রাতের রাজধানী ঢাকায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে খুন-ছিনতাই এবং ডাকাতিসহ ভয়ানক সব অপরাধ। এলাকাভেদে রাত হলেই বিরাজ করছে ভীতিকর থমথমে পরিবেশ। এই অবস্থায় কিছুটা সাহস ও ভরসা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন নৈশপ্রহরীরা। কিন্তু সেই নৈশপ্রহরীরাই যখন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তখন সাধারণ বাসিন্দা বা নাগরিকদের অবস্থা কী হতে পারে, বলার অপেক্ষা রাখে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার অপরাধের মাত্রায় বা ধরনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘দুর্বলতার’ সুযোগে পেশাদার অপরাধীরা রাতের ঢাকায় বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এর বিপরীতে পেশাদার অপরাধীদের আগ্নেয়াস্ত্র বা ধারালো ছুরি-চাপাতির মোকাবিলায় নৈশপ্রহরীরা ব্যবহার করছেন লাঠি-বাঁশি। ফলে, এক ধরনের ঝুঁকি নিয়েই নগরবাসীর নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করছেন নৈশপ্রহরী বা নাইটগার্ডরা।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাতের অন্ধকারের সঙ্গে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর, মিরপুর, হাজারীবাগ, পুরান ঢাকা, যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর ও উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় ভয়ের আবহ বিরাজ করতে থাকে। অনেক এলাকায় রাতে টহলের জন্য ‘নাইটগার্ড’ বা নৈশপ্রহরীরা দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু তারাও এখন ভুগছেন চরম নিরাপত্তা শঙ্কায়। শহরে খুন, চুরি–ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিরাতে পাহারায় নামতে হয় এই প্রহরীদের। অথচ হাতে থাকে শুধু একটি লাঠি আর মুখে বাঁশি। অপরাধীদের হাতে থাকে চাপাতি, ছুরি কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র। ফলে, নৈশপ্রহরীরা দায়িত্ব পালন করলেও তাদের মধ্যে ভয় কাজ করে। প্রতিটি মুহূর্ত আতঙ্ক তাদের গ্রাস করছে। রাতে নিরাপত্তার বিষয়ে অন্তত ১২ জন নৈশপ্রহরীর সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক।
তারা জানিয়েছেন, আগে কোনো বিপদ আঁচ করলে লাগাতার বাঁশি বাজিয়ে পুলিশ কিংবা এলাকাবাসীকে ডাকতেন নৈশপ্রহরীরা। তখন সময়মতো সাহায্যও মিলত। কিন্তু গেল বছরের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে সেই নাগরিক সহযোগিতা কমে এসেছে। ক্ষমতা পরিবর্তনের শুরুতে এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থীরা প্রহরীদের পাশে দাঁড়ালেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এখন তেমন কেউ এগিয়ে আসেন না। অন্য দিকে পুলিশও সেই অর্থে যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। ফলে প্রশ্ন উঠছে- যাদের ওপর ভরসা করে রাজধানীবাসী নিশ্চিন্তে রাত কাটান, সেই নৈশপ্রহরীরাই যদি নিরাপত্তার শঙ্কায় থাকেন, তবে নগরবাসীর নিরাপত্তা কোথায়?
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) ৫৪টি ওয়ার্ড এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) রয়েছে ৭৫টি ওয়ার্ড। প্রতি ওয়ার্ডে গড়ে ১০ জন করে নৈশপ্রহরী রাতে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন। সে হিসেবে রাজধানীতে উত্তর ও দক্ষিণ সিটির মোট ১২৯টি ওয়ার্ডে প্রায় দেড় হাজার নাইটগার্ড কর্মরত রয়েছেন। একদিকে অস্ত্রসজ্জিত অপরাধীচক্র, অন্য দিকে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সামগ্রীর অভাব; সব মিলিয়ে নৈশপ্রহরীরা কার্যত অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছেন।
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে খুন, চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন ঘটনায় প্রায় ১০ হাজার মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২২ হাজার জনকে। ২৫৬টি খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে। ছিনতাইয়ের ঘটনায় ২৫০টি মামলা হয়েছে। তেজগাঁও জোনের- শিল্পাঞ্চল, হাতিরঝিল, শেরেবাংলা নগর, আদাবর ও মোহাম্মদপুরে এসব ঘটনা বেশি হয়েছে। চলতি বছরে চুরির ঘটনার সংখ্যা প্রায় ১৫০০, ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে অর্ধশত।
বাড়ছে ছিনতাই ও ডাকাতি, কমছে ভরসা
মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা ও যাত্রাবাড়ীর নাইটগার্ডরা বলেছেন, সম্প্রতি ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা বেড়েছে। বিশেষ করে রাত গভীর হলে অচেনা তরুণদের দলে দলে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে অনেকেই থাকে ধারালো অস্ত্র হাতে। সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করতে প্রহরীদের হাতে থাকে শুধু লাঠি, আর মুখে বাঁশি।
খুন-ডাকাতি-চুরিসহ অপরাধপ্রবণ এলাকা রাজধানীর মোহাম্মদপুর। এই এলাকার রায়েরবাজারে নৈশপ্রহরীর দায়িত্ব পালন করেন আনোয়ার হোসেন (৬৫)। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমার নিরাপত্তা নেই। এখন লাঠির পাশাপাশি লোহার রডও সঙ্গে রাখি। তার পরও ভয়ে থাকি! কারণ সন্ত্রাসীদের হাতে থাকে পিস্তল, বড় রামদা। তাদের সঙ্গে আমার লাঠি টিকবে না।’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি ৬ বছর এই দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু আগে কখনো এত ভয় পেতাম না। ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে।’
এ সময় পাশে হাত দিয়ে ইশারা করে একটি ঘর দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘বেশি সন্ত্রাসী দেখলে আমি ওই ঘরে লুকিয়ে থাকি!’
খিলগাঁওয়ের নৈশপ্রহরী আজিজ বলেন, ‘যদি পাঁচজন চাপাতি হাতে আসে, আমরা একটা লাঠি দিয়ে কী করব? গত সপ্তাহেই আমাদের লেনে ডাকাতরা এক ভদ্রলোককে ছুরি মেরে ব্যাগ নিয়ে গেছে। তখন আমরা বাঁশি বাজালেও তারা ভয় পায়নি।’
লাঠি-বাঁশি বনাম পিস্তল-চাপাতি
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিয়োজিত নৈশপ্রহরীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা সাধারণত রাত ১০টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। বেশির ভাগ সময়ই তারা একাই পুরো লেন বা একাধিক বাড়ি পাহারা দেন। হাতে থাকে একটি বাঁশের লাঠি এবং হুইসেল। প্রয়োজন হলে বাঁশির শব্দে অন্য গার্ডদের ডেকে সাহায্য চাওয়া যায়। কিন্তু বাস্তবে এই সামান্য প্রস্তুতি নিয়ে অস্ত্রধারী সশস্ত্র অপরাধীদের মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
মিরপুরের গার্ড আবদুল হালিম বলেন, ‘আমরা লাঠি নিয়ে ঘুরি, কিন্তু ডাকাতরা যদি পিস্তল বা চাপাতি নিয়ে আসে তখন আমরা কী করতে পারব? অনেক সময় দেখি সন্দেহজনক লোকজন ঘোরাঘুরি করছে, কিন্তু কিছু বলার সাহস হয় না। বাঁশি বাজালেও পুলিশ অনেক সময় আসে না। আমরা দাঁড়াব কীভাবে?
রাত যত গভীর, ভয়ও তত বাড়ে
অনেক ক্ষেত্রে গার্ডদের ওপরই হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত আগস্টে উত্তরা-১২ নম্বর সেক্টরে ডিউটিরত একজন নৈশপ্রহরীকে আহত করে পালিয়ে যায় তিনজন ডাকাত।
এই তথ্য জানিয়ে ওই এলাকার প্রহরী নূরুল ইসলাম বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনার পরও তাদের হাতে নেই কোনো কার্যকর প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বা আইনি সুরক্ষা। রাত যত গভীর হয়, ভয়ও তত বাড়তে থাকে। কারণ রাত ২টা-৩টার দিকে সাধারণত মাদকসেবী বা ছিনতাইকারীরা সক্রিয় হয়। একবার ছিনতাইকারীরা আমাদের লাঠি ছিনিয়ে নিয়ে মারতে গিয়েছিল, তখন প্রাণে বাঁচতে দৌড়ে পালাই!’
নামমাত্র বেতন, নেই প্রশিক্ষণ
কোনো প্রতিষ্ঠান বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নাইটগার্ডদের জন্য নেই আনুষ্ঠানিক কোনো প্রশিক্ষণ। ফলে বিপদে পড়লে কীভাবে প্রতিরোধ করতে হবে, তা অনেকেই জানেন না।
গার্ডরা বলছেন, বেতন যতটা কম, ঝুঁকি ততটাই বেশি। তারা বলেন, যে টাকা মাসে পাওয়া যায় তাতে সংসার চলে না। সুরক্ষা সামগ্রী কেনার সামর্থ্যও নেই তাদের। এ ছাড়া তাদের নেই কোনো প্রশিক্ষণ। ফলে অপরাধীরা যখন অস্ত্র নিয়ে আসে, তখন প্রতিরোধ করা তো দূরের কথা, নিজেকেই পালিয়ে বাঁচতে হয়।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘পুলিশ রাজধানীর সব থানা এলাকা, তথা মূল সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে টহল দিচ্ছে। ছিনতাইকারী-ডাকাতসহ পেশাদার অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে। যখনই কোথাও অভিযোগ পাওয়া যায়, সেখানেই পুলিশ যতটা দ্রুত সম্ভব সাড়া দেয়। নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিএমপি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’
এলাকাবাসীর যত শঙ্কা
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, চুরি-ছিনতাই ও ডাকাতি বাড়ায় গার্ডদের ওপর আর ভরসা করা যাচ্ছে না। মিরপুরের বাসিন্দা রাশিদা আক্তার বলেন, ‘আমরা মনে করি গার্ড থাকলে নিরাপদ। কিন্তু তারা নিজেরাই যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে আমাদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?’
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহযোগী অধ্যাপক শাহরিয়ার আফরিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা নিরাপত্তার জন্য পরিবর্তন চেয়েছি। কিন্তু মানুষ রাতে নিরাপদে ঘুমাতেই পারছে না- এমন পরিবর্তন তো আমরা চাইনি! আগে অপরাধীরা অপরাধ করে চলে যেত- কিন্তু এখন অপরাধ শেষে সবার সামনে খুনও করছে। একজন অপরাধী অপরাধ করার পরে আপনি বলছেন তেমন কিছু হয়নি, সব ঠিক আছে! এই ধরনের বক্তব্যের ফলে অপরাধীরা অপরাধ করতে উৎসাহ পাচ্ছে।’
শাহরিয়ার আফরিন বলেন, ‘৫ আগস্টের পর থেকে পুলিশের উপস্থিতি কম। পুলিশ হামলা এবং মবের শিকার হচ্ছেন। আবার এসবের সঠিক বিচার হচ্ছে না। অপরাধীরা যদি বার্তা পেত যে, অপরাধ করে ছাড় পাওয়া সম্ভব নয়, শাস্তি পেতে হবে, তাহলে অপরাধের প্রবণতা কমত।
এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, রাজধানীতে ক্রমবর্ধমান চুরি-ছিনতাই ও ডাকাতি রোধে গার্ডদের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা সরঞ্জাম দিতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পুলিশি টহল ও কমিউনিটি সচেতনতা বাড়াতে হবে।’
অস্ত্রের বিপরীতে লাঠি-বাঁশি দিয়ে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয় মন্তব্য করেন পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক খবরের কাগজকে বলেন, এ ক্ষেত্রে প্রশাসন তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করার প্রয়োজনীয়তা আছে। কিন্তু পুলিশ অনেক ক্ষেত্রেই তাদের অর্পিত দায়িত্ব পালন করছে না। তাদের নিজেদের ভেতরেই একধরনের ভীতি কাজ করছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশ কাজে যেতে ভয় পায়! বিশেষ করে রাতে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ না হলে নৈশপ্রহরীরাও নিরাপদে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।