ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে পুরুষ প্রার্থীদের পাশাপাশি রয়েছেন নারীরাও। পুরুষের তুলনায় তারা সংখ্যায় কম হলেও আসন্ন নির্বাচনে তারা বেশ ভালো প্রভাবকের ভূমিকা পালন করবেন বলে মনে করা হচ্ছে। শীর্ষ পদসহ ডাকসুর ২৮ পদের সবকয়টিতেই লড়বেন নারীরা। অনেকের মতে, বেশ হাড্ডাহাড্ডি একটি লড়াই হবে। কেননা এই নারী প্রার্থীদের অনেকেই জুলাই অভ্যুত্থানে সম্মুখসারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তা ছাড়া ভোটারদের প্রায় ৪৮ শতাংশ নারী । সে কারণে নারী প্রার্থীদের জেতার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তাদের শঙ্কা সাইবার বুলিং নিয়ে, যা ভোটের ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বুলিং দমনে জোরালো ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। তারা মনে করেন, সাইবারসহ নানা ধরনের বুলিংয়ের শিকার না হলে আরও ভালো ও সম্ভাবনাময় নারী নেতৃত্ব শুধু ডাকসুতে নয়; জাতীয় রাজনীতিতেও উঠে আসত।
এ ব্যাপারে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ নেতৃত্বাধীন ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেলের সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদপ্রার্থী আশরেফা খাতুন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আওয়ামী শাসনামলে যেসব নারী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাজনীতি করতেন, তাদের নানাভাবে হেনস্তা করা হতো। খালেদা জিয়া (বিএনপি চেয়ারপারসন) থেকে শুরু অনেক নারী সম্পর্কে নানা অপপ্রচার করে তাদের কোণঠাসা করে রাখার প্রক্রিয়া চলমান ছিল। আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এটি থাকবে না। কিন্তু এখন আগের মতোই শুরু হয়েছে, যা নারীদের মানসিক ট্রমার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।’
আশরেফা খাতুন বলেন, ‘ডাকসুর ক্ষেত্রে বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের তৎপরতা বাড়াতে পারে, একই সঙ্গে যেসব প্যানেল এবং যারা প্রার্থী রয়েছেন তারা একটু কঠোর হতে পারেন। নারীদের বুলিং করা, এটি শুধু ডাকসু প্রার্থীদের ব্যাপারে আলোচনা হওয়া উচিত না, এটি জাতীয় সমস্যা। তাই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যারা রয়েছেন, তাদের উচিত হবে এ নিয়ে শক্ত কোনো আইন প্রণয়ন করা। যেন শুধু নারী নেতৃত্ব নয়, পুরো নারী জাতি যেন হেনস্তা এবং সাইবার বুলিং থেকে চিরদিনের জন্য মুক্তি পান।’
বাম গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট প্যানেল প্রতিরোধ পর্ষদের সহসভাপতি (ভিপি) পদপ্রার্থী শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি খবরের কাগজকে বলেন, ‘অনেক নারী রয়েছেন, যারা কিনা অনেক পুরুষ নেতৃত্বের চেয়েও অনেক বেশি দক্ষ। কিন্তু তারা অবমূল্যায়ন, সাইবার বুলিংয়ের কারণে নিজেকে গুটিয়ে নেন। চরিত্র, অ্যাপিয়ারেন্স নিয়ে নোংরা আক্রমণ করা হয়। যেটি আমাদের সহযোদ্ধাসহ সবার বোঝা উচিত।’
তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এসব বুলিং অবশ্যই ভোটে প্রভাব বিস্তার কররে। যদি এমন বৈরী পরিবেশ না থাকত, আমরা অনেক দক্ষ নারী নেতৃত্ব পেতাম।’
৯ প্যানেলে ৩৮ নারী প্রার্থী
জানা গেছে, এখন পর্যন্ত ৯টি পূর্ণাঙ্গ প্যানেল প্রকাশ্যে এসেছে। এই প্যানেলগুলো থেকে ডাকসুতে প্রায় ৩৮ নারী প্রার্থী লড়বেন। ইসলামী ছাত্রশিবিরের ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল থেকে ৪ জন, গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’ থেকে ৬ জন, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্যানেল থেকে ২ জন, বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর মোর্চা ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট’ সমর্থিত প্যানেল ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ থেকে ১২ জন, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন (মাহির-বাহাউদ্দিন), সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (বাসদ) ও ছাত্রলীগ-বিসিএল (বাংলাদেশ জাসদ) এই ৩ বাম সংগঠনের যৌথ প্যানেল ‘অপরাজেয় ৭১-অদম্য ২৪’ থেকে ২ জন, ছাত্র অধিকার পরিষদের ‘ডাকসু ফর চেঞ্জ’ থেকে ১ জন, ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ’ থেকে ২ জন এবং ‘স্বতন্ত্র ঐক্যজোট’ প্যানেল থেকে ৬ নারী প্রার্থী রয়েছেন ডাকসুর ২৮ পদের বিপরীতে। এ ছাড়া স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীরা তো রয়েছেনই, যদিও তাদের সংখ্যা এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন থেকে পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, প্রার্থিতা চূড়ান্ত করা হলেও সামনে আসবে নারী প্রার্থীদের মোট সংখ্যা।
ছাত্রশিবিরের প্যানেলে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ফাতেমা তাসনিম জুমা আর পাঠকক্ষ ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে আছেন উম্মে সালমা। পাশাপাশি দুই নারীও এই প্যানেল থেকে সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তারা হলেন সাবিকুন নাহার তামান্না ও আফসানা আক্তার।
বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের প্যানেল এজিএস (সহ-সাধারণ সম্পাদক) পদে আশরেফা খাতুনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক পদে আনিকা তাহসিনা, কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে মিতু আক্তার এবং সদস্য পদে তাপসী রাবেয়া, রওনক জাহান ও মাহফুজা নওয়ার নওরীনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তবে ইমি ও বসুর নেতৃত্বে ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ প্যানেলে সবচেয়ে বেশি নারী প্রার্থী রয়েছেন। এই প্যানেলে ভিপি পদে শেখ তাসনিম আফরোজকে (ইমি) ছাড়াও কমনরুম ও ক্যাফেটরিয়া পদে নুজিয়া হাসিন রাশা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক পদে ফারিয়া মতিন, ক্রীড়া সম্পাদক পদে মালিহা তাবাসসুম, স্বাস্থ্য ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক পদে শেখ তাসনুভা সৃষ্টিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এই প্যানেলে সদস্য পদে মিশকাতুল মাশিয়াত, আতিকা আনজুম অর্থী, পৃথিং মারমা, ইসরাত জাহান ইমু, আনিয়া ফাহমিন, রাহনুমা আহমেদ নিরেট এবং হেমা চাকমা প্রার্থী হয়েছেন।
‘সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেল থেকে সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচন করছেন ফাতেহা শারমিন (এ্যানি)। স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক পদে মেহেরিন আফরোজ মাইশা প্রার্থী হয়েছেন। এ ছাড়া অপরাজেয় ৭১-অদম্য ২৪ প্যানেল থেকে এজিএস পদে অদিতি ইসলাম, কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়াবিষয়ক সম্পাদক পদে সুর্মী চাকমা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য প্যানেল থেকে ভিপি পদে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা, সদস্য পদে নওরীন সুলতানা লড়বেন।
এ ছাড়া মেয়েদের পাঁচ হলে ১৩ পদের বিপরীতে ১৮৮ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলের ৩১ জন, রোকেয়া হলের ৪৫ জন, শামসুন নাহার হলের ৩৬ জন, ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হলের ৩৬ জন এবং কবি সুফিয়া কামাল হলের ৪০ জন প্রার্থী হয়েছেন।
উল্লেখ্য, ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য ১ হাজার ৬১৮ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। মোট ২৬২ পদের বিপরীতে এই দেড় হাজারের বেশি প্রার্থী শিক্ষার্থী প্রতিনিধি হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। আগামী ২৬ আগস্ট চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে। চার দিনের মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহার শেষে ২৬ আগস্ট প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ এবং সব শেষে ৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।