হৃদরোগ বিশ্বের এক নম্বর ঘাতক। এটি ক্যানসারের চেয়েও মারাত্মক। বছরে বিশ্বে প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবন কেড়ে নেয় এই রোগ। হৃদরোগে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন অকালে মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৪ শতাংশ মৃত্যু ঘটে হৃদরোগে। অথচ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হৃদরোগজনিত অকাল মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য। বাংলাদেশে বড়দের হৃদরোগ ছাড়া জন্মগত হৃদরোগের চিত্র ভয়াবহ। বছরে অন্তত ৭৩ হাজার শিশু হৃদরোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু দেশে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা সুবিধা অপ্রতুল। অধিকাংশ পরিবারই চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে অক্ষম।
এমন বাস্তবতায় আজ দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব হার্ট দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘ডোন্ট মিস এ বিট’। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশন রাষ্ট্রপ্রধানদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দুতে হৃদরোগকে স্থান দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে বলেছে, হৃদরোগ এখনো বিশ্বের মৃত্যুর প্রধান কারণ। সময়মতো প্রতিরোধ এবং যত্নে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হৃদরোগজনিত অকাল মৃত্যু এড়ানো সম্ভব।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, উদ্বেগজনকভাবে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত প্রতি চারজনের মধ্যে একজনের কম রোগীর অবস্থা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পাঁচজনের মধ্যে চারজন তাদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে হৃদরোগের বড় ঝুঁকি যেমন: হার্ট অ্যাটাক, হার্ট ফেইলিউর এবং ব্রেইন স্ট্রোক প্রতিরোধ করা সম্ভব। উচ্চ রক্তচাপের জন্য চিকিৎসা নেওয়া মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ করলে আগামী ৩৫ বছরে ১৩ কোটিরও বেশি জীবন বাঁচানো সম্ভব।
ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশন ওই বিবৃতিতে বলছে, নিম্ন ও মাঝারি আকারের যেসব দেশে হৃদরোগজনিত মৃত্যু বেশি, তাদের জরুরিভাবে হৃদরোগের চিকিৎসায় বিনিয়োগ মাথাপিছু কমপক্ষে ২ দশমিক ২ মার্কিন ডলার বা জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যয়ের ২ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি করতে হবে। নিম্ন ও মাঝারি আকারের দেশে যা ব্যয় করা হয়, তা খুবই সামান্য। তামাক, অ্যালকোহল এবং চিনিযুক্ত পানীয়র ওপর কমপক্ষে ৫০ শতাংশ কর আরোপের মতো সাহসী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যা এসবের ব্যবহার কমাতে এবং অতিরিক্ত রাজস্ব বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ আল শাফি মজুমদার বলেন, ‘উচ্চ রক্তচাপ হার্টের রক্তনালি সরু করে এর কার্যকারিতা কমিয়ে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। হৃদরোগের প্রকোপ কমাতে সঠিক সময়ে উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত ও ওষুধের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কমিউনিটি বেইজড হেলথ কেয়ারের (সিবিএইচসি) প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. গীতা রানী দেবী বলেন, ‘উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ প্রাপ্যতায় কিছুটা ঘাটতি থাকলেও বর্তমানে কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাষ্টের আওতায় আমরা সব কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে ওষুধ সরবরাহ করার চেষ্টা করছি।’
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ইপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, ‘হৃদরোগের সঙ্গে জড়িত ঝুঁকি কমিয়ে আনাই এবার বিশ্ব হার্ট দিবসের মূল প্রতিপাদ্য। তৃণমূল পর্যায়ে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের হার বাড়াতে পারলে হৃদরোগের প্রাদুর্ভাবও অনেকটা কমে আসবে।’
স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত দেশবরেণ্য শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) অধ্যাপক ডা. নুরুন্নাহার ফাতেমা বেগম বলেন, দেশে প্রতি দিন আট হাজার শিশু জন্মগ্রহণ করে। প্রতি হাজারে ২৫ জন হৃদরোগ নিয়ে জন্মায়। সেই হিসাবে দিনে ২০০ এবং বছরে ৭৩ হাজার শিশু হৃদরোগ নিয়ে জন্মায়। এদের তিন ধরনের সমস্যা থাকে। কারও কম, কারও মাঝারি আর কারও মারাত্মক সমস্যা থাকে। জন্মের পর পরই এই সমস্যা চিহ্নিত করে চিকিৎসা দেওয়া না গেলে পরিস্থিতি অনুকূলে থাকে না। নবজাতকের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে যায়। তিনি শিশু হৃদরোগের প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ, চিকিৎসার সহজলভ্যতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের তাগিদ দেন।
পেডিয়াট্রিক অ্যান্ড কনজেনিটাল কার্ডিয়াক সার্জন ডা. এম এ কে আজাদ বলেন, দেশে সব জায়গায় কার্ডিয়াক সার্জারি সেন্টার নেই। ৭০ শতাংশই রাজধানীকেন্দ্রিক। শিশুদের বেলায় তা শতভাগ রাজধানীতে। দেশে পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্ট মাত্র ৪০ জন, পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক সার্জন আছেন ১৪ জন এবং পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক ইনটেনসিভিস্ট আছেন পাঁচজন।
তিনি বলেন, জন্মগত হৃদরোগের নবজাতকদের ২৫ শতাংশ অভিভাবকের চিকিৎসা ব্যয় বহন করার করার সক্ষমতা আছে, ২৫ শতাংশ ঋণ নিয়ে চিকিৎসা করাতে পারেন। বাকি ৫০ শতাংশের চিকিৎসা করাতে হয় অন্যের সহযোগিতায়। যদিও জন্মগত হৃদরোগীদের জন্য সরকার ৫০ হাজার টাকা সহযোগিতা দিয়ে থাকে। কিন্তু এটি পর্যাপ্ত নয়। এই রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিতে দক্ষ জনবল তৈরির পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিমা চালু করার তাগিদ দেন তিনি।
মিট দ্য প্রেস
শিশু হৃদরোগ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কিডস হার্ট ফাউন্ডেশন, চাইল্ড হার্ট ট্রাস্ট বাংলাদেশ, বাংলাদেশ হার্ট রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ সোসাইটি অব অ্যাডাল্ট অ্যান্ড কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজ- যৌথভাবে এক বিশেষ ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। গতকাল রবিবার রাজধানীর শ্যামলীতে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের মুকুট হলে এই অনুষ্ঠান হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন দেশবরেণ্য হৃদরোগ সার্জন অধ্যাপক ডা. এস আর খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের প্রেসিডেন্ট রাশেদ রাব্বি। শুরুতে বাংলাদেশের শিশু হৃদরোগের বর্তমান অবস্থা, চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে ডা. এম এ কে আজাদ কি-নোট উপস্থাপন করেন। সভাপতিত্ব করেন স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত দেশবরেণ্য শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) প্রফেসর ডা. নুরুন্নাহার ফাতেমা বেগম।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের ডিরেক্টর অব মেডিকেল সার্ভিসেস প্রফেসর ডা. আব্দুল্লাহ সাফি মজুমদার, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের প্রফেসর ডা. আবদুল্লাহ শাহরিয়ার, ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. শাহিদুল ইসলাম, বিএমইউর প্রফেসর ডা. তারিকুল ইসলাম, সিএমএইচের প্রফেসর ডা. নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া, শিশু হাসপাতালের বিভাগীয় প্রধান ডা. রেজওয়ানা রিমা ও বিশিষ্ট পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিষ্ট প্রফেসর ডা. আবদুস সালাম।
বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে ওয়েবিনার
বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে গতকাল ‘উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ ঝুঁকি’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারের আয়োজন করে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান)। এতে সহযোগিতা করেছে গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই)।
ওয়েবিনারে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ আল শাফি মজুমদার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কমিউনিটি বেইজড হেলথ কেয়ারের (সিবিএইচসি) প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. গীতা রানী দেবী, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ইপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট ডা. আবু জামিল ফয়সাল, ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্টস স্কুল অব পাবলিক হেলথের অধ্যাপক ডা. মলয় কান্তি মৃধা, জিএইচএআই বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস বক্তব্য রাখেন। সভাপতিত্ব করেন প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের এবং সঞ্চালনা করেন প্রজ্ঞার কো-অর্ডিনেটর সাদিয়া গালিবা প্রভা।