বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের বেশ কিছু হত্যা মামলার তদন্ত ও বিচার-প্রক্রিয়ায় এবার লাশের গোসলকারীদের বর্ণনা আমলে নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়েছিল, সেগুলোর ক্ষেত্রে এখন গোসলকারীদের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বলতে গেলে, ময়নাতদন্তের বিকল্প হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হচ্ছেন ‘লাশের গোসলকারীরা’।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, এরই মধ্যে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তাদের দায়িত্বে থাকা ময়নাতদন্তবিহীন অধিকাংশ লাশ উত্তোলন এবং যথাযথ আইনি-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা লাশের গোসলকারীদের বক্তব্য গ্রহণ করেছেন। পিবিআই ছাড়াও সিআইডি, ঢাকা মহানগর পুলিশ ও বিভিন্ন জেলা পুলিশও একইভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ কথা জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, যেকোনো ধরনের হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার-প্রক্রিয়ায় ময়নাতদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শহিদ অনেকেরই লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়েছিল। এতে ওই সব হত্যা মামলার যথাযথ তদন্ত ও বিচার-প্রক্রিয়াতেও কিছুটা জটিলতা দেখা দেয়। চলতি মাসে রায়েরবাজার কবরস্থান থেকে ১১৪ জনের লাশ উত্তোলন করে তাদের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এরই মধ্যে অধিকাংশ লাশ উত্তোলন করে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন আগে দাফন হওয়ায় অধিকাংশের ক্ষেত্রে ময়নাতদন্তের কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে এর বিকল্প হিসেবে লাশের গোসলকারী অন্তত দুজনের বক্তব্য বা লাশের শরীরের আঘাতজনিত বর্ণনাকে গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো। ফলে ওই সব লাশ গোসলকারী হত্যা মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে বিবেচিত হবেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে গত মঙ্গলবার যোগাযোগ করা হয় পিবিআই সদর দপ্তরে। পিবিআইয়ের গণমাধ্যম শাখার পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসুফ খবরের কাগজকে বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের হত্যা মামলাগুলোর মধ্যে মোট (জিআর) ৪৬টি মামলা আসে পিবিআইয়ে। এর মধ্যে ৩৪টি লাশেরই ময়নাতদন্ত করা ছিল না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অধিকাংশ লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে ময়নাতদন্তসহ আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। যেহেতু অনেক দিন (প্রায় এক বছর) আগে দাফন হয়েছে, তাই অনেক আলামতই এখন আর পাওয়া যায়নি। তাই যারা লাশ গোসলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের বক্তব্য গ্রহণ করা হয়েছে।’
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনসংক্রান্ত ঘটনায় সারা দেশের বিভিন্ন থানায় মোট মামলা হয় ১ হাজার ৭৩০টি। এর মধ্যে হত্যা মামলার সংখ্যা ৭৩১টি। এসব মামলার বেশির ভাগ রয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) হাতে। এ ছাড়া পিবিআই, সিআইডি এবং বিভিন্ন জেলা পুলিশের হাতেও রয়েছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মামলা।
ডিএমপি সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর থানাগুলোতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন ঘটনায় মোট ৭১৫টি মামলা হয়। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৪৪৬টি। এসব মামলা ডিএমপির ক্রাইম বিভাগ এবং বিভিন্ন ইউনিট তদন্ত করছে।
এ ছাড়া পিবিআই সদর দপ্তর জানিয়েছে, তাদের কাছে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হত্যাসহ বিভিন্ন ধারায় শতাধিক সিআর (কমপ্লেইন রেজিস্টার) মামলা তদন্তাধীন। সিআর মামলা আদালতের মাধ্যমে হয়। হত্যা মামলার (সিআর) সংখ্যা ২৫টি। অন্যদিকে জিআর (জেনারেল রেজিস্টার) মামলা অর্থাৎ যেগুলো সরাসরি থানায় দায়ের করা হয়েছে সেগুলোর সংখ্যা ৬৪টি। এর মধ্যে ৪৬টি হত্যা মামলা (জিআর) তদন্ত করছে পিবিআই।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন মামলার তদন্ত এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় বিরাট ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে ময়নাতদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বা কীভাবে মারা গেছে, তা জানা যায়। এসব লাশের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে হবে। এ ছাড়া আইনি কার্যক্রম শেষে ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করে তাদের পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।’
এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. দীপিকা রায় খবরের কাগজকে বলেন, ‘ময়নাতদন্ত বা ডিএনএ পরীক্ষার যথাযথ ফলাফল পেতে হলে লাশের আলামত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত লাশের শরীর বা বডির কাঠামো যদি ঠিক থাকে, তাহলে ময়নাতদন্তের সঠিক ফলাফল পাওয়া যায়।’
এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন সাধারণত যেকোনো হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে হত্যা মামলার বিচারটি কোন আদালতে হচ্ছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদি সাধারণ হত্যা মামলা বা দায়রা জজ আদালতের মামলা হয়, তখন ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন অনেকটাই অত্যাবশ্যকীয় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু মামলাটি যদি বিশেষ আদালতে হয় বা বিশেষ ধরনের হয়, তখন ময়নাতদন্ত ছাড়াও বিচারিক কাজ সম্পন্ন করা যায়। বিশেষ করে যদি লাশ সমুদ্রে ফেলা হয়, গায়েব করা হয়, পুড়িয়ে ফেলা হয় বা আসামি হত্যার কথা স্বীকার করেন, তখন এসব ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত ছাড়াও বিচার সম্পন্ন করা যায়।’
উদাহরণ দিয়ে অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে জুলাই-আগস্টের গণহত্যার বিচার চলছে। এর আগে এই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হয়েছে। সেখানে ময়নাতদন্ত তো দূরের কথা, অনেক আলামতই ছিল না। কিন্তু তার পরও বিচার সম্পন্ন হয়েছে, যা মূলত পারিপার্শ্বিক অবস্থা, ছবি বা ভিডিও এবং সাক্ষীদের সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। ফলে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তবে এটি ছাড়াও বিচার করা যাবে, এ বিষয়ে আইনেও বাধা নেই।’
প্রসঙ্গত, গত ৪ আগস্ট আদালত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহত ১১৪ জনের লাশ উত্তোলন করে তাদের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানের নির্দেশ দেন, যাদের রাজধানীর রায়েরবাজার কবরস্থানে গণকবর দেওয়া হয়েছিল। পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান এ আদেশ দেন।