এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ১৬ বছর আগের ধারায় ফিরেছে। গত দেড় দশক তথা ২০১১ সাল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় পাসের ৮০ শতাংশের ওপরে ওঠানামা করেছে। কখনো সেটি ছিল ৯০ শতাংশের ওপর। এবার সে ধারায় ছেদ ঘটেছে। আর এটিকেই প্রকৃত ফলাফল বলছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা। পাসের হার বেশি বা কম করা, গ্রেড বাড়িয়ে দেওয়া, ভালো রেজাল্টের জন্য ওপর মহল থেকে কোনো চাপ দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি এবং মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকার চেয়ারম্যান প্রফেসর খন্দোকার এহসানুল কবির।
এবার সাধারণ বোর্ডের মধ্যে সবচেয়ে ভালো করেছে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড। গত ১৬ বছরের ফল বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন নিয়ে বোর্ডটির চেয়ারম্যান প্রফেসর আ ন ম মোফাখখারুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘এবারের রেজাল্ট আমার দৃষ্টিতে অ্যাকচুয়াল। আগে কেন বেশি হয়েছিল, এবার কেন কম হয়েছে তা সঠিক জানি না। তবে সমাজ জীবনে আমাদের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা ছিল। এটা শিক্ষার মধ্যেও ছিল। এসবও রেজাল্ট ভালো করার ক্ষেত্রে কাজ করে থাকতে পারে। কিন্তু সেটার ফল ভালো দেখা যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাগুলোতে সেটা আমরা দেখেছি। হয়তো মানুষের মধ্যে পটপরিবর্তনের কারণে নতুন চিন্তাও আসতে পারে। বেশি মার্কস, বেশি জিপিএ-৫ পেয়ে লাভ নেই।’
তিনি বলেন, ‘এ বছর আমরা জানতে পেরেছি, শিক্ষা প্রশাসন থেকে পাসের হার বেশি বা কম করা- এসব নিয়ে চিন্তাটা কাজ করেনি। তবে এ কথা প্রচলিত আছে, সমাজে বেশি মার্কস পাওয়া বা জিপিএ-৫ পাওয়া খুশির ব্যাপার। হয়তো বেশি নম্বর দেওয়ার একটা প্রবণতা কাজ করত। তবে এ বছর সবার চাহিদা ছিল শিক্ষার প্রকৃত চিত্রটা দরকার।’
২০২৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ৬৮ দশমিক ৪ শতাংশ। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৬৭ দশমিক ৪১। পরের বছর ছিল ৭৮ দশমিক ১৯ শতাংশ। ২০১১ সালে ৮২ দশমিক ১৬ শতাংশ, ২০১২ সালে ৮৬ দশমিক ৩২ শতাংশ, ২০১৩ সালে ৮৯ দশমিক ২৮ শতাংশ, ২০১৪ সালে ৯২ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ২০১৫ সালে ৮৬ দশমিক ৭২ শতাংশ, ২০১৬ সালে ৮৮ দশমিক ৭০ শতাংশ, ২০১৭ সালে ৮১ দশমিক ২১ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৭৯ দশমিক ৪০ শতাংশ, ২০১৯ সালে ৮২ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং ২০২০ সালে ছিল ৮৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এর পর থেকে করোনা সংক্রমণের কারণে পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে পরিবর্তন আনে শিক্ষা বোর্ড। কখনো অটোপাস, কখনো সংক্ষিপ্ত সিলেবাস, কখনো পরীক্ষার নম্বর কমানো আবার কখনো পরীক্ষার সময় কমিয়ে আনা হয়। সে কারণে ফলাফলের গ্রাফ ছিল ঊর্ধ্বমুখী। ২০২১ সালে পাসের হার ছিল ৯৪ দশমিক ৮, ২০২২ সালে ৮৮ দশমিক ১০ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৮০ দশমিক ৯৪ শতাংশ। ২০২৪ সালে পূর্ণ সিলেবাসে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় পাস করে ৮৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ শিক্ষার্থী।
অন্যদিকে কারিগরিতে ফলাফলে পাঁচ বছর আগের ধারা লক্ষ করা গেছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত কারিগরি বোর্ডে পাসের হার ৭৩ দশমিক ৬৩, যা ২০২৪ সালে ছিল ৮১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। ২০২৩ সালে ৮৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ, ২০২২ সালে ৮৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ, ২০২১ সালে ৮৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়। এর আগের তিন বছর ২০২০, ২০১৯ ও ২০১৮ সালে পাসের হার ছিল যথাক্রমে ৭২ দশমিক ৭০, ৭২ দশমিক ২৪ ও ৭১ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
কমেছে পাসের হার ও জিপিএ-৫
২০২৫ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় গতবারের চেয়ে পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমেছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ফলাফলে ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়। মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৯ লাখ ৪ হাজার ৮৬ জন। উত্তীর্ণ হয় ১৩ লাখ ৩ হাজার ৪২৬ জন। এর মধ্যে ছাত্র ৬ লাখ ২৬ হাজার ৯৮১ জন আর ছাত্রী ৬ লাখ ৭৬ হাজার ৪৪৫ জন।
২০২৪ সালে পরীক্ষার্থী ছিল ২০ লাখ ১৩ হাজার ৫৯৭ জন। উত্তীর্ণ হয় ১৬ লাখ ৭২ হাজার ১৫৩ জন। সেই বছর জিপিএ-৫ পায় ১ লাখ ৮২ হাজার ১২৯ জন। সেটি কমেছে ২০২৫ সালে। এ বছর জিপিএ-৫ পায় ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। যার মধ্যে ৬৫ হাজার ৪১৬ জন ছাত্র এবং ৭৩ হাজার ৬১৬ জন ছাত্রী।
টানা ৮ বছর এগিয়ে মেয়েরা, গড় ব্যবধান সর্বোচ্চ
পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে বরাবরের মতো মেয়েরা এগিয়ে আছে। ২০১৮ সাল থেকে এসএসসির ফলাফলে মেয়েরা শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। এবার পাসের হারের ব্যবধান ৫ দশমিক ১৫, যা বিগত আট বছরের মধ্যেও সর্বোচ্চ। অন্যদিকে ছেলেদের তুলনায় ৮ হাজার ২০০ জন মেয়ে জিপিএ-৫ বেশি পেয়েছে।
ভালো করেছে কারিগরি বোর্ড
৯টি সাধারণ বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডের মধ্যে কারিগরি বোর্ডের ফলাফল তুলনামূলক ভালো। যেখানে সাধারণ বোর্ডে পাসের হার ৬৮ দশমিক শূন্য ৪, মাদ্রাসা বোর্ডে ৬৮ দশমিক শূন্য ৯। অন্যদিকে কারিগরি বোর্ডে পাসের হার ৭৩ দশমিক ৬৩। কারিগরি বোর্ডে ২ হাজার ৯০১ প্রতিষ্ঠানের ১ লাখ ১ হাজার ৭৫৭ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়।
সাধারণ বোর্ডে শীর্ষে রাজশাহী, তলানিতে বরিশাল
৯টি সাধারণ বোর্ডের মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করছে রাজশাহী বোর্ড। এ বোর্ডের পাসের হার ৭৭ দশমিক ৬৩। যশোর বোর্ডে ৭৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ, চট্টগ্রাম বোর্ডে ৭২ দশমিক শূন্য ৭, সিলেট বোর্ডে ৬৮ দশমিক ৫৭, ঢাকা বোর্ডে ৬৭ দশমিক ৫১, দিনাজপুর বোর্ডে ৬৭ দশমিক ৩, কুমিল্লা বোর্ডে ৬৩ দশমিক ৬০, ময়মনসিংহ বোর্ডে ৫৮ দশমিক ২২ এবং বরিশাল বোর্ডে ৫৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে।
বিভাগে খারাপ ফল মানবিকে, ফেল বেশি গণিতে
মানবিক, বিজ্ঞান ও বিজনেস স্টাডিজের মধ্যে সবেচেয়ে খারাপ করেছে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা। বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৮৫ দশমিক ৬৮। বিজনেস স্টাডিজে পাসের হার ৬৬ দশমিক ৩২। আর মানবিকে পাসের হার মাত্র ৫৩ দশমিক ৮৭। অপরদিকে বিষযভিত্তিক ফলাফলে দেখা যায়, গণিতে বেশি ফেল করেছে। ঢাকা বোর্ডে ৭৫.১৪ শতাংশ, কুমিল্লা বোর্ডে ৭২.০১ শতাংশ, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বোর্ডে মাত্র ৬৪ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে।
কমেছে শতভাগ পাস প্রতিষ্ঠান এবং বেড়েছে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান
২০২৫ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গতবারের তুলনায় শতভাগ পাস প্রতিষ্ঠান কমেছে। এবার শতভাগ পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯৮৪, যা ২০২৪ সালে ছিল ২ হাজার ৯৬৮। আর শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৩৪, যা ২০২৪ সালে ছিল ৫১টি।