২৭ ঘণ্টাব্যাপী আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়েছে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ। দেশের প্রধান বিমানবন্দরে স্মরণকালের ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও ব্যাপক। কিন্তু সেই ক্ষয়ক্ষতিতে সর্বস্ব হারানোর মতো কোনো চিত্র দেখা যায়নি আগুনে ধ্বংস হওয়া বিভিন্ন পণ্যের মালিক বা ব্যবসায়ীদের মাঝে। গতকাল রবিবার সরেজমিন কয়েক ঘণ্টা কার্গো ভিলেজের সামনে অবস্থান করে বিষয়টি বোঝা যায়।
সাধারণত অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। কিন্তু শাহজালালের কার্গো ভিলেজের (আমদানি) আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত অধিকাংশ ব্যবসায়ী চিন্তামুক্ত ছিলেন কীভাবে? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, যেসব মালামাল বা পণ্য পুড়ে ভস্মীভূত হয়েছে, সেগুলোর প্রায় সবই বিমার আওতায় ছিল। ফলে খুব সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত অধিকাংশ ব্যবসায়ী তাদের পুড়ে ধ্বংস বা নষ্ট হয়ে যাওয়া মালামাল-পণ্যের সমমূল্যের অর্থ পেয়ে যাবেন। দু-একজন ছাড়া ঘটনাস্থলে উপস্থিত কারও মুখেই সেভাবে চিন্তার ভাঁজ লক্ষ করা যায়নি। বরং সুযোগ কাজে লাগাতে কেউ কেউ তার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক গুণ বাড়ানোর পাঁয়তারা করছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়।
গতকাল অনেক ব্যবসায়ী ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন রকম মন্তব্য করেন। কেউ কেউ ক্ষতির পরিমাণ বলেছেন হাজার কোটি টাকারও বেশি। আবার ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজিএমইএর নেতারা বলেছেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ শতকোটি টাকার বেশি। যদিও অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ বা পরিসংখ্যান কয়েকটি সংস্থার তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
গত শনিবার বেলা সোয়া ২টার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। টানা প্রায় ২৭ ঘণ্টার চেষ্টার পর গতকাল রবিবার বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে আগুন সম্পূর্ণ নেভানোর কথা জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। গতকালও বেসমারিক বিমান ও পর্যটন উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন, ফায়ার সার্ভিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ব্যবসায়িক সংগঠনের নেতাসহ দায়িত্বশীল অনেকেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন বলেছেন, বিমানবন্দরে অগ্নিকাণ্ডের পর যত রকম অভিযোগ এসেছে বা আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে সবগুলো আমলে নিয়েই ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করা হবে।
যেমন দেখা গেছে কার্গো ভিলেজ
রবিবার দুপুর ১২টা। তখনো আগুনের ধোঁয়া বের হচ্ছিল কার্গো ভিলেজের ৮ নম্বর গেট এলাকায়। পাশের কুরিয়ার সেকশন থেকে শুরু করে কার্গো ভিলেজের আমদানি কমপ্লেক্সের পুরোটাই পুড়ে কালচে রূপ নিয়েছিল। কিছু এলাকা তখন আগুন নেভানো অবস্থায় দেখা গেলেও ভেতরের দিকে আগুন ও উচ্চতাপ বিরাজ করছিল। আগুন নেভানোর জন্য প্রয়োগ করা পানি, পোড়া ছাই-কয়লায় লেপ্টে ছিল বিমানবন্দরের ওই এলাকা।
সেখানে অবস্থান করা নরসিংদী ফায়ার স্টেশন থেকে আসা একজন ফায়ার ফাইটার বলেন, আগুনের তেজ বা ভয়াবহতা এতটাই তীব্র ছিল, তাপের কারণে আশপাশে দাঁড়ানো যাচ্ছিল না। আগুনে কার্গো ভিলেজের বিভিন্ন পয়েন্টের শক্ত বা পুরু টিনশেড, লোহার বেস্টনী- সবই অনেকটা গলে গেছে। এই আমদানি কমপ্লেক্সে বলতে গেলে কোনো ধরনের মালামাল বা পণ্য অক্ষত নেই।
ঘটনাস্থলে নির্ভার ক্ষতিগ্রস্তরা
গতকাল দুপুরে বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেটের সামনে দাঁড়িয়ে সাবলীলভাবে গল্প করছিলেন টোটাল লজিস্টিক লিমিটেডের কাস্টমার সুপারভাইজার মুস্তাক আহমেদ। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, “৪০ লাখ টাকার একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের মালামালের ‘শিপমেন্ট’ এসেছিল। সেটা দুই-এক দিনের মধ্যে খালাস হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সেগুলো পুড়ে গেছে। তবে যেহেতু বিমা করা আছে, তাই এটা নিয়ে আর টেনশন করছি না।’
কার্গো ভিলেজের উল্টো পাশে কথা হয় কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্ট প্রতিষ্ঠান এমএসজিএস কোম্পানির কর্মকর্তা মাহতাব উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা চীন, ভারত ও জার্মানি থেকে দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর জন্য কাঁচামাল আমদানি করে থাকি। আমদানি কার্গো ভিলেজের ভেতর আমাদের ২০টি শিপমেন্ট ছিল, সবই পুড়ে গেছে।’
বিমা সুবিধা থাকার কথা জানিয়ে মাহতাব উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সেগুলোর অর্থ আমরা বিমা কোম্পানি থেকে পেয়ে যাব। কিন্তু এই আগুনের ফলে ওষুধ খাতের আমদানি পণ্য বা আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেশ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘পিটি গ্রুপে’র এজিএম মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বিমানবন্দরে আমদানি কার্গো ভিলেজে গার্মেন্টস কাঁচামালের তাদের ১০টি শিপমেন্ট ছিল। এগুলোর মধ্যে ফেব্রিকস, সুতা, ডাইং মেশিনের স্পেয়ার পার্টস ছিল। আগুনে সবই পুড়ে গেছে। ক্ষতির পরিমাণ অন্তত ৯ থেকে ১০ কোটি টাকা।
আরও একাধিক সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকার বিমানবন্দরে ৬৮টি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস অফিস রয়েছে। এসব কুরিয়ারের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার মালামাল আনা হয়। তবে আগুনে প্রায় সবই পুড়ে গেছে। যা পুড়ে গেছে তার পরিমাণ নিশ্চিত করে বলতে না পারলেও সেটি ব্যাপক বলে মন্তব্য করেন তারা।
বিভিন্ন আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের সঙ্গে সেখানে আলাপকালে জানা গেছে, কার্গো ভিলেজে থাকা সব পণ্য শিপমেন্টে ইন্স্যুরেন্স বা বিমা সুবিধার আওতায় রয়েছে। বিমা ছাড়া কোনো পণ্য এখানে রাখার সুযোগ নেই। আগুনে পুড়ে পণ্যের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করা হবে। এই ক্ষতির দায় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তথা রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।
সব অভিযোগ আমলে নিয়ে অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধান
বিমানবন্দরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে নাশকতা বা যেসব অভিযোগ উঠেছে তার সবগুলো আমলে নিয়ে কারণ অনুসন্ধান করা হবে বলে জানিয়েছেন বেসরকারি বিমান ও পর্যটন এবং বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন। গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা আগুন লাগার পূর্ব ও পরবর্তী অবস্থা, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করবে।
তিনি আরও বলেন, যেসব ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের ইন্স্যুরেন্স কাভারেজ ও বিমানবন্দরের নিজস্ব বিমা ব্যবস্থার আওতায় কীভাবে সহায়তা দেওয়া যায়, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
পোশাকশিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি এনামুল হক খান বাবলু বলেন, ‘কার্গো ভিলেজে আগুনের ঘটনায় আমরা বিজিএমইএ বোর্ড গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এতে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য, বিশেষ করে পোশাকশিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের সদস্যরা প্রায় সবাই এয়ারে পণ্য পাঠান। প্রতিদিন ২০০-২৫০টি কারখানার পণ্য আকাশপথে রপ্তানি হয়। সে হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ বেশি। আমরা ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছি। সদস্যদের নির্ধারিত ফরম্যাটে ক্ষতি হওয়া পণ্যের তালিকা চেয়ে চিঠি দিয়েছি। তথ্য দ্রুত সংগ্রহ করার জন্য একটি অনলাইন ডেটা কালেকশন পোর্টালও খোলা হয়েছে।
বহির্বিশ্বের বায়ারদের কাছে দেশের ইমেজ সংকটে ফেলবে
ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান। তিনি বলেন, ‘এই দুর্ঘটনা বহির্বিশ্বের বায়ারদের কাছে দেশের ইমেজকে সংকটে ফেলবে। বিমানবন্দরের মতো এমন জায়গায় অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা কতটা অরক্ষিত, সেটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের একটা শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।’
২৭ ঘণ্টা পর আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপণ
গত শনিবার বেলা সোয়া ২টার দিকে কার্গো ভিলেজে আগুন লাগে। পরে রাত ৯টা ১৮ মিনিটে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার কথা জানায়। যদিও সরকারি একটি তথ্যবিবরণীতে রাত ৯টার দিকেই আগুন সম্পূর্ণ নিভে গেছে বলে জানানো হয়েছিল। তবে ফায়ার সার্ভিস আনুষ্ঠানিকভাবে গতকাল জানিয়েছে, রবিবার বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপণ করা হয়েছে।
গতকাল ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আগুন সম্পূর্ণ নিভে গেলেও যেহেতু এখানে স্টিল স্ট্রাকচার রয়েছে, এগুলো এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এতে কিছুটা ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে। তবে আর ভয়ের কোনো কারণ নেই।
তাজুল ইসলাম বলেন, “কার্গো ভিলেজে যদি ‘ডিটেকশন’ ও ‘প্রটেকশন সিস্টেম’ থাকত, তাহলে এত বড় দুর্ঘটনা হতো না। এমন কোনো ব্যবস্থা আমরা সেখানে পাইনি। ভবিষ্যতে এখানে এ ধরনের সিস্টেম স্থাপন করা জরুরি।”
তিনি বলেন, কার্গো ভিলেজের কাস্টম হাউসের অংশে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল। ভবনটি বিভিন্ন ছোট কম্পার্টমেন্টে ভাগ করা ছিল এবং ভেতরে প্রচুর দাহ্য (কম্বাসেবল) ও হ্যাজার্ডাস উপাদান ছিল। এ জন্য অকুপেন্সি লোড অনেক বেশি ছিল এবং এ কারণেই আগুন নেভাতে অনেক বেশি সময় লেগেছে।
ব্যাপক তাপমাত্রা থাকার কারণে ভবনটি অবশ্যই ঝুঁকিপূর্ণ জানিয়ে ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা জানান, বেশ কিছু স্থানে ফাটল ধরেছে। কলামেও ফাটল দেখা গেছে। এ বিষয়ে ভবন কর্তৃপক্ষকে জরিপ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ভেতরে থাকা ওষুধ ও বিভিন্ন বাই-প্রোডাক্ট থেকে কেমিক্যাল এজেন্ট তৈরি হওয়ায় কিছুটা পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কা থাকলেও মিরপুরের কেমিক্যাল গোডাউনের মতো অতটা তেজস্ক্রিয়তা নেই।
আগুন পরিকল্পিত বলে সন্দেহ ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের আগুন পরিকল্পিত বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছে ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন। তারা বলছেন, এই অগ্নিকাণ্ড দেশের শিল্পকারখানা, আমদানি-রপ্তানি খাত এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষতি করে জাতীয় অর্থনীতিকে অচল করার একটি নীলনকশার অংশ হতে পারে। গতকাল সংগঠনের সভাপতি মিজানুর রহমানের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা বলেন। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের জন্য একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা দরকার বলেও দাবি করেন তিনি।