প্রাথমিক বাছাইয়ে উত্তীর্ণ নিবন্ধনপ্রত্যাশী নতুন ১০টি দলের কার্যক্রম যাচাইয়ে গঠিত তদন্ত কমিটিগুলোর কাজের পদ্ধতি ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপত্তি জানিয়েছে ৬টি দল। তারা ইসিকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, বিগত দিনে মাঠপর্যায়ের তদন্তে ইসির কর্মপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
রবিবার (১২ অক্টোবর) আগারগাঁওয়ের নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে অভিযোগপত্র জমা দিতে এসে দলগুলোর নেতারা জানিয়েছেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দলগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং উপস্থিতি নিয়ে ইসি অধিকতর তদন্ত করবে, যা তাদের প্রতি অবিচার। এ বিষয়ে ইসি সচিব আখতার আহমেদ খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, তদন্তে সবকিছু ইতিবাচক থাকলে সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে নিবন্ধন দেওয়া হবে।
এর আগে ওইসব দলের কাছে পাঠানো ইসির জনবল ব্যবস্থাপনা শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মো. নাজমুল কবীর স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, প্রাথমিক পর্যায়ের তদন্তে অনেক ক্ষেত্রে দলগুলোর কার্যক্রমের প্রমাণ ও মন্তব্যে ঘাটতি পাওয়া গেছে। তাই মাঠপর্যায়ের অধিকতর তদন্তের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই লক্ষ্যে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনায় ইসির প্রশাসনিক ১০টি অঞ্চলভিত্তিক কমিটি গঠন করে ৩০ জন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ইসির অধিকতর তদন্তের তালিকাভুক্ত দলগুলো হলো বাংলাদেশ আম জনগণ পার্টি, আমজনতার দল, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পার্টি (বিজিপি), বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী), বাংলাদেশ জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি, ভাসানী জনশক্তি পার্টি, বাংলাদেশ বেকার মুক্তি পরিষদ, জনতার দল, মৌলিক বাংলা এবং জনতা পার্টি বাংলাদেশ।
সংক্ষুব্ধ দলগুলোর বক্তব্য
বাংলাদেশ জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (জেডিভিপি) চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসাইন এ বিষয়ে খবরের কাগজকে বলেন, ‘পূর্বঘোষণা ছাড়া হঠাৎ তদন্ত কর্মকর্তারা আমাদের এলাকা পরিদর্শন করে কার্যক্রম যাচাই করেছেন। এতে প্রকৃত তথ্য তারা পাননি।’
বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল- বাসদের (মার্কসবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা বলেন, ‘আমরা সংগঠনের কাঠামো, দলীয় কার্যালয় ও সদস্যদের বিস্তারিত তথ্য সরবরাহ করেছি। অথচ মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা আমাদের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না করেই প্রতিবেদন দিয়েছেন।’
বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পার্টির চেয়ারম্যান এস এম শাহাদাত হোসেন বলেছেন, ‘আমরা আগের প্রতিবেদনেও তথ্য দিয়েছি। আবারও তদন্তের নামে আমাদের কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা হচ্ছে।’
এ ছাড়া ভাসানী জনশক্তি পার্টি, মৌলিক বাংলা ও জনতা পার্টি বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও ইসিকে গতকাল চিঠি দিয়েছে। দলগুলোর নেতারা জানান, তদন্তে কিছু কর্মকর্তার পক্ষপাতমূলক আচরণ তারা লক্ষ্য করেছেন। তাদের দলীয় সভা, প্রচারপত্র ও মাঠপর্যায়ের কমিটি উপেক্ষিত হয়েছে।
ইসি সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে যাচাই কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে ওই ১০টি দলের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অস্তিত্ব ও কার্যকারিতার বিষয়ে অধিকতর তদন্ত করা হবে। নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক ১০ অঞ্চলে ওই দলগুলোর কার্যক্রম নিয়ে এবার কোনো গরমিল না পেলে তাদের নিবন্ধন দেওয়া হবে। এ কাজে ফরিদপুর, ঢাকা, রংপুর, কুমিল্লা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, খুলনা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের জন্য তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটিতে রাখা হয়েছে ৩০ জন কর্মকর্তাকে। তারা পুনরায় যাচাই করবেন- এসব দলের তৃণমূল উপস্থিতি, কার্যালয়, কমিটি ও জনপ্রিয়তা কতটুকু বাস্তবসম্মত।
এ বিষয়ে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেছেন, ‘মাঠপর্যায়ের অধিকতর তদন্তে সবকিছু ইতিবাচক থাকলে সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে নিবন্ধন দেওয়া হবে। তার আগে গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দাবি-আপত্তির সুযোগ থাকবে। পরে শুনানি করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।’
আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসির গণবিজ্ঞপ্তিতে ১৪৩টি নতুন রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছিল। কিন্তু প্রাথমিক যাচাইয়ে কোনো দলই উত্তীর্ণ না হওয়ায় সব দলকে আবার সময় দেওয়া হয়। পরে দ্বিতীয় দফা যাচাইয়ে ১২১টি দলের আবেদন বাতিল করা হয়। বাকি ২২টি দলের মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও জাতীয় লীগ নিবন্ধনের যোগ্যতা অর্জন করে। এ ছাড়া আদালতের নির্দেশনা থাকা আরও ৩টি দলের আবেদন এখনো পর্যালোচনায় রয়েছে। আর বাকি ১০টি দলের কার্যক্রমে অসংগতি থাকায় তাদের ওপর চলছে অধিকতর তদন্ত।
আরপিও অনুযায়ী, নিবন্ধনের জন্য দলের কেন্দ্রীয় কমিটি, অন্তত এক-তৃতীয়াংশ জেলায় ও ১০০ উপজেলায় কার্যকর কমিটি থাকতে হবে। প্রতিটি কমিটিতে ২০০ জন ভোটারের সমর্থনও প্রয়োজন। নিবন্ধন পেলে দলগুলো ইসির স্বীকৃতি পায়, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার অধিকারসহ রাষ্ট্রীয়ভাবে রাজনৈতিক দল হিসেবে সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারে।
বর্তমানে নিবন্ধিত দলের সংখ্যা ৫২টি (রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত থাকা আওয়ামী লীগসহ)। নবম সংসদ নির্বাচনের আগে ২০০৮ সালে নিবন্ধন প্রথা চালু করে ইসি। এ পর্যন্ত ৫৬টি দল এই সংস্থার নিবন্ধন পেলেও পরবর্তী সময়ে শর্ত প্রতিপালন না করায় আদালতের নির্দেশে ৫টি দলের নিবন্ধন বাতিল হয়। দলগুলো হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ফ্রিডম পার্টি, ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলন, পিডিপি ও জাগপা। এর মধ্যে সম্প্রতি আদালতের আদেশে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন পুনর্বহাল করেছে নির্বাচন কমিশন।