জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫ এর সমন্বিত চূড়ান্ত খসড়ার ওপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে সম্প্রতি মতামত পেয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এ পর্যায়ে এই সনদের চূড়ান্ত রূপ এবং প্রয়োজনীয় আইনি ও নীতিগত কাঠামো নির্ধারণ আটকে আছে রাজনৈতিক দলগুলোর চূড়ান্ত মত ও সম্মতির (স্বাক্ষর) ওপর। জানা গেছে, এই সম্মতি আদায়ে সোমবার (১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জাতীয় সংসদ এলাকার এলডি হলে পুনরায় দলগুলোর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক শুরু করবে ঐকমত্য কমিশন। তাদের লক্ষ্য আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই জুলাই জাতীয় সনদ চূড়ান্ত করা।
এর আগে চূড়ান্ত খসড়ার বিষয়ে মতামত পেতে কমিশনের পক্ষ থেকে গত ১৬ আগস্ট সনদের কপি দলগুলোর কাছে পাঠানো হয়।
জুলাই সনদের খসড়ায় উল্লেখ করা হয়, জনগণের সর্বজনীন অভিপ্রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে এই সনদ প্রণয়ন করা হয়েছে। তাই এই সনদ প্রচলিত আইন বা আদালতের রায়ের ওপর প্রাধান্য পাবে; এ জন্য একটি বিশেষ সাংবিধানিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। ঐকমত্য কমিশন এই সনদ নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রাখতে চায় না। এই জুলাই সনদকে সর্বোচ্চ আইনি ভিত্তি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি প্যানেল প্রস্তুত করা হয়। এরপর জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উপায় খুঁজতে এ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে ৪ দফা বৈঠক করেছে ঐকমত্য কমিশন।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে পাওয়া মতামত, আপত্তি ও পরামর্শ পর্যালোচনা করেছে কমিশন এবং তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত খসড়াতেও কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে।
এদিকে রাষ্ট্র সংস্কারের নানা ইস্যুতে তৈরি প্রস্তাবিত জুলাই সনদ নিয়ে কয়েক দফা আলোচনার পরও এর বাস্তবায়ন কীভাবে হবে- তা নিয়ে এখনো রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি ঐকমত্য কমিশন। ফলে সংকট সমাধানে এখনো রাজনৈতিক দলগুলোর দিকেই তাকিয়ে আছে কমিশন। এদিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপির অবস্থান হলো- আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদ গঠিত হলে নির্বাচিত সংসদই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে। এর ঠিক বিপরীত অবস্থান নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদের মতো দলগুলো। তারা গণভোট-গণপরিষদ নির্বাচন কিংবা অধ্যাদেশের মাধ্যমে এই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে এখনো অনড় অবস্থানে রয়েছে।
প্রথমে নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে সনদ বাস্তবায়নে বিএনপি অনড় থাকলেও এখন আলোচনায় যেতে আগ্রহী দলটি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, এগুলো নিয়ে আলোচনার মধ্য দিয়ে একটা ব্যবস্থা বের করা যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। সেই আলোচনায় আমরা অংশগ্রহণ করব। অন্যদিকে এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামী বলছে, আগামীতে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। যে কারণে শিগগিরই ঐকমত্য কমিশনের স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ গণভোট কিংবা গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে বাস্তবায়নের তাগিদও দিচ্ছেন তারা।
অন্যদিকে সিপিবিসহ বামজোটের নেতারা বলছেন, সনদের ইস্যুগুলো নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। এক্ষেত্রে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা দেখছেন না তারা। এ বিষয়ে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স খবরের কাগজকে বলেন, ‘সনদের ইস্যুগুলোতে কমিশন বৈঠকে অনেক বার আলোচনা হয়েছে। অনেক ইস্যুতে তো আমাদের ঐকমত্য হয়েই আছে। মতামতও আমরা দিয়েছি। কাজেই নতুন আলোচনার প্রয়োজন দেখছি না। আমার মতে কমিশনের বৈঠকে যেসব ইস্যুতে দলগুলোর সর্বসম্মতি ছিল সেগুলোতে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়েছে ধরতে হবে। তবে যেসব ইস্যুতে নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে সেগুলোকে পুরোপুরি ঐকমত্য ধরা যাবে না। পুরোপুরি ঐক্য হওয়া ইস্যুগুলোর মধ্যে যেগুলো বর্তমান আইন পারমিট করে সেগুলো বাস্তবায়ন হতে পারে। তবে যেসব ইস্যুতে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে সেগুলো বাস্তবায়ন করবে পরবর্তী নির্বচিত পার্লামেন্ট। এর বাইরে মাঝামাঝি কিছু আছে বলে মনে করি না।’
ঐকমত্য কমিশন সূত্রে জানা গেছে, জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত খসড়ার বিষয়ে ২৯টি রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে মতামত পেয়েছে কমিশন। তবে সব দলের সম্মতি ছাড়া এ বিষয়ে পুরোপুরি ঐকমত্যে পৌঁছানো এবং এই সনদ কার্যকর করা সম্ভব নয়। কারণ জুলাই সনদের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন নির্ভর করছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠক এবং তাদের লিখিত সম্মতির (স্বাক্ষর) ওপর; যা এখনো প্রক্রিয়াধীন।
সম্প্রতি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উপায় খুঁজতে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পুনরায় অনানুষ্ঠানিক আলোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঐকমত্য কমিশন। আগামীকাল সোমবার বিকেল ৩টার দিকে জাতীয় সংসদ এলাকার এলডি হলে আয়োজিত বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতি আদায়ের চেষ্টা করা হবে। বৈঠকে দলগুলোর মতামতকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় সনদের চূড়ান্ত রূপ নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় আইনি ও নীতিগত কাঠামো গঠনের বিষয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের সামনে সম্ভাব্য বিকল্পগুলো নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
এরই মধ্যে জুলাই সনদের সমন্বিত খসড়া নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত পর্যালোচনা করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনামা নিয়ে দলগুলোর কাছ থেকে যেসব আপত্তি ও পরামর্শ এসেছে, সেগুলো সমন্বয় করা হচ্ছে। জানা গেছে, রাজনৈতিক দল ও বিশেষজ্ঞদের মতের ভিত্তিতে সনদের সমন্বিত খসড়ায় পুনরায় কিছু সংশোধনী আনা হচ্ছে, যাতে দলগুলোর মতামতের প্রতিফলন নিশ্চিত করা যায়।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, জুলাই সনদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকেই। তারা কোনোভাবে কোনোকিছু তাদের ওপর চাপিয়ে দেবেন না। এ জন্যই দলগুলোর সঙ্গে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা করতে যাচ্ছে কমিশন। তাদের লক্ষ্য আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই এই সনদ চূড়ান্ত করা।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। প্রথম ধাপে গঠিত ৬টি সংস্কার কমিশনের (সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ ও বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন) সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ঐকমত্য কমিশন। গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ে দুই পর্বের আলোচনায় ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য ও সিদ্ধান্ত হয়। এগুলো নিয়ে তৈরি করা হয় জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫। এরপর গত ২৯ জুলাই ৩০টি দলকে জুলাই সনদের একটি প্রাথমিক খসড়া পাঠায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।