ফেরারি আসামি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য হবেন, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এমন প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষপর্যায়ের অধিকাংশ নেতা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। কারণ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাদের অনেকে রোষানলে পড়ার ভয়ে বিদেশে পালিয়ে আছেন। আবার কেউ কেউ রয়েছেন কারাগারে। তবে তাদের প্রায় সবার বিরুদ্ধেই হত্যা ও দুর্নীতির মামলা রয়েছে। এমন বাস্তবতায় অনেকেই প্রয়োজনীয় আইনি লড়াই চালাতে পারছেন না। যে কারণে তাদের ফেরারি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফেরারি আসামি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য হবেন- নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এমন প্রস্তাবে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, ফেরারি বা পলাতক আসামি যেহেতু আদালতে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারী হন না, তাই তার নির্বাচন করার অধিকারও থাকা উচিত না।
আবার কেউ মনে করছেন, দেশের মালিক জনগণ, বিদ্যমান নির্বাচনি আইনে তারা ভোটের মাধ্যমে যে কাউকে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে পারে। কিন্তু ইসির এই প্রস্তাব কার্যকর হলে জনগণের সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে। এতে সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে বলেও তারা মনে করেন। আবার কেউ সরাসরি সমালোচনা করে বলেছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ যেন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারে, সে জন্য এই প্রস্তাব করেছে ইসি।
ফেরারি আসামিদের নির্বাচনে অযোগ্য করার বিধান সংযোজনের সুপারিশ করেছিল নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন। এই প্রস্তাবের যৌক্তিকতা প্রশ্নে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘একজন ফেরারি বা পলাতক আসামি আদালতে জামিন চাইতে পারেন না, আপিলও করতে পারেন না। একই যুক্তিতে আমরা মনে করি যে, পলাতক বা ফেরারি আসামি যেন সংসদ নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করতে না পারেন।’
কিন্তু এই প্রস্তাবের সমালোচনাও আছে। মনে করা হচ্ছে যে, আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতেই এমন প্রস্তাব। বিষয়টির প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করা হলে কমিশন প্রধান বলেন, ‘এমন ইনটেনশন থেকে এই প্রস্তাব করা হয়নি।’
সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বিভিন্ন সময়ে আলোচিত অনেক মামলায় সুপ্রিম কোর্টে ইসির পক্ষে লড়েছেন। ইসির বর্তমান এই প্রস্তাবকে ইতিবাচকভাবে দেখেন তিনি। তার মতে, যে কারণে একজন ফেরারি আসামি জামিন পান না বা আপিলের সুযোগ পান না, এসব আইনি অধিকার পেতে হলে তাকে আইনের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়, একই কারণে তার নির্বাচন করার অধিকারও থাকা উচিত না। তার মতে, এমন প্রস্তাব করা ঠিকই আছে। নির্বাচনের অধিকার ভোগ করতে হলে তাকে আইনের কাছে আত্মসমর্পণ করার বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত।
আওয়ামী লীগকে ঠেকানোর জন্যে এই প্রস্তাব- এমন সমালোচনার কথা সামনে আনলে তিনি বলেন, ‘আইনের অপব্যবহারের সুযোগ তো থাকেই, আওয়ামী লীগ আমলে আইনে এই ব্যবস্থা যুক্ত করলে তখনো এমন সমালোচনা হতো। অন্য কোনো দলের নাম নিয়ে বলা হতো যে, তারা যেন নির্বাচন করতে না পারে, তাই এই আয়োজন। কিন্তু একটা ভালো উদ্যোগ নিতে তো হবে।’
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ আইন-আদালত ও রাজনীতিকে এক করে না দেখার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে মামলা তো হয় রাজনৈতিক কারণে। রাজনৈতিক কারণে করা মামলার কারণে যদি কোনো ব্যক্তি বা দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারে, তাহলে তো হয় না। নিজেদের স্বাধীন দাবি করা নির্বাচন কমিশনের এটা না বোঝার কথা না।’
তিনি বলেন, ‘সংবিধান রাজনীতি করার মৌলিক অধিকার দিয়েছে। কিন্তু নির্বাচন যদি করতে না পারে, তাহলে সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারই তো থাকল না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, সংবিধান বলছে দেশের মালিক জনগণ। নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের মালিক তার পছন্দ-অপছন্দের রায় দেয়। যাকে পছন্দ হয় জনগণ গ্রহণ করবে, আর যাকে অপছন্দ হয় তাকে প্রত্যাখ্যান করবে। বিদ্যমান আইনে জনগণের এই অধিকার আছে। আর এখন ইলেকশন কমিশন (ইসি) যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা গ্রহণ করা হলে সরাসরি দেশের জনগণের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হবে। তো ভোট দেওয়ার অধিকার কেড়ে নিলে, জনগণের মধ্যে তো সন্দেহ বাড়বেই। মানুষ তো সমালোচনা করবেই।’
প্রসঙ্গত, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা-অযোগ্যতার বিধানে নতুন শর্ত যুক্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তা হলো- কোনো আদালত কাউকে ফেরারি ঘোষণা করলে তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য হবেন। ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ’র (আরপিও) ১২ অনুচ্ছেদের (১) উপদফায় এই বিধান যুক্ত করে নির্বাচন কমিশন এই আইনের চূড়ান্ত খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিগত নির্বাচনগুলোতে সাজাপ্রাপ্ত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নির্বাচনে অযোগ্য হতেন। নতুন এই বিধান কার্যকর হলে মামলার রায় ঘোষণার আগে শুনানিতে অনুপস্থিতির দায়ে আদালত কাউকে পলাতক ঘোষণা করলে তিনি আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতা হারাবেন। এ ছাড়া খসড়া আইনে অনলাইনে মনোনয়ন দাখিলের বিধানও তুলে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত এসব বিধান কার্যকর হলেই আইনের দৃষ্টিতে আওয়ামী লীগের পলাতক নেতারা আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়বেন বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে আইনের ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ।
পর্যবেক্ষণ থেকে তারা বলেছেন, সারা দেশে দলটির নেতাদের বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মামলা চলমান। আওয়ামী লীগের যেসব নেতা-কর্মী দীর্ঘদিন ওইসব মামলায় হাজির না হওয়ার কারণে ফেরারি হয়ে আছেন, নতুন এই আইনের ফাঁদে পড়ে নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে পড়বেন তারা। এ ছাড়া অর্থ পাচারসহ অন্যান্য ফৌজদারি অপরাধের মামলায় আদালত কর্তৃক ফেরারি হলে তারাও নির্বাচনে অযোগ্য হবেন। তা ছাড়া আওয়ামী লীগের যেসব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা নেই, কিন্তু রোষানলে পড়ার আতঙ্কে পলাতক রয়েছেন; তাদেরও অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার এতদিন যে সুযোগ ছিল, সেই পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।