বরিশাল নগরীর প্রাণকেন্দ্র সদর রোড। এই পথ ধরে যাওয়ার সময় রাস্তার পাশে পড়বে লাল রঙের একটি বড় স্থাপনা। সেখানে প্রায়ই মানুষের জটলা দেখা যায়। হঠাৎ দেখে যে কেউ এটিকে কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয় ভাবতে পারেন। কিন্তু ভবনটি তা নয়। এটি বরিশালের ঐতিহ্যবাহী অশ্বিনী কুমার হল। অনেকে টাউন হল নামেও ডাকেন। বিভিন্ন দাবি নিয়ে প্রায়ই মানুষ এখানে জড়ো হন, নিজের প্রত্যাশা-প্রাপ্তি ও বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন। এ ছাড়া নাটক, মেলার মতো সাংস্কৃতিক অনেক কর্মকাণ্ড এখানে নিয়মিত হয়ে থাকে। রাস্তা দিয়ে চলার সময় মানুষ ঘাড় ঘুরিয়ে আগ্রহ নিয়ে একপলক দেখে নেন কী হচ্ছে এখানে। কিন্তু চিরচেনা সেই চিত্র এখন আর আগের মতো নেই। রাজনৈতিক দলের ব্যানার-ফেস্টুনের আড়ালে ঢাকা পড়েছে অশ্বিনী কুমার হলের অস্তিত্ব। সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকে ভবনটিকে খুঁজে পান না।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হলটির সামনের রেলিংয়ের সঙ্গে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে বিশাল আকারের কয়েকটি বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। এখানে রয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মজিবর রহমান সরোয়ার, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য আবু নাসের মোহাম্মদ রহমাতুল্লাহ, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক এবং সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক নুরুল আমিন এবং মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক জামাল হোসেন নোমানের ছবিসংবলিত বিলবোর্ড। এগুলোর কারণে পুরো অশ্বিনী কুমার হলটি ঢেকে গেছে।
স্থানীয়রা জানান, বছরের বেশির ভাগ সময় অশ্বিনী কুমার হল এবং বিবিরপুকুর রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ব্যানার ও বিলবোর্ডের কারণে আড়ালে থাকে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো প্রতিবাদ জানিয়েছে। কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান মেলেনি। আগে প্রতিবাদ হলে বিলবোর্ড, সাইনবোর্ড অপসারণ করা হতো। কিছুদিন পর আবারও সেগুলো আগের অবস্থায় ফিরে যেত। কিন্তু এখন এ বিষয়ে কথা বলারই কেউ নেই। যে যেভাবে পারছে বিলবোর্ড স্থাপন করে অশ্বিনী কুমার হল ঢেকে দিচ্ছে।
বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সভাপতি শুভংকর চত্রবর্তী বলেন, ‘অশ্বিনী কুমার এবং বিবিরপুকুর পাড়ে বিলবোর্ড ও সাইনবোর্ড স্থাপনার বিরুদ্ধে দুই দশকের বেশির সময় ধরে নাগরিক সমাজ ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা প্রতিবাদ করছে। কিন্তু কেউই এই দাবিকে গুরুত্ব দেয় না। যে দলের প্রভাব যখন বেশি থাকে সেই দলের নেতা-কর্মীরাই বিলবোর্ড স্থাপন করে নগরীর ঐতিহ্যগুলো আড়াল করেন।’
তিনি বলেন, ‘প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেন হিরনের আমল এবং সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর সময়ে অশ্বিনী কুমার হল, বিবির পুকুর, কালেক্টরি পুকুর, চৌমাথার পুকুরসহ ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার সামনে বিলবোর্ড ও সাইনবোর্ড স্থাপন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে ওই দুই আমলেও এসব সিদ্ধান্ত পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়েছে এমনটাও বলার সুযোগ নেই। তবে মাঝে মধ্যে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ ব্যানার, সাইনবোর্ড এবং বিলবোর্ড অপসারণ করত।’
সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) বরিশাল জেলা শাখার সভাপতি অধ্যক্ষ (অব.) গাজী জাহিদ হোসেন বলেন, ‘নিজের এবং দলের প্রচারের জন্য ব্যানার-বিলবোর্ড স্থাপন করা রাজনৈতিক চর্চার একটি অংশ। তবে রাজনৈতিক নেতাদের দেখতে হবে তাদের ব্যানার-বিলবোর্ডের কারণে সরকারি কিংবা দর্শনীয় কোনো স্থাপনা ঢেকে যাচ্ছে কি না।’
এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল বলেন, ‘ব্যানার-ফেস্টুন লাগানোর বিষয়ে ঈদের সময় সিটি করপোরেশনের নিষেধাজ্ঞা ছিল। তখন লাগানো হয়নি। এখন কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই, তাই অন্য দলের নেতা-কর্মীরা যেহেতু ব্যানার লাগিয়েছে। সে জন্য আমাদের কর্মীরাও একটি বিলবোর্ড টাউন হলের সামনে বসিয়েছেন।’
মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব জিয়া উদ্দিন সিকদার বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের খবরে প্রার্থীরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ফুটিয়ে তুলতে ব্যানার সাঁটাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ নিজের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করতে এমনটি করছেন। এগুলো রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। তবে নগরীর সৌন্দর্য যাতে নষ্ট না হয় সে বিষয়টি সবাইকে নজর দিতে হবে। দল থেকে নির্দেশনা না থাকায় এ ব্যাপারে কিছু করা যাচ্ছে না।’
বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) বিজ্ঞাপন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বাদল বলেন, ‘আমরা কোনো রাজনৈতিক ব্যানার সাঁটানোর অনুমতি দিইনি। নেতা-কর্মীরাও কোনো অনুমতি না নিয়ে এগুলো যে যার ইচ্ছা মতো সাঁটাচ্ছেন। কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দিলে আমরা ব্যানারগুলো খুলে ফেলব।