আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে করখেলাপিদের অংশগ্রহণ ঠেকাতে কঠোর হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা করে তাদের কর নথি (আয়কর রিটার্ন) খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এ কাজ করতে প্রতিটি কর সার্কেল থেকে তিনজন করে কর্মকর্তা নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। টাস্কফোর্সের কর্মকর্তারা সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা করবেন। এরপর তাদের কর নথিতে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে প্রকৃত আয়-ব্যয়, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য ও সম্পদের হিসাব মিলিয়ে দেখবেন। এসব তথ্য যাচাই করতে ভ্যাট নিরীক্ষা গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সহযোগিতা নেওয়া হবে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের কারও হিসাবে বড় ধরনের গরমিল পাওয়া গেলে আরও বিস্তারিত তদন্তের জন্য এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলে (সিআইসি) পাঠানো হবে। এখানে তদন্ত শেষে তথ্য গোপনের প্রমাণ পাওয়া গেলে এনবিআর তার বিরুদ্ধে মামলা করবে। জরিমানাসহ বকেয়া কর আদায় করা হবে।
করখেলাপিদের বিষয়ে এনবিআরের সিদ্ধান্ত জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও নির্বাচন কমিশনে সম্প্রতি চিঠি পাঠানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, নির্বাচনে অংশ নিতে হলে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে অবশ্যই এনবিআর থেকে অনুমোদিত আয়কর পরিশোধের প্রত্যয়নপত্র (রসিদ) জমা দিতে হবে।
অতীতে দেখা গেছে, করখেলাপিরা রাজস্ব আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। অনেক করখেলাপি পাওনা কর থেকে নামমাত্র কিছু দিয়ে বাকিটা পরিশোধ করার জন্য এনবিআরে আবেদন করে সময় বাড়িয়ে নিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে করখেলাপিদের কাছ থেকে এনবিআরের অনেক অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী অনৈতিক সুবিধা নিয়ে নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর কর পরিশোধের নির্ধারিত দিন ধার্য করেছেন।
আবার এমনও দেখা গেছে, যখন কোনো করখেলাপি নির্বাচনে প্রার্থী হতে চেয়েছেন এবং আয়কর পরিশোধের প্রত্যয়নপত্রের জন্য আবেদন করেছেন, তখন এনবিআর থেকে বলা হয়েছে কর পরিশোধ না করলে প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হবে না। তখন তিনি রাজস্ব আইনে মামলা করেছেন। কিন্তু মামলার রায়ে একজন ব্যক্তিকে করখেলাপি হিসেবে নিশ্চিত না করা পর্যন্ত ওই ব্যক্তিকে করখেলাপি বলা যায় না। অর্থাৎ যতদিন মামলা চলমান থাকে, ততদিন ওই ব্যক্তিকে কেবল অভিযুক্ত বলা যায়। আইনের এ ধারার সুযোগে করখেলাপিরা জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩৩ হাজার রাজস্ব মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে একটি নতুন রাজস্ব মামলা নিষ্পত্তি হতে কত সময় লাগবে, তা বলা কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে এক যুগ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও নির্বাচন কমিশনে পাঠানো চিঠিতে এনবিআর থেকে করখেলাপিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ আটকাতে কিছু আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তাব জানিয়ে বলা হয়েছে, এবার কোনো করখেলাপি কর প্রত্যয়নপত্র পাওয়ার জন্য মামলা করলে বিকল্প বিরোধ আইনের আওতায় বাধ্যতামূলকভাবে তা দ্রুত নিষ্পত্তি করা হবে। কোনো করখেলাপি নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়পত্রপত্র জমা দেওয়ার আগের ছয় মাসে বা তারচেয়ে কম সময়ে মামলা করলে এনবিআর থেকে কর পরিশোধের প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হবে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, আগের নির্বাচনগুলোতে অংশগ্রহণকারীদের বেশির ভাগই ব্যবসায়ী ছিলেন। তারা ছিলেন সমাজের প্রভাবশালী। এসব ব্যক্তি নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। তাদের কাছ থেকে পাওনা কর আদায়ে এনবিআরের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী যেতেন কর পরিশোধের পরিবর্তে ওই সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হতো। প্রভাব খাটিয়ে তাদের বদলি করা হতো।
এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান খবরের কাগজকে বলেন, এনবিআরের কাজ রাজস্ব আদায় করা। এনবিআর সেই কাজটিই করবে। করখেলাপিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি এনবিআর নিরুৎসাহিত করে। দেশসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হলে অবশ্যই উচিত কর পরিশোধ করে নির্বাচনে অংশ নেওয়া।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে দেওয়া তার সর্বশেষ ভাষণে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে বলে জানিয়েছেন। জাতীয় নির্বাচনের দুই মাস আগে তফসিল ঘোষণা করা হবে। এরপর নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে। সরকার-নির্ধারিত সব ধরনের শর্ত পূরণ করার পরই কেবল কাউকে প্রার্থী করা হবে। বিশেষভাবে ঋণ ও বিলখেলাপিদের নির্বাচনের অযোগ্য বলে বিবেচনা করা হবে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, আয়কর পরিশোধের প্রত্যয়নপত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি, যা প্রার্থীকে তার হলফনামার সঙ্গে জমা দিতে হয়। যেখানে প্রার্থীর সম্পদ ও আয়ের বিবরণী উল্লেখ থাকে। এটি প্রার্থীর আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে।
তিনি আরও বলেন, অতীতে এনবিআর আপত্তি করলেও করখেলাপিরা বিভিন্ন কৌশল করেন, প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। কোনো প্রার্থী করখেলাপি হলে তাকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া উচিত না। এ বিষয়ে এনবিআরকে কঠোর হতে হবে। প্রত্যেক প্রার্থীকে আয়কর আইন অনুযায়ী আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হবে। আয়কর পরিশোধের পর প্রত্যেক প্রার্থীকে কর প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করতে হবে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠান শেষে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাংকের ঋণখেলাপিরা অংশ নিতে পারবেন না। এবারে করখেলাপিদের বিষয়েও খোঁজ নেওয়া হবে।