দেশ স্বাধীন হওয়ার এক বছর পর ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে গৃহীত হয় বাংলাদেশের সংবিধান। এরপর ৫২ বছর ধরে রাষ্ট্র সংবিধানের মধ্যেই চলছে। সময়ের সঙ্গে সংবিধান পরিবর্তন হয়েছে, সংবিধানের অনেক ধারা পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু কোনো সরকারই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দিকে নজর দেয়নি।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর জনগণের মধ্যে রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের প্রবল দাবি ওঠে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সংস্কারের পক্ষে আলোচনা শুরু হয়। এই প্রথম অন্তর্বর্তী সরকার ১১টি কমিশন গঠন করে সংবিধানসহ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। সংস্কার কতটুকু হবে বা আইনগত ভিত্তিতে বাস্তবায়ন কতটুকু হবে তা হয়তো সময় বলে দেবে। তবে দেশ বদলাতে হলে সংস্কার যে প্রয়োজন, অন্তত এই আত্মোপলব্ধিটুকু এবারই প্রথম রাজনৈতিক দল ও মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে। ফলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে, সংস্কারের এই উদ্যোগ দীর্ঘ মেয়াদে হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার পথ দেখাবে।
সরকারের সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, গত এক বছরে আশু বাস্তবায়নযোগ্য অনেক সংস্কার বাস্তবায়ন হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে সময় লাগবে।
মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “দায়িত্ব গ্রহণের পর ‘সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন’- এই তিনটি কাজকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছি।
জুলাই অভ্যুত্থানের ছাত্র-শ্রমিক-জনতা দেয়ালে দেয়ালে যে প্রত্যাশার কথা লিখেছেন তার অন্যতম ফোকাস ছিল রাষ্ট্রব্যবস্থার গণতান্ত্রিক সংস্কার। সে লক্ষ্যে কয়েকটি সংস্কার কমিশন গঠন করেছি। স্বল্প সময়ের মধ্যে আশু বাস্তবায়নযোগ্য বহু সংস্কার ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছি। এই সংস্কারগুলোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক খাত, বিচারব্যবস্থা ও জনপ্রশাসনে গতিশীলতা আসবে; স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। দুর্নীতি, অনিয়ম ও হয়রানি হ্রাস পাবে। সংস্কার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়েছিল। এ পর্যন্ত ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে।”
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ খবরের কাগজকে বলেন, ‘এরই মধ্যে ছয় কমিশনের সুপারিশ থেকে আশু করণীয় ও দীর্ঘ মেয়াদে বাস্তবায়ন- এই দুভাগে ভাগ করে সংশ্লিষ্টদের বাস্তবায়নে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আশু করণীয় সুপারিশ বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। আশা করি নির্বাচনের আগে বেশির ভাগই বাস্তবায়ন করা হবে। তবে বড় ধরনের সুপারিশ বাস্তবায়নে সময় লাগবে। এ ক্ষেত্রে বড় সুপারিশ বাস্তবায়নে প্রস্তুতি সেরে ফেলা হচ্ছে। নির্বাচনের আয়োজন ও সংস্কার একই সঙ্গে চলছে।
আলী রীয়াজ আরও বলেন, আশু সংস্কার হিসেবে এরই মধ্যে হাইকোর্টে বিচারপতি নিয়োগের স্বাধীন প্রক্রিয়া চালু হয়েছে।
সংস্কার বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় প্রণীত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫-১৬ বছরের শাসনামলে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই দুর্নীতিতে নিমজ্জিত ছিল। সংস্কারবিষয়ক কাজ বাস্তবায়নে অন্যতম বাধা বিগত সরকারের দুর্নীতি এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অবৈধ সুবিধাপ্রাপ্তরা।
উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান খবরের কাগজকে বলেন, সংস্কার করা সম্ভব হলে দুর্নীতি কমবে। সুবিধাপ্রাপ্তরা বিগত সরকরের আমলের মতো অবৈধ সুবিধা নিতে পারবেন না। তাই তারা বিভিন্নভাবে সংস্কারের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছেন।
তিনি আরও বলেন, সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা হলে একটি জবাবদিহিমূলক স্বচ্ছ সরকার কাঠামো গড়ে উঠবে। বিষয়টি বর্তমান সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। আশা করি জাতীয় নির্বাচনের আগে আশু সংস্কার শেষ করে এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পথে যাত্রা শুরু করে চমৎকার একটি রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে। সংস্কার সময়ের দাবি, সাধারণ মানুষের প্রাণের দাবি।
আরেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম খবরের কাগজকে বলেন, সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং রাষ্ট্রের জন্য দরকারি। সংস্কার করা সম্ভব হলে জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে উঠবে। সরকার সংস্কার শুরু করেছে।
সংস্কার বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় প্রণীত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের বার্তা ও আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে এবং সর্বজনীন মতৈক্য প্রতিষ্ঠার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ রাষ্ট্র বিনির্মাণের লক্ষ্যে কয়েকটি সংস্কার কমিশন গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। ঐকমত্য কমিশনের প্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে এবং সহসভাপতি হিসেবে আলী রীয়াজকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পর্যায়ক্রমে সংবিধান, নির্বাচন, পুলিশ প্রশাসন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনসহ মোট ১১টি কমিশন গঠন করা হয়।
কমিশন সংস্কার নিয়ে ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনা করে। সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছে, তাদের মতামত দিয়েছে। ঐকমত্য কমিশন এসব আলোচনা থেকে ১৬৬টি সুপারিশ প্রাথমিকভাবে বাছাই করেছে। এসব নিয়েও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রায় দুই মাস ধরে আলোচনা চলে। এসব আলোচনায় প্রথম দফায় ৬২টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়। দ্বিতীয় ধাপে ২৩ দিনের আলোচনা শেষে ১০টি বিষয়ে নোট অব ডিসেন্টসহ ১৯টিতে ঐকমত্য হয়। এখনো কয়েকটি সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দলের ভিন্ন মত থাকলেও তার সমাধান হবে।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে আরও জানা যায়, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন থেকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে স্বচ্ছ নির্বাচনব্যবস্থায় গুরুত্ব দিয়ে ১৬টি ক্ষেত্রে ১৫০টি সুপারিশ জানিয়েছে। এরই মধ্যে সংস্কারের অংশ হিসেবে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিধান বাতিল করা হয়েছে এবং কোনো আসনে মোট ভোটারের ৪০ শতাংশ ভোট না পড়লে পুননির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হবে।
সংস্কারের অংশ হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন বন্ধ করা, ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী দেওয়া নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় নির্বাচনে ‘না ভোটের বিধান প্রবর্তন করা এবং নির্বাচনে না ভোট বিজয়ী হলে সেই নির্বাচন বাতিল করা হবে। পুননির্বাচনের ক্ষেত্রে বাতিল করা নির্বাচনের কোনো প্রার্থী নতুন নির্বাচনে প্রার্থী হতে না পারার বিধানও কার্যকর করা হবে।
বর্তমানে সচিব ও সমপদমর্যাদার কর্মকর্তা আছেন ৮০ জন। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন ৬০ জন করার সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সংখ্যা একজন, মুখ্য সচিবের পদ ১৭টি করতে বলা হয়েছে। সংস্কারের অংশ হিসেবে একাধিক বিভাগ থাকা মন্ত্রণালয়ে মুখ্য সচিব থাকবেন। বর্তমানে মুখ্য সচিবের একটি পদ। এ বিষয়ে কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয়গুলো পুনর্বিন্যস্ত করা হলে একাধিক বিভাগ সৃষ্টি হবে। যেসব মন্ত্রণালয়ে একাধিক বিভাগ থাকবে, সেগুলোতে সচিবের পাশাপাশি একজন মুখ্য সচিবকে নিয়োগ করা হবে। ‘সিনিয়র সচিব’ পদ বাদ দিতে বলেছে কমিশন। রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ে দুজন মুখ্য সচিব রাখার কথা বলা হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, ‘দুদক বর্তমানে একটি বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান, তবে এটিকে একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। দুদককে আরও গতিশীল করার জন্য, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা হিসেবে ৪৭টি সুপারিশ প্রস্তাব করেছি।
সংস্কার কমিশন দুদকের সদস্য সংখ্যা তিন থেকে পাঁচে বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে, যার মধ্যে কমপক্ষে একজন নারী সদস্য অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। স্বল্পমেয়াদি সংস্কার বাস্তবায়নে ছয় মাস সময় লাগবে, মধ্যমেয়াদি সংস্কার বাস্তবায়নে ১৮ মাস সময় লাগবে এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার বাস্তবায়নে ৪৮ মাস সময় লাগবে বলে কমিশন থেকে হিসাব কষা হয়েছে।
সরাসরি অর্থনৈতিক খাতে সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়নি, পরিকল্পনা উপদেষ্টা একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল সমতা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য অর্থনৈতিক কৌশল তৈরি করা। এই টাস্কফোর্স রিপোর্টে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে শক্তিশালী করতে পরিকল্পনা উপদেষ্টা আরও একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছেন যাতে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া উন্নত হয়, যা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে ব্যাংক খাত সংস্কারে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তিনটি টাস্কফোর্স গঠন হয়েছে। মোটাদাগে এগুলোর মূল কাজ হলো ব্যাংক খাতের সম্পদের গুণগত মান পর্যালোচনা করা, বাংলাদেশ ব্যাংকের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং ব্যাংক থেকে চুরি যাওয়া সম্পদ উদ্ধার ও খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। সরকার ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫’ অনুমোদন করেছে, যা বাংলাদেশ ব্যাংককে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থান উন্নয়নে করণীয় পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষমতা দিয়েছে।
আলোচিত আরেকটি সংস্কার হলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর পুনর্গঠন। গত ১২ মে সরকার ‘রেভিনিউ পলিসি অ্যান্ড রেভিনিউ ম্যানেজমেন্ট অর্ডিন্যান্স’ জারি করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে দুটি আলাদা বিভাগে ভাগ করার ঘোষণা দেয়- ‘রেভিনিউ পলিসি বিভাগ’ ও ‘রেভিনিউ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগ’।
এটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির একটি শর্ত ছিল। তবে কর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধির জন্য বহুদিন ধরেই অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা এ ধরনের বিভাজনের সুপারিশ করে আসছিলেন।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কথা অনুযায়ী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এ সময়ের মধ্যে নতুন করে সংস্কারের কতটা বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।