নীতিমালা উপেক্ষা করে বিশেষ সুবিধায় রাজধানীর ধানমন্ডিতে নির্মাণাধীন সরকারি প্রকল্পের ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক দুই কমিশনার মোজাম্মেল হক খান ও জহুরুল হক। শুধু তা-ই নয়, তারা সরকারের সুদৃষ্টির কারণে ‘রাতের ভোটের পুরস্কার’ হিসেবে একটি করে ফ্ল্যাটের জন্য আবেদন করলেও পরবর্তী সময়ে দুদক কমিশনারের ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে বাগিয়ে নিয়েছেন ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট। গৃহায়ণ ও গণপূর্তের ওই প্রকল্পের পরিকল্পনা, নীতিমালা বা প্রসপেক্টাসে কোনো ধরনের ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটের উল্লেখ নেই। দুই কমিশনার তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে একটি করে আবেদনে দুটি করে ফ্ল্যাট বাগিয়ে নিয়েছেন। পরে ওই দুটি ফ্ল্যাটকে ডুপ্লেক্স ঘোষণা করা হয়েছে এবং তা ডুপ্লেক্স হিসেবেই নির্মাণ করা হচ্ছে। অর্থাৎ মোজাম্মেল হক খান ও জহুরুল হকের নামে বরাদ্দ হওয়া দুটি করে চারটি ফ্ল্যাটকে এখন দুটি ডুপ্লেক্স বাড়ি হিসেবে নির্মাণ করা হচ্ছে। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
জানা গেছে, বিধিবহির্ভূতভাবে বরাদ্দের কারণে সম্প্রতি মোজাম্মেল হক খান ও জহুরুল হকসহ মোট ১২ জনের নামে ফ্ল্যাটের বরাদ্দ বাতিল করেছে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। ‘রাতের ভোটের পুরস্কার’ হিসেবে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে ফ্ল্যাটের বরাদ্দ পাওয়া ওই ১২ জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। অপর ১০ জন তাদের আবেদন অনুসারে একটি করেই ফ্ল্যাট বরাদ্দ পেয়েছিলেন। তারা হলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মঞ্জুরুল বাছিদ, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব মো. ইউনুসুর রহমান, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব এম এ কাদের সরকার, বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক সিনিয়র সচিব ড. এম আসলাম আলম, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সাবেক সচিব আকতারী মমতাজ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সাবেক সচিব মো. সিরাজুল হক খান, সাবেক রেজিস্ট্রার জেনারেল (সিনিয়র জেলা জজ) সৈয়দ আমিনুল ইসলাম, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক নেহাল আহমেদ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব মো. আনিছুর রহমান এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব ও পিএসসির সাবেক সদস্য এস এম গোলাম ফারুক।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ওই ১২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছিলেন অনুসন্ধাকারী কর্মকর্তা ও দুদকের সহকারী পরিচালক আল আমিন। তাদের রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে কয়েকজন হাজির হয়েছিলেন। কেউ কেউ তাদের বক্তব্য লিখিতভাবে দুদকে পাঠিয়েছেন, আবার কয়েকজন টেলিফোনে যোগাযোগ করে তাদের বক্তব্য অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন। শুধু মোজাম্মেল হক খান দুদকের তলবে সাড়া দেননি।
এ ব্যাপারে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা আল আমিন খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, অভিযোগের বিষয়ে ১১ জনের বক্তব্য পাওয়া গেছে। কয়েকজন দুদকে হাজির হয়ে বক্তব্য দিয়েছেন, কেউ কেউ লিখিত বক্তব্য পাঠিয়েছেন, আবার কয়েকজন টেলিফোনে যোগাযোগ করে বক্তব্য দিয়েছেন। টেলিফোনে নেওয়া বক্তব্য ধারণ করে দাপ্তরিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
দুদকে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের ওপর দায় চাপিয়েছেন দুদকের সাবেক কমিশনার জহুরুল হক। তিনি বলেছেন, ‘নিয়ম মেনেই আবেদন করা হয়েছিল, বরাদ্দ দিয়েছে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। যদি কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি হয়ে থাকে তা গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের বিষয়।’
অপর ১০ জনও নিজেদের নির্দোষ দাবি করে বক্তব্য দিয়েছেন। দুদকে দাখিল করা বক্তব্যে তারা জানিয়েছেন, গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের বরাদ্দের নীতিমালা ও প্রসপেক্টাস অনুসারে সঠিক নিয়মে আবেদন করে নির্ধারিত মূল্যে তারা একটি করে ফ্ল্যাট বরাদ্দ পেয়েছিলেন। অনিময়ের কথা বলে তা ইতোমধ্যে বাতিলও করেছে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ।
এ ব্যাপারে ওই ১০ জনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান ড. এম আসলাম আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘নিয়ম মেনেই আবেদন ফরম জমা দিয়েছি এবং আমার জানামতে নিয়ম অনুযায়ী বরাদ্দ পেয়েছিলাম।’
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন খবরের কাগজকে বলেন, ‘রাতের ভোটের পুরস্কার’ হিসেবে ফ্ল্যাট বরাদ্দের বিষয়টি সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কারণ এখানে এমন কয়েকজন আছেন, যারা কোনো নির্বাচনের দায়িত্বে কখনোই ছিলেন না। দু-একজন আছেন যারা ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগেই এলপিআরে গিয়েছিলেন। অবশ্য দুদকও অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে রাতে ভোটের পুরস্কারসংক্রান্ত বিষয়টি আমলে নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। দুদক শুধু ফ্ল্যাট বরাদ্দের ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান করছে। এ ক্ষেত্রে দুদকের সাবেক দুই কমিশনারের নামে ফ্ল্যাট বরাদ্দে কিছুটা অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে। যেহেতু গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ বরাদ্দ বাতিল করেছে এবং বিষয়টি ফলাও করে গণমাধ্যমে এসেছে, ফলে দুদকও সেই অভিযোগ খতিয়ে দেখছে। অনুসন্ধানের ফলাফলই বলে দেবে কোনটায় অনিয়ম হয়েছে আর কোনটায় অনিয়ম হয়নি।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনের ভোট রাতে করার কুশীলব হিসেবে জহুরুল হক ও ড. মোজাম্মেল হক খানসহ ১২ জন সচিব মর্যাদার কর্মকর্তাকে পুরস্কার দিতে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের ‘গৃহায়ণ ধানমন্ডি (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্পের আওতায় নীতিমালা ভেঙে উচ্চমূল্যের ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়। ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ১৩ নম্বর (নতুন ৬/এ) সড়কের ৭১১ নম্বর (নতুন ৬৩) প্লটে নির্মিত ১৪ তলা ভবনে মোট ১৮টি ফ্ল্যাট ছিল। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ (১২টি) সরকারি ও ৪০ শতাংশ (৬টি) বেসরকারি কোটায় বরাদ্দ হওয়ার কথা থাকলেও সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ধানমন্ডিতে মোজাম্মেল হক খানের নামে ২ হাজার ১৫৪ স্কয়ার ফুট করে দুটি মোট ৪ হাজার ৩০৮ স্কয়ার ফুটের ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। একইভাবে জহুরুল হককে ২ হাজার ৫২ দশমিক ৫ স্কয়ার ফুট করে মোট ৪ হাজার ১০৫ স্কয়ার ফুটের ডুপ্লেক্স বরাদ্দ দেওয়া হয়। বাকিরা ২ হাজার ৪৯ থেকে ২ হাজার ৩১৫ পর্যন্ত স্কয়ার ফুটের একটি করে ফ্ল্যাট বরাদ্দ পেয়েছিলেন। ডুপ্লেক্সের সুবিধায় তারা পেয়েছিলেন স্বতন্ত্রভাবে দুটি করে গাড়ি রাখার গ্যারেজ।