যান্ত্রিক ত্রুটির ধাক্কা যেন কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারছে না বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। একের পর এক যান্ত্রিক সমস্যা শুধু যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে না, জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থার সুনাম ও নিরাপত্তাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট থেকে উত্তরণে বিমানবহরের মেইনটেন্যান্স/রক্ষণাবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধানে নজরদারি এখন সময়ের দাবি।
সর্বশেষ ঘটনা ঘটে গতকাল সকালে। দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকাগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে মাঝপথ থেকে আবার চট্টগ্রামে ফিরে আসে। এতে ২৮৭ জন যাত্রী চরম উদ্বেগ ও বিড়ম্বনার শিকার হন। এর আগে ১৬ মে কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী একটি ড্যাশ-৮ বিমান রানওয়ে থেকে উড্ডয়নের সময় হঠাৎ একটি চাকা খুলে পড়ে যায়।
এর আগেও জুনে সিঙ্গাপুরগামী একটি ড্রিমলাইনার ফ্লাইট উড্ডয়নের পরপরই ইঞ্জিনে ত্রুটি ধরা পড়ে এবং সেটিকে ঢাকা ফিরে এসে জরুরি অবতরণ করতে হয়। জুলাইর শুরুতে দুবাই-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের একটি ফ্লাইটে টায়ার প্রেসার সমস্যার কারণে ২০০-এর বেশি যাত্রীকে ৩০ ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়েছিল। তাদের জন্য হোটেলের ব্যবস্থা করে বিমান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনায় একটি বিষয় স্পষ্ট, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে ঘাটতি রয়েছে। এখন তা নিয়মিত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেরামত, তদারকি ও যন্ত্রাংশ পরিবর্তনে গাফিলতির অভিযোগও উঠেছে।
এ বিষয়ে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এ টি এম নজরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘শুধু ফ্লাইট পরিচালনা নয়, বরং উড়োজাহাজের প্রতিটি যন্ত্রাংশ এবং কাঠামোর নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং মানসম্মত রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি। সেটা না করা হলে বারবার এই ধরনের ত্রুটি ঘটবে। বাড়বে আরও বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা।’
তিনি আর বলেন, ‘এখনই মেইনটেন্যান্স ইউনিটে দক্ষ জনবল নিয়োগ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের তত্ত্বাবধায়কের অধীনে বিমান পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া না হলে বিমান নিরাপত্তাজনিত চরম ঝুঁকিতে পড়বে। সেই সঙ্গে প্রতিটি বিমানের ‘লগ’ বইগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। সেখানে যদি কোনো বিমানে একাধিকবার সমস্যা বা একাধিকবার একই সমস্যা দেখা যায় তাহলে তার দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। সমাধানের আগে সংশ্লিষ্ট বিমান দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করা ঠিক হবে না।
এ বিষয়ে বিমানসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রতিটি ফ্লাইটের আগে প্রতিটি উড়োজাহাজ কয়েক ধাপে মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার এবং সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়ারদের দিয়ে চেক হয়। এর পর বিমানটি পাইলট বুঝে নেন। ফলে উড্ডয়নের পর যদি কোনো ত্রুটি পাইলট অনুভব করেন তখন তিনি জরুরি অবতরণের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। এতে মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ারদের তেমন কোনো দায় থাকে না।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক এবিএম রওশন কবীর খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা যাত্রী নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি। কোনো ঝুঁকি নিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করছি না। তাই পাইলটরা কোনো ঝুঁকি বা যান্ত্রিক ত্রুটি অনুভব করলে জরুরি অবতরণ করছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, চেক আপের শেষে কোনো ত্রুটি ধরা পড়ছে না। তখন আবার ওই বিমান তার ফ্লাইটটি সম্পন্ন করছে।’
ফ্লাইট বিপত্তির কারণে আবারও সামনে আসছে বিমানের লোকবল নিয়োগ এবং তাদের যোগ্যতার প্রশ্ন। গত মে মাসের শেষভাগে প্রকাশ পাওয়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের অভ্যন্তরীণ এক গোপন প্রতিবেদনে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা যায়, সংস্থাটিতে কর্মরত পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের (ক্লিনার) মাত্র ১২ সপ্তাহের সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে ‘টেকনিক্যাল হেলপার’ হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। এ প্রশিক্ষণ শেষে তারা বিমানের গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশল বিভাগে নিয়োজিত হচ্ছেন। এই কাজের সঙ্গে সরাসরি উড়োজাহাজের যান্ত্রিক কার্যকারিতা এবং যাত্রী নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত।
বিমানের অভ্যন্তরীণ একটি সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যে ১৬০ জন ক্লিনারকে এই পদ্ধতিতে টেকনিক্যাল হেলপার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও বড় পরিসরে একইভাবে নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা আছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের নিয়োগ পদ্ধতি শুধু অনভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষণহীন জনবল নিয়োগে সীমাবদ্ধ থাকছে না, উড়োজাহাজগুলো নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলার শঙ্কাও বাড়ছে। তারা বলছেন, প্রকৌশল বিভাগে কাজ করার জন্য বিশেষায়িত জ্ঞান এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। অথচ সেখানে মাত্র ১২ সপ্তাহের কোর্স কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। এই প্রেক্ষাপটে বিমানে জনবল নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ, বিমানের অভ্যন্তরীণ কর্মপ্রক্রিয়া এবং মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত এবং যাচাই-বাছাইয়ের দাবি জানিয়েছেন বিমানসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ মহল।