তব।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, বড় বাজেটে বড় ঘাটতি রাখা হয়েছে। এতে সমগ্র অর্থনীতিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে ফেলা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ঘাটতি রয়েছে। এর পরও লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে আদায়ের ছক কষা হয়েছে; যা উচ্চাভিলাষী সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, প্রবৃদ্ধি, ঘাটতি, বৈদেশিক উৎস, ব্যাংকিং খাত, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না বলেও আশঙ্কা করেন এই অর্থনীতিবিদ।  

জাতীয় সংসদে আগামীকাল ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট ঘোষণা করবেন। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড দেওয়াসহ একগুচ্ছ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা থাকলেও সাধারণ মানুষের বহুদিনের অনেক দাবি পূরণ করা হবে না। 

বাজেটের আকার
আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ধরা হয় ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এই হিসাবে এবার বাজেটে যোগ হচ্ছে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে চলতি বাজেটের তুলনায় যা ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি, ইতিহাসের রেকর্ড বৃদ্ধি। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ৩ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা, যা এরই মধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আসছে বাজেটে রাজস্ব খাত থেকে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা আয় ধরা হয়েছে। এর মধ্যে এনবিআর থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, নন-এনবিআর থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা, এনটিআর খাত থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। 

করব্যবস্থা
চলতি অর্থবছরে রেকর্ড রাজস্ব ঘাটতিতে আছে এনবিআর। গত ১১ মাসে ঘাটতি বেড়ে ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেও আসন্ন অর্থবছরের জন্য এনবিআরকে আদায় করতে হবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। ভ্যাট থেকে আদায়ের চাপ বাড়ানো হয়েছে সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ। আসছে অর্থবছরে ভ্যাটের আওতায় মোট ২০ লাখ প্রতিষ্ঠানকে আনতে হিসাব কষা হয়েছে। ছোট দোকানদারদেরও আগামীতে ছাড় দেওয়া হবে না। হিসাব কষে বছরে ১ হাজার টাকা করে এক অর্থবছরে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ভ্যাট আদায়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। 

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, আগামী বাজেটে কোনো ধরনের প্রস্তুতি ছাড়াই সরকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ নিয়েছে। কারণ লক্ষ্যমাত্রা পূরণের কোনো সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছে না। 

তিনি আরও বলেন, ছোট দোকানদাররা বেশির ভাগ মফস্বল এলাকার, যেখানে কোনো ভ্যাট অফিস নেই। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে বড় মাপের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আদায়ে চাপ বাড়াতে হবে। কিন্তু সরকার সেদিকে না গিয়ে ছোটদের ভ্যাটের আওতায় আনছে। ভ্যাট পরিশোধে চাপ দওয়া হলে দ্রব্যমূল্য আরও বেড়ে যেতে পারে।

জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কষ্টে আছেন সাধারণ মানুষ। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর জোরালো চাপ দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী অর্থবছরের বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা নির্ধারণের বিষয়টি এনবিআরকে ভেবে দেখতে বলেন। কিন্তু করদাতা হারানোর ভয়ে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে করমুক্ত আয়সীমা মূল্যস্ফীতির বাড়ার সঙ্গে সমন্বয় করে বাড়ানো হলো না। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের দেখানো পথেই হাঁটছে তারেক রহমানের সরকার। চলতি বাজেট ঘোষণার সময়েই সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন বলেছিলেন, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা হবে। 

তবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৭-২৮ অর্থবছরের জন্যও ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ধার্য করছেন। ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ টাকা এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা ধার্য করেন।  

১১ জুন ঘোষিত বাজেটে আরও জানানো হবে, আগামী দুই অর্থবছরের করমুক্ত আয়সীমা নারী ও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ৫ লাখ টাকা, গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও গেজেটভুক্ত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে (২০২৪) আহত ‘জুলাইযোদ্ধাদের’ জন্য ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য ৫ লাখ টাকা। 

২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা নারী ও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের জন্য ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা, গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও গেজেটভুক্ত ‘জুলাইযোদ্ধাদের’ জন্য ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা। 

২০৩০-৩১ অর্থবছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা নারী ও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের জন্য ৫ লাখ টাকা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও গেজেটভুক্ত জুলাইযোদ্ধাদের জন্য ৬ লাখ টাকা, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। 

আগামী পাঁচ অর্থবছরের জন্য বিদ্যমান হিসাব থেকে কোনো সন্তান বা পোষ্য সন্তান প্রতিবন্ধী হলে পিতামাতা বা আইনানুগ অভিভাবকের ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়সীমা আরও ৫০ হাজার টাকা বেশি হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পিতা ও মাতা উভয়েই করদাতা হলে যেকোনো একজন এই সুবিধা পাবেন। 

আগামী পাঁচ অর্থবছরের জন্য প্রথম ধাপে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ১০ শতাংশ, পরের ধাপে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত ১৫ শতাংশ, পরে ধাপের ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ২০ শতাংশ, পরের ধাপে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ২৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট টাকার ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর পরিশোধ করতে হবে। তবে ২০২৮-৩১ অর্থবছর অবশিষ্ট আয়ের ওপর ৩৫ শতাংশ হারে কর পরিশোধ করতে হবে। 

আগামী অর্থবছরের বাজেটে তারেক রহমানের সরকার সারচার্জ বহাল রাখছে। অতিরিক্ত সম্পদ থাকার কারণে ২০২৮-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত ৩ কোটি টাকার বেশি সম্পদ থাকলে নিয়মিত করের বাইরে আরও ৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। আগামী অর্থবছরের জন্য করপোরেট করহার কমানো হচ্ছে না। আগামী বাজেটও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও কৃষিপণ্যে উৎসে কর বহাল থাকছে। 

করের জালের আওতা বাড়ানো হবে। তবে চ্যালেঞ্জের এ বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ছাড় দেওয়া হবে। বিশেষ কিডনি ডায়ালাইসিসের খরচ কমানো হবে। সব স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার কেনার ক্ষেত্রে উৎসে করে ছাড় থাকবে।   

অর্থায়ন
সরকারের নতুন বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি অর্থায়নে সরকারকে বরাবরের মতো আগামীতেও বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ খাতের ওপর নির্ভর করতে হবে। বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে বিদেশি উৎস থেকে ৪৬ শতাংশ অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে; যা জিডিপির ১ দশমিক ৭ শতাংশ।

আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘাটতির ৫৪ শতাংশ অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ও সঞ্চয়পত্র থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ লাখ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য ছিল। সংশোধিত বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১৪ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। আগামী অর্থবছর উচ্চ সুদের সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়া কমাবে সরকার। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ খাত থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১৯ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট। কিন্তু এখানে ঘাটতিও বড়। আবার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও উচ্চাভিলাষী। এসব হিসাব বাস্তবায়নের বাস্তবমুখী সূত্র নেই। 

প্রবৃদ্ধি ৬.৫, মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশ  
২০২৬-২৭ বাজেটের খসড়া নথির তথ্যানুযায়ী আসন্ন বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে এ বছর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৫ শতাংশের কম। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের অর্থনীতিতে সংকট চলছে। এমন প্রেক্ষাপটেও বাংলাদেশের নতুন সরকার উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের এক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন খবরের কাগজকে বলেন, এই লক্ষ্য অর্জন বড় চ্যালেঞ্জের হবে। গত মে মাসে ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। আগেই জ্বালানির দামও বাড়ানো হয়। সব মিলিয়ে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি প্রাক্কলনের চেয়ে অনেক বেশি  হবে।