সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জে সাদা পাথর এলাকার পাথর সাবাড় করতে গিয়ে লুটেরা চক্র ধলাই নদের উৎসমুখ দ্বিখণ্ডিত করে দিয়েছে। তারা পর্যটন স্পটের মূল অংশের পাশে আরেকটি নৌপথ তৈরি করেছে। অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করে নির্বিঘ্নে পরিবহন করতেই তারা নদের গতিপথ পরিবর্তন করেছে।
মঙ্গলবার (১২ আগস্ট) সরেজমিনে গিয়ে এ চিত্র দেখা গেছে।
সাদা পাথর পর্যটন স্পটের মূল অংশের পূর্বপাশে ভারতীয় সীমান্তের পাহাড়সংলগ্ন যে স্থান, যেখানে পাথর ও ঝিরিঝিরি পানি ছিল, সেই জায়গা এখন নদী হয়ে গেছে। যে জায়গায় কিছুদিন আগেও মানুষজন হেঁটে বেড়াতেন, সে জায়গায় এখন দিব্যি নৌকা চলে। গত শুক্রবারও ধলাই নদের এই নতুন পথ দিয়ে লুট করা পাথর শ্রমিকদের নিয়ে যেতে দেখা যায়। ধলাই নদের উৎসমুখ থেকে শুরু হওয়া নতুন এই নৌপথ রোপওয়ের পয়েন্টের ঠিক পেছন দিক দিয়ে বের হয়ে আবার ধলাই মূল নদে মিলেছে।
ভোলাগঞ্জের স্থায়ী বাসিন্দারা জানান, সাদা পাথর পর্যটন স্পটের মূল অংশের পূর্বপাশে অসংখ্য পাথর ছিল। ফলে এদিকে কখনো নৌকা চলাচল করতে পারত না। সাদা পাথরে আসা পর্যটকরা এই পাথর ও ঝিরিঝিরি পানির মধ্যে হেঁটে বেড়াতেন। কিন্তু গত এক মাসে সাদা পাথরের এই অংশের সব পাথর পাথরখেকোরা তুলে নিয়ে যায়। পাথর তোলার পাশাপাশি পুরো জায়গা খুঁড়ে দৃশ্যত আরেকটি নদীপথ তৈরি করেছে।
সাদা পাথর পর্যটকবাহী নৌকার মাঝিরা জানিয়েছেন, ধলাই নদের মূল পথ দিয়ে পাথর নিয়ে গেলে অনেক সময় পাথর লুটেরাদের বাধার সম্মুখীন হতে হয়। তাই ধলাই নদের গতিপথই বদলে দিয়েছে এই অবৈধ পাথর উত্তোলনকারী সিন্ডিকেট।
মিজানুর রহমান নামের এক মাঝি বলেন, ‘এদিকে কোনো দিন নৌকা নিয়ে আসতে পারিনি। কারণ এদিকে অনেক পাথর ছিল। পাথরের কারণে আসা যেত না। অনেক দূরে নৌকা রাখতে হতো। এখন এই জায়গা থেকে বালু-পাথর নিয়ে অনেক গভীর করে গর্ত করে ফেলেছে। সে জন্য এখানে এখন সরাসরি নৌকা আসে। দুই-তিন মাস ধরে এই জায়গার অনেক পাথর লুটপাট হয়েছে। এখন সাদা পাথর মূল স্পটেই পাথর নেই।’
ধলাই উৎসমুখে এখন দুটি পথ তৈরি হয়েছে জানিয়ে পর্যটন ব্যবসায়ী সাইফুল বলেন, চার-পাঁচ বছর ধরে ডান পাশ দিয়েই নৌকা আসত। পর্যটন স্পটের বাঁ দিকে অনেক পাথর ছিল, তাই নৌকা আসত না। লুটপাটে এই জায়গাটাও নদীর মতো করে ফেলেছে। লুটের নৌকা এদিক দিয়েই যাওয়া-আসা করে।
সাদা পাথর প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট একটি পর্যটন কেন্দ্র। ২০১৭ সালে পাহাড়ি ঢলে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ পাথরমহালের ধলাই নদের উৎসমুখে পাঁচ একর জায়গাজুড়ে পাথর জমা হয়। ঢলের তোড়ে সেখানে এর আগে ১৯৯০ সালে একবার পাথর জমা হয়েছিল। সেসব পাথরকে ‘ধলা সোনা’ বলে অভিহিত করা হয়। তবে পাহাড়ি ঢলের পর লুটপাটে সেসব পাথর নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চল লুংলংপুঞ্জি ও শিলংয়ের চেরাপুঞ্জি। সেখানকার ঝরনা থেকে সারা বছর নদের পানি প্রবহমান থাকে। বৃষ্টিবহুল চেরাপুঞ্জির পাদদেশ থেকে বর্ষায় ঢলের পানির সঙ্গে পাহাড় থেকে পাথরখণ্ড এপারে নেমে আসে। ভেসে আসা এই পাথর উত্তোলিত বা আমদানি করা পাথরের চেয়ে দামি।
গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রথম দফা লুটপাটের আঁচড় লাগে সাদা পাথরে। এরপর প্রশাসনের দেখভালের অভাবে বছরব্যাপী চলে লুটপাট। সর্বশেষ গত এক মাসে সাবাড় হয় কয়েক স্তর পাথর। এ নিয়ে গত শনিবার খবরের কাগজে একটি সচিত্র প্রতিবেদন ও ভিডিও স্টোরি প্রকাশ হয়। অভিযোগ রয়েছে, পাথর লুটে সঙ্গে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি পদে থাকা পাথর ব্যবসায়ী হাজি সাহাব উদ্দিনসহ তার লোকজন জড়িত। এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় বিএনপি প্রায় পাঁচ মাস আগে তাকে শোকজ নোটিশ করেছিল। লুটপাটের বিষয়টি আলোচনায় এলে ১১ আগস্ট সাহাব উদ্দিনকে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
বিএনপি নেতার পদ হারানোর প্রতিক্রিয়ায় গত মঙ্গলবার সাদা পাথর পর্যটন স্পট সুনসান ছিল। অনেকটা জনমানবহীন থাকায় ধলাই নদের খণ্ডিত রূপটিও দৃশ্যমান হয়েছে। এ বিষয়ে পরিবেশবাদীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তারা ধলাই নদের উৎসমুখ খণ্ডনকে বিপর্যয়কর বলে মন্তব্য করেন।
নদের উৎসমুখ খণ্ডিত হওয়া শুধু প্রকৃতির জন্য বিপর্যয়কর নয় বরং ভয়ংকর বলে মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক ওয়াটারকিপার অ্যালেয়েন্স ঘোষিত নদী সংগ্রামী ও সুরমা রিভারওয়াটারকিপার আব্দুল করিম চৌধুরী কিম। তিনি বলেন, সিলেট অঞ্চলে যে কটি নদ-নদী দিয়ে পাহাড়ি ঢল নামে, এর মধ্যে ধলাই অন্যতম। এ নদের উজানে পুরোটা মেঘালয় পাহাড়। এটি বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা হয়ে সিলেট ও সুনামগঞ্জের দীর্ঘতম নদী সুরমার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এ খণ্ডনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া পাহাড়ি ঢল নামলেই টের পাওয়া যাবে।
সিলেটের পরিবেশবাদীদের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ভূমিসন্তান বাংলাদেশের’ প্রধান সমন্বয়ক মোহাম্মদ আশরাফুল কবীর বলেন, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন করলে প্রথম তো নদীভাঙন, ভূমিধস, বন্যা হয়। সিলেটে প্রায় প্রতিবছরই বন্যা হয়। এই বন্যার সম্মুখীন হন সবার আগে সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জ এলাকার মানুষজন। এবার এখনো সিলেটে বন্যা হয়নি। কিন্তু এই বর্ষাকালে যদি ভারতের পাহাড়ি ঢল নামে এবং বন্যা হয়, তাহলে এই নদীপথ পরিবর্তনের ফলে বন্যায় ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হবে। নদীর গতিপথ পরিবর্তনে প্রত্যক্ষভাবে প্রকৃতির ক্ষতি হচ্ছে মনে হলেও এর বিরূপ প্রভাব সব মানুষের ওপরই পড়বে। কারণ মানুষ তো প্রকৃতিরই অংশ। আজকে ধলাই নদের গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে। কাল দেখা যাবে সুরমা নদীর কেউ গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছে।
এ ব্যাপারে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা ও সিলেট জেলা প্রশাসনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবী গত ৯ আগস্ট খবরের কাগজকে বলেছিলেন, ‘ঘটনাস্থল পরিদর্শনের জন্য ইতোমধ্যে একটি টিম সেখানে পাঠিয়েছি। অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধে আমরা পুলিশ, বিজিবিসহ সবার সমন্বয়ে একত্রিত হয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ এ বিষয়ে পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে জানতে গত মঙ্গলবার বিকেলে তার মোবাইল ফোনে একাধিকার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
প্রশাসনের এ ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ভূমিসন্তান বাংলাদেশের প্রধান সমন্বয়ক আশরাফুল বলেন, ‘আমরা যারা পরিবেশকর্মী আছি, আমরা আন্দোলন করি, পলিসি মেকিংয়ে যারা আছেন তাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে পলিসি মেকিংয়ে যারা আছেন, তারাই আত্মসমর্পণ করে ফেলেছেন। তাহলে সিলেটের প্রাণ ও প্রকৃতি কীভাবে রক্ষা হবে?’
আরও পড়ুন:
> ‘মব মচ্ছবে’ সাদা পাথরের ‘সর্বনাশ’
> সিলেটের ভোলাগঞ্জ সাদা পাথরে ‘লুটের আঁচড়’
> সাদাপাথর লুটপাটের ঘটনা তদন্তে দুদক
> খবরের কাগজে সংবাদ প্রকাশ: সাদা পাথর লুট করে পদ হারালেন বিএনপি নেতা হাজি সাহাব উদ্দিন
> ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে বাঙ্কারের পাথর সাবাড়