চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিংকে বলা হয় ‘চির বসন্তের নগরী’। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩ হাজার ফিট ওপরে, নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার এই শহরের যেদিকেই তাকানো যায়, সেখানেই মেলে ফুলের সমারোহ। দেখা যায় নানা প্রজাতির গাছপালা আর রংবেরঙের ফুলের গাছ। এই শহরটিতেই রয়েছে এশিয়ার বৃহত্তম এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তাজা ফুলের আন্তর্জাতিক বাজার। এই শহর থেকেই বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশে রপ্তানি হয় কয়েক বিলিয়ন ডলারের তাজা ফুল।
আবহাওয়ার সঙ্গে মিল থাকায় কৃষিপ্রধান বাংলাদেশেরও ফুল রপ্তানির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে গার্মেন্টস সেক্টরের পাশাপাশি ফুল রপ্তানিও হতে পারে বাংলাদেশের আরেকটি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন সেক্টর। বাংলাদেশের যশোর জেলার গদখালী, ঝিকরগাছাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ ফুল উৎপাদন হয়। কিন্তু অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ, মান নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি, আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তির অভাব এবং দুর্বল বিপণন ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের কৃষকরা প্রায়ই ক্ষতির মুখে পড়েন। ঢাকার বিভিন্ন বাজারে আসার অনেক আগেই নষ্ট হয়ে যায় অনেক ফুল। এতে ফুলচাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আধুনিক সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশের ফুলচাষিরাও লাভবান হতে পারেন এবং বিদেশে রপ্তানি করেও বৈদেশিক মুদ্রা আয় করার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ-চীন কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছরপূর্তি উপলক্ষে চীন সরকারের আমন্ত্রণে ও প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদারের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের একটি সাংবাদিক প্রতিনিধিদল সম্প্রতি কুনমিং সফর করে। প্রতিনিধিদলটিকে কুনমিংয়ে উৎপাদিত ফুলের আন্তর্জাতিক নিলাম কেন্দ্র ঘুরিয়ে দেখানো হয়। প্রতিনিধিদলকে নিলাম কেন্দ্রের বিভিন্ন সেবা এবং রপ্তানিযোগ্য ফুলের প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতি সম্পর্কে অবহিত করেন মার্কেটের পরিচালক লি শিয়ান। এ বাজারেই রয়েছে চীনের একমাত্র ফুল নিলাম কেন্দ্র-কুনমিং ইন্টারন্যাশনাল ফ্লোরা অকশন ট্রেডিং সেন্টার (কেআইএফএ)। এখান থেকেই দেশি-বিদেশি প্রায় ৬ হাজার ফুল ক্রেতা নিলাম প্রক্রিয়ায় অংশ নেন। প্রতিদিন স্থানীয় সময় দুপুর ১টা থেকে কুনমিংয়ের এই সেন্টারে উৎপাদিত প্রায় এক হাজার প্রজাতির ফুলের নিলাম প্রক্রিয়া শুরু হয়। কুনমিং ফুল নিলাম কেন্দ্রের দৃশ্য অনেকটাই বাংলাদেশের পুঁজিবাজার পদ্ধতির মতো।
প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আজাদ বলেন, ‘কুনমিংয়ের প্রযুক্তিগত সহায়তা গ্রহণ করে বাংলাদেশেও একই ধরনের আধুনিক ফুলের বাজার গড়ে তোলা সম্ভব। ডিজিটাল মার্কেটিং কৌশল ব্যবহার করে দেশীয় ও আঞ্চলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানির নতুন দ্বার উন্মোচন হতে পারে। এতে ফুল চাষের মাধ্যমে দেশের বহু মানুষ দারিদ্র্যমুক্ত হতে পারবেন। এ জন্য চীন বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ সহায়তা দিতে আগ্রহী। এ সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশের লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে।’
লি শিয়ান জানান, কুনমিংয়ের এই বাজারে আসা মোট ফুলের প্রায় ৯০ ভাগই ইউনান প্রদেশে উৎপন্ন হয়। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করে গ্রিনহাউস পদ্ধতিতে চীনের কুনমিংয়ে ১৫ লাখ হেক্টর জমিতে ফুল চাষাবাদ হয় এবং এ শিল্পের সঙ্গে ৫০ লাখ মানুষ ০জড়িত। এই ফুলের বাজারে গত বছর লেনদেন হয় ১৪ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার। এর আর্থিক মূল্য ২ বিলিয়ন ডলার। প্রতিদিন বিকেল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ইউনানের বিভিন্ন এলাকা ও পাশের প্রদেশ থেকে বিশেষ রেফ্রিজারেটেড ট্রাকে ফুল এসে পৌঁছায় কুনমিং ফ্লোরা অকশন সেন্টারে। উৎপাদকরা সরবরাহ করেন গোলাপ, কার্নেশন, লিলি, জিপসোফিলা, জারবেরা, লিলি, রজনিগন্ধা, গাঁদাসহ নানা ফুল। ফুল পৌঁছানোর পরপরই শুরু হয় কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ও গ্রেডিং প্রক্রিয়া। কাণ্ডের দৈর্ঘ্য, দৃঢ়তা, ফুলের আকার, পরিপক্বতা, রং, সতেজতা ও ত্রুটিমুক্ততা পরীক্ষা করা হয়। এরপর ফুলগুলোকে এ, বি, সি, ডি- এমন নানা গ্রেডে ভাগ করা হয়। গ্রেড অনুযায়ী দামও ওঠানামা করে। এ, গ্রেডের ফুলের দাম সম্পর্কে লি শিয়ান বলেন, ‘বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৫ টাকা।’
লি জানান, স্বয়ংক্রিয় মেশিনের সাহায্যে ফুলের প্রজাতি, রং, দৈর্ঘ্য ও গ্রেড অনুযায়ী সাজিয়ে নিলামের জন্য প্রস্তুত করা হয়। তিনি বলেন, ‘কুনমিং নিলাম কেন্দ্রের অবকাঠামো বিশাল ও আধুনিক। এতে রয়েছে বৃহৎ রিসেপশন ও স্টোরেজ হ্যাঙ্গার, স্বয়ংক্রিয় গ্রেডিং লাইন, নিলাম হল, প্যাকিং স্টেশন, কোল্ড স্টোরেজ, ডেটা সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম। আন্তর্জাতিক নিলাম কেন্দ্রে একযোগে ৬০০ জন ফুল ক্রেতার জন্য রয়েছে স্বতন্ত্র ডেস্ক ও কম্পিউটার। অনলাইন নিলাম প্রক্রিয়ায় ক্রেতা ও বিক্রেতাকে রিয়েল-টাইম লেনদেন, বাজারদর দেখা ও লট ট্র্যাকিংয়ের সুবিধা দেয়।
লি শিয়ান আরও বলেন, নিলাম পদ্ধতি সম্পূর্ণ ডিজিটাল, দ্রুতগতির ও স্বচ্ছ। কুনমিংয়ে প্রতি ৪ সেকেন্ডে একটি লেনদেন সম্পন্ন হয়। ডাচ পদ্ধতিতে স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় নিলাম শুরু হয়, যেখানে দাম উচ্চ থেকে নিম্নগামী হয়। বড় পর্দায় ফুলের ছবি, পরিমাণ, গ্রেড, উৎপাদকের কোড প্রদর্শিত হয়। হাজারো ক্রেতা, স্থানীয় পাইকার, আন্তর্জাতিক রপ্তানিকারক, ফুল দোকানি, প্রসেসিং কোম্পানি ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান নিলামে অংশ নেন। রিমোট অ্যাকসেস সিস্টেমের মাধ্যমে চীনের যেকোনো প্রান্তের ব্যবসায়ী নিলামে অংশগ্রহণ করতে পারেন। কুনমিং নিলাম কেন্দ্রের অংশীদার প্রতিষ্ঠান বেইজিং ফ্লাওয়ার ট্রেডিং সেন্টারের সহায়তায় ছোট-বড় সব ব্যবসায়ী সমানভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারেন। তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ লেনদেন সম্পন্ন হয় ‘হুয়াশেংবেও’ অ্যাপের মাধ্যমে, যেখানে অর্থ স্থানান্তর ও লেনদেন তথ্য নথিবদ্ধ থাকে।
কুনমিংয়ের ফুল নিলাম কেন্দ্রের বিগ ডেটা ও এআইনির্ভর লজিস্টিক নেটওয়ার্ক এমনভাবে তৈরি যে, তা সম্ভাব্য আঞ্চলিক চাহিদা ঠিক করতে পারে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্যাকেজিং সারতে পারে। নিলাম শেষে ক্রেতার নাম ও গন্তব্য অনুযায়ী ফুল সাজিয়ে প্যাকিং জোনে পাঠানো হয়। উন্নত কোল্ড চেইন সুবিধা যেমন- কুলিং রুম, রেফ্রিজারেটেড ট্রাক ও কনটেইনার ফুলের সতেজতা ধরে রাখে। কোল্ড চেইন প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে অনেক চালান বিমান ও উচ্চগতির ট্রেনেও পাঠানো হয়। পরিবহনকালে ফুলের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে সতেজতা নিশ্চিত করে আইওটি সেন্সর। ফলে দুপুরে বিক্রি হওয়া ফুল পরদিনই জাপান, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ ৪০টি দেশে পৌঁছে যায় সতেজ অবস্থায়।