দুর্নীতি-চাঁদাবাজি যেন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গেঁথে গেছে। এতে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। কিন্তু সময়ের পালাবদলে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে তারা মুখ খুলতে শুরু করেছেন। সাহস নিয়ে অনেক স্থানে প্রতিবাদে সোচ্চার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
এরই মধ্যে সোমবার (১৪ জুলাই) বনানীতে একজন চাঁদাবাজকে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকরা আটক করে গণধোলাই দেন। সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এর আগে ২৫ মে রাজশাহীতে একজন চাঁদাবাজকে লোকজন আটক করে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেন। এর বাইরেও বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং একাধিক রাজনৈতিক দলের ভেতর থেকেও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জনতার এমন সক্রিয় ভূমিকা চাঁদাবাজির মতো সামাজিক অপরাধ দমনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তবে সুষ্ঠু সমাধানের জন্য স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং রাজনৈতিক দলগুলোর স্বচ্ছতা ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। চাঁদাবাজ ধরার নামে যাতে আবার অন্য অপরাধ বা টার্গেট করে কাউকে ফাঁসানো না হয়, সেদিকও লক্ষ্য রাখতে হবে।
গত শুক্রবার রাজধানীর পল্লবীতে চাঁদা না দেওয়ায় একটি আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে হামলা করে ও গুলি চালায় চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীরা। এতে একজন গুলিবিদ্ধ হন। এর দুই দিন আগে মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগকে অমানবিকভাবে পিটিয়ে ও পাথর মেরে হত্যা করা হয়।
রাজধানী ঢাকা ছাড়াও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অনেক এলাকায় প্রতিবাদ করতে দেখা যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাজার, পরিবহন টার্মিনাল ও নির্মাণাধীন প্রকল্প, এমনকি ব্যক্তি মালিকানাধীন যেকোনো স্থাপনা নির্মাণ করতে গেলেও রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের বিগত ১৬ বছর এবং ৫ আগস্টের পরেও অন্য পক্ষের মাধ্যমে চাঁদাবাজি চলে আসছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। যদিও গতকাল কক্সবাজারে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, ‘মব-চাঁদাবাজি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ভাইরাল একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকরা দুই ব্যক্তিকে মারধর করছেন। আবার কয়েকজন চালক তাদের অটোরিকশা সড়কের মাঝে রেখে অবরোধ করে রেখেছেন। ওই ভিডিওর সঙ্গে পোস্টে লেখা হয়েছে, ‘বনানীতে চাঁদাবাজকে গণধোলাই, এভাবে সব জায়গা রুখে দাঁড়াতে হবে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে। কাউকে ছাড়া যাবে না। পুলিশে ধরিয়ে দিন, একটু দুলাই (ধোলাই) দিয়ে।’
আরএফ রুবেজ মারজান রাফি নামে অপর একটি প্রোফাইলের পোস্টে দেখা গেছে, ‘জনগণ একত্রিত হয়ে চাঁদাবাজদের গণধোলাই দিন। হাত-পা ভেঙে ভিক্ষার তালা ধরিয়ে দিন। এতে তার হালাল ইনকামের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ফকিন্নির বাচ্চারা পরিশ্রমের মাধ্যমে কোনো ইনকামের ব্যবস্থা না করে... কোনো এক নেতার চামচামির মাধ্যমে চাঁদাবাজির সুযোগ তৈরি করে জনগণকে হয়রানি করে।’
গত রবিবার রাকিব হোসেন রাজ নামে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী পোস্ট দিয়েছেন, ‘চাঁদাবাজদের তথ্য দিন। চাঁদাবাজ ধরিয়ে দিন। প্রশাসনকে জানাব, তারপর যদি তারা ব্যবস্থা না নেয় তাহলে চাঁদাবাজদের ওপরে একত্রে মব চালাব। চাঁদাবাজ/সন্ত্রাসী/দখলদারদের বিরুদ্ধে আমৃত্যু আপনাদের পাশে থাকব আমরা সবাই। আজ থেকে মব না শুধু বুলডোজার চালাব চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে।’
এদিকে গাজীপুর মহানগরের ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বি এম শামীম চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘প্রতিরোধী কার্ড’ তার ফেসবুকে পোস্ট করেছেন।
তাতে বলা হয়, ‘বিএনপির নাম ভাঙিয়ে কেউ যদি চাঁদাবাজি, দখলবাজি, অরাজকতা কিংবা নৈরাজ্য সৃষ্টি করে, তাহলে তাকে ধরে আইনের হাতে সোপর্দ করে দিন। আমরা সন্ত্রাসমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করছি।’
এ বিষয়ে সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, বর্তমান সময়ে যে ধরনের অপরাধ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে নানাভাবে সংঘাত-সহিংসতা ঘটছে। পেশিশক্তি অথবা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে নানা ধরনের অপরাধ করছে তার মধ্যে চাঁদাবাজি, দখলবাজিসহ নানা অপরাধ ঘটছে।
তিনি বলেন, ‘চাঁদাবাজি করতে গেলে অবশ্যই ভয়ের প্রভাব বা রাজনৈকিত প্রভাব বা অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণকারীদের সঙ্গে সংযোগ ছাড়া চাঁদাবাজি কেউই করতে পারে না। চাঁদাবাজির সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংঘাতের সূত্রপাত বা প্রেক্ষাপট যাই বলি না কেন, শুরুটি হয় চাঁদাবাজি থেকেই। এই জায়গাতে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ডের যে সংস্কার তা কর্মীদের মধ্যে সঠিকভাবে প্রবাহিত করতে পারেনি। আমাদের দেশের বাস্তবতায় সেটি পারাটাও খুব কঠিন।’
ড. তৌহিদুল হক বলেন, চাঁদাবাজি প্রতিরোধের নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে কথা বলা হচ্ছে, সেখান থেকেও মব ভায়োলেন্স ঘটতে পারে কি না, সেটি বিবেচনার বিষয়ে। একটি অপরাধের প্রতিবাদ করতে গিয়ে অন্য আরেকটি অপরাধ যেন না হয়, সেদিকে সমাজের সবাইকে গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ রাখতে হবে।’
এ প্রসঙ্গে পুলিশের সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) ইনামুল হক সাগর খবরের কাগজকে বলেন, ‘চাঁদাবাজ বা চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে আমরা সাধুবাদ জানাই। কিন্তু মব ভায়োলেন্স বা মব করতে উৎসাহিত করা এটি কখনোই কাম্য নয়। অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য থাকলে অবশ্যই পুলিশকে জানান, পুলিশ যথাসময়ে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে। তাই জনগণকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে অপরাধ ও অপরাধীর বিরুদ্ধে তথ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করতে হবে।’
মব-চাঁদাবাজি গ্রহণযোগ্য নয়: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
খবরের কাগজের কক্সবাজার প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গতকাল সোমবার দুপুরে কক্সবাজারে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ, ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণবিষয়ক আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। এ সময় তিনি বলেন, ‘মব-চাঁদাবাজি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণ সচেতন হলে মব ভায়োলেন্স বা চাঁদাবাজি কোনো কিছুই হবে না। মব ভায়োলেন্স, চাঁদাবাজি মেনে নেওয়া হবে না। তবে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
মাদক প্রতিরোধের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শুধু বাহক নয়, একই সঙ্গে মাদক কারবারিদের ধরে আইনের আওতায় আনা হবে।’