আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের কিস্তি ছাড় না হওয়ার যৌক্তিক কোনো কারণ সরকার বা ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। অর্থনীতিবিদরা ঋণ ছাড় স্থগিত হওয়াকে স্বাভাবিকভাবে দেখছেন না। ষষ্ঠ দফায় এই যাত্রায় ৮৬ কোটি ডলার ছাড় হওয়ার কথা ছিল। মোট ঋণের পরিমাণ ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন (৫৫০ কোটি) ডলার।
আইএমএফের পর্যালোচনা প্রতিনিধিদল সরকারের সঙ্গে সর্বশেষ বৈঠকের পর যে সংবাদ সম্মেলন করে, সেখানেও এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। এ সময় আইএমএফের গবেষণা বিভাগের উন্নয়ন সামষ্টিক অর্থনীতি শাখার প্রধান ক্রিস পাপাজর্জিও বলেন, আইএমএফের সঙ্গে চলমান ৫৫০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত থাকবে কি না, সে সিদ্ধান্ত হবে নতুন সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর। তিনি বলেন, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাওয়া নতুন সরকারকে এ ব্যাপারে মতামত প্রদানের সুযোগ দেওয়াই যৌক্তিক হবে।
ক্রিস পাপাজর্জিওর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও তাদের সঙ্গে চলমান ঋণের শর্ত পরিপালনের অগ্রগতি ও আর্থিক খাতের সংস্কার তুলে ধরে। ক্রিস পাপাজর্জিও পঞ্চম কিস্তি ছাড়ের শর্তগুলো নিয়েও তাদের পর্যালোচনা তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাটি ওয়েবসাইটে গত বৃহস্পতিবার এ-সংক্রান্ত একটি বিবৃতিও প্রকাশ করেছে। সেখানে সংস্থাটি বলেছে, ‘আইএমএফ-সমর্থিত চলমান কর্মসূচির পঞ্চম পর্যালোচনার বিষয়ে আলোচনা আগামী দিনে অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশের টেকসই সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অর্জনে আইএমএফ একটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অংশীদার হিসেবে কাজ করবে।’ সেখানে ঋণের কিস্তি ছাড় করা বা না করার বিষয়ে কোনো ব্যখ্যা দেয়নি সংস্থাটি।
গত ২৯ অক্টোবর থেকে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় ১৫ দিন ধরে আইএমএফ পর্যালোচনা কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ জন্য দলটি বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বিদ্যুৎ বিভাগ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছে। এর বাইরে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও আলাদা আলাদা বৈঠক করেছে আইএমএফ প্রতিনিধিদল।
নির্ধারিত সময়ে আইএমএফের ষষ্ঠ কিস্তি ছাড় না করার কারণ জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, আইএমএফের চলমান ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী কিস্তি ছাড় না করার পেছনে আসল কারণটা পরিষ্কার নয়। কিস্তি ছাড় না হওয়ার পেছনে আইএমএফ এবং বাংলাদেশ সরকার- দুই পক্ষ থেকেই কোনো স্বচ্ছতা দেখা যাচ্ছে না। সরকারের পক্ষ থেকে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে, সেটি অসংগতিপূর্ণ। আর আইএমএফের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও এ-সংক্রান্ত কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
একই বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, এটা ঠিক যে দুই পক্ষই স্পষ্টভাবে তেমন কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। তবে আইএমএফ আগের কিস্তি ছাড়ের সময় যেসব শর্ত দিয়েছিল, তার অনেকটিই পূরণ করতে পারেনি। তা ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদও খুব বেশি দিন নেই। ফলে তাদের দেওয়া কথা পরবর্তী সরকার মানবে কি না, সেটা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাই হয়তো আইএমএফ ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেই পরবর্তী ঋণ ছাড় করতে চায়। কিন্তু জুনে যখন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঋণের দুটি কিস্তি একসঙ্গে ছাড় করেছে, তখন তো তারা জানত যে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে। তারপরও কেন ছাড় করেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওই সময় আমাদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুবই খারাপ ছিল। যদি আইএমএফের কিস্তিটা না ছাড় করত, তাহলে কিন্তু সরকারের পক্ষে টিকে থাকাটা খুব কঠিন হতো। সেই কারণে সরকারের চেষ্টাটাও অনেক বেশি ছিল। আর আইএমএফও তখন কিছুটা নমনীয়ভাবে দেখেছে এবং ঋণের কিস্তিটা ছাড় করেছে। কেননা, আইএমএফ যদি অর্থ ছাড় না করত, তাহলে অন্য দাতাসংস্থাগুলোও কোনো ঋণ ছাড় করত না।’ এখনো আইএমএফের কিস্তি ছাড় না করায় অন্য কেউ ঋণ দেবে না বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে খবরের কাগজকে বলেন, তেমন কোনো কারণ নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ তো শেষ হয়ে যাচ্ছে। এখন নির্বাচিত নতুন সরকার আসবে। সেই সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেই তারা ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড় করতে চায়। কিন্তু এই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তো তারা কিস্তি ছাড় করেছে, সেই সঙ্গে ঋণের পরিমাণ ও মেয়াদও বাড়িয়েছে। তাহলে এখন কেন তারা পিছিয়ে যাচ্ছে? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আগের কিস্তি ছাড়ের সময় গত জুনে তারা যেসব শর্ত দিয়েছিল, তার অধিকাংশই আমরা পরিপালন করেছি। তবে বাস্তবতার কারণে দু-একটা শর্ত পরিপালন করতে পারেনি। তারা নতুন করে আরও কিছু শর্ত দেওয়ার বিষয়েও কথা বলেছেন। আইএমএফের প্রতিনিধিদলটি আগামী মার্চ-এপ্রিলে আবার একটি পর্যালোচনা করবে। তারপর নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে আগামী জুনে একসঙ্গে দুটি কিস্তি ছাড় করবে।’
এই প্রসঙ্গে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্যে ব্যাখ্যাকে এড়িয়ে যাওয়া। ব্যাখ্যাটি যদি নির্বাচনের কারণেই হতো, তাহলে তো জুন মাসেই তা বলার কথা ছিল। তিনি বলেন, আগের কিস্তি ছাড়ের সময় আইএমএফ যেসব শর্ত দিয়েছিল, তার অনেকটিই পূরণ করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। কিছু পদক্ষেপে তারা অসন্তুষ্ট হয়ে থাকতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার যেসব শর্ত পূরণ করতে পারেনি তার অন্যতম কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং খেলাপি ঋণ কমানো। খেলাপি ঋণ কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক সফল হতে পারেনি। জুনের খেলাপি ঋণের অঙ্ক নিয়েও স্বচ্ছতা নেই, কারণ এটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। মুদ্রাবাজারের ব্যবস্থাপনা এবং যেভাবে ব্যাংক একীভূত করা হচ্ছে, তা নিয়েও আইএমএফের কিছু আপত্তি রয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংক খাতের সংস্কার, তারল্য পরিস্থিতি, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের গতি কমে যাওয়া নিয়েও তারা প্রশ্ন তোলেন। এ সময় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে যথাযথ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
আইএমএফের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাজস্ব ও আর্থিক খাতের সমস্যা মোকাবিলায় সাহসী নীতি গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি, যাতে টেকসই আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করে শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার করা যায়। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ঝুঁকি এখনো প্রবল। বিশেষ করে যদি নীতি প্রণয়নে বিলম্ব হয় কিংবা অপর্যাপ্ত নীতি গ্রহণ করা হয়, তাহলে ঝুঁকি থাকবে।
আইএমএফের বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকার সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রশংসনীয় অর্জন অগ্রগতি করেছে। তবে দুর্বল কর রাজস্ব এবং আর্থিক খাতের মূলধন ঘাটতির কারণে এখনো আর্থিক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। গত বছরের গণ-অভ্যুত্থান ও অন্য অনিশ্চয়তায় উৎপাদনে বিঘ্ন হয়। অন্যদিক মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্ক থেকে ৮ শতাংশে নামলেও এখনো তা উচ্চপর্যায়েই রয়েছে।
আইএমএফ মিশনপ্রধান ক্রিস পাপাজর্জিও সতর্ক করে বলেন, দুর্বল কর রাজস্ব আদায় এবং আর্থিক খাতের মূলধন ঘাটতি বাংলাদেশের জন্য এখনো বড় ঝুঁকি। সেই সঙ্গে রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতে সংস্কারে বিলম্ব বা দুর্বল পদক্ষেপ প্রবৃদ্ধিকে আরও দুর্বল করবে, মুদ্রাস্ফীতি বাড়াবে এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে।
আইএমএফ বলেছে, সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগের তদারকি উন্নত করা এবং ভর্তুকি ব্যয় রাজস্ব সক্ষমতার মধ্যে সীমিত রাখা হলে সম্পদ পুনর্বণ্টনে সহায়তা মিলবে। এতে সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী সম্প্রসারণ ও ব্যাংক খাতে প্রয়োজনীয় সহায়তার দেওয়ার মতো দরকারি রাজস্বের সুযোগও তৈরি হবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, দুর্বল ব্যাংকগুলোর সমস্যা মোকাবিলায় একটি বিশ্বস্ত ও সমন্বিত সরকারি কৌশল প্রণয়ন করতে হবে, সেখানে মূলধন ঘাটতি, প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা, আইনি কাঠামোয় পুনর্গঠন এবং অর্থের উৎস নির্ধারণ করা থাকবে। এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সম্পদ মান পর্যালোচনা প্রয়োজন। ব্যাংক পরিচালনা, স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।