ক্যালিব্রেশন চার্ট না থাকায় পদ্মা অয়েলের জ্বালানি তেল পরিবহনকারী জাহাজ এমটি হাই-৪-এর রিনিউ করেনি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। অথচ রিনিউ ছাড়াই জাহাজটি পদ্মার তেল পরিবহন করছে। গত ১১ নভেম্বর জাহাজটি চট্টগ্রাম থেকে জ্বালানি তেল নিয়ে গোদনাইল গেছে। বর্তমানে সেখানে জ্বালানি তেল আনলোড করার অপেক্ষায় আছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এমটি হাই জাহাজের চট্টগ্রামের প্রতিনিধি মো. জুয়েল খবরের কাগজকে বলেন, ‘ডকুমেন্টের কারণে এমটি হাই-৪ নামক জাহাজের নবায়ন বিপিসি এখনো করেনি। তবে আমরা আবেদন করেছি।’ নবায়ন না করেও জ্বালানি পরিবহন কীভাবে করছে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জাহাজটি জ্বালানি পরিবহন করছে কি না, তা আমার জানা নেই। সেটা ঢাকা অফিস বলতে পারবে।’ ঢাকা অফিসের মোবাইল নম্বর চাইলে তিনি দিতে রাজি হননি।
অথচ বিপিসি বলছে জাহাজে জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে বিপিসি থেকে রিনিউ করা বাধ্যতামূলক। রিনিউ না করে জ্বালানি পরিবহন করার সুযোগ নেই।
পদ্মা অয়েলের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, ঢাকার একটি কোম্পানির মালিকানাধীন এমটি হাই-১, ২ ও ৪ নামে তিনটি জাহাজ পদ্মা অয়েলের জ্বালানি পরিবহন করে। জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে একটি গ্রহণযোগ্য ট্রানজিট লস ধরা থাকে, যা ডিজেলের ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ, ফার্নেস অয়েলের ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ এবং অকটেন ও পেট্রোলের ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ। কিন্তু এমটি হাইয়ের জাহাজগুলো তা কয়েক শতাংশ পর্যন্ত লস দেখায়। তবে এ ক্ষেত্রে পদ্মা অয়েল জাহাজের ভাড়া থেকে এই লোকসানের টাকাটা কেটে নেয়। এই ট্রানজিট লসে আপাত দৃষ্টিতে পদ্মা অয়েল ও বিপিসির কোনো লোকসান চোখে না পড়লেও বাস্তবে তারা সরকারি তেল গন্তব্যে যাওয়ার পথে বাইরে বিক্রি করে দেয় বলে অভিযোগ আছে। পদ্মা অয়েল যেহেতু ওই লোকসান জাহাজের ভাড়া থেকে কেটে নেয় তাই এ নিয়ে তারা কোনো উচ্চবাচ্য করে না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারি প্রতিষ্ঠানের তেল বিক্রি করে এজেন্টের মাধ্যমে। সেখানে নির্ধারিত কমিশন দেওয়া হয়। জাহাজের মালিক কিংবা ম্যানেজার পরিবহনের সময় অন্য কারও কাছে সেই তেল বিক্রি করে দিলে তা চোরাই তেল হয়ে যায়। পদ্মা অয়েল নিয়মিত সেই আশকারা দিয়ে আসছে।
সূত্র জানায়, পদ্মা অয়েল কোম্পানি ভাড়ায় তেল পরিবহনের জন্য যেসব জাহাজ ভাড়া করে প্রতিটি জাহাজকে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ক্যালিব্রেশন করে চার্ট তৈরি করতে হয়। বিএসটিআই থেকে ক্যালিব্রেশন করে পদ্মা এবং বিপিসিতে জমা দিতে হয়। এই চার্টসহ অন্যান্য ডকুমেন্ট বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনে জমা দিয়ে নিবন্ধন নিতে হয়। তারপর পদ্মা অয়েলের সঙ্গে জ্বালানি পরিবহনের চুক্তি করে। চুক্তির পর জ্বালানি পরিবহন করতে পারে। এটি মেঘনা, যমুনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সেই ক্যালিব্রেশন চার্টে উঠে আসে জাহাজটির প্রকৃত তেল ধারণ ও পরিবহন সক্ষমতা কত। কারণ কোনো জাহাজমালিক বেশি ধারণক্ষমতার জাহাজে কম ধারণক্ষমতা দেখিয়ে তেল পরিবহন করার চেষ্টা করে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে ওইসব জাহাজে অতিরিক্ত জ্বালানি নিয়ে বাইরে বিক্রি করার সুযোগ খোঁজে। এই চুরি বন্ধে বিপিসি ক্যালিব্রেশন চার্টকে খুব গুরুত্ব দেয়। এই চার্ট ছাড়া সংস্থাটি জাহাজের নবায়ন করে না।
নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, এমটি হাই-৪ কোস্টাল ট্যাংকার জাহাজটি পদ্মার সঙ্গে এগ্রিমেন্ট রিনিউ করতে পারেনি। কারণ জাহাজটির ক্যালিব্রেশন চার্ট না থাকায় বিপিসি সেটি রিনিউ করেনি। তাই জাহাজটি এখন পদ্মা অয়েলের জ্বালানি পরিবহন করতে পারবে না। কিন্তু অনিয়ম করে এ পর্যন্ত চার ট্রিপ জ্বালানি পরিবহন করেছে জাহাজটি। বর্তমানে পদ্মার অয়েলের জ্বালানি নিয়ে জাহাজটি গোদনাইলে আনলোড করার অপেক্ষায় আছে। একেকটি ট্রিপে জাহাজগুলো ১৭ থেকে ১৮ লাখ লিটার জ্বালানি তেল পরিবহন করে। পদ্মা থেকে একেক ট্রিপের জন্য ভাড়া পায় দূরত্ব ভেদে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা। পদ্মার একাধিক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যেহেতু পদ্মার সঙ্গে জাহাজটির চুক্তি নেই। জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায় কে নেবে? চুরি হয়ে গেলে দাবিও করতে পারবে না। ক্ষতিপূরণ কে দেবে? পদ্মার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া এত বড় অনিয়ম করা সম্ভব নয়।’
তারা জানান, পদ্মা অয়েলে জ্বালানি পরিবহনের জন্য বর্তমানে জাহাজের অভাব নেই। এখানে ৬০টি জাহাজ আছে। তার মধ্যে ৩৫টি কোস্টাল ট্যাংকার, আর ২৫টি বে-ক্রসিং শ্যালো ড্রাফট ট্যাংকার।
জানতে চাইলে পদ্মা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই।’ তিনি এ নিয়ে পদ্মা অয়েলের জেনারেল ম্যানেজার (অপারেশন) আসিফ মালিকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
পদ্মা অয়েলের জেনারেল ম্যানেজার (অপারেশন) আসিফ মালিক খবরের কাগজকে বলেন, ‘সব জাহাজ নবায়নের জন্য ফাইল বিপিসিতে পাঠানো হয়েছে। নবায়ন হয়েছে কি না, তা তার জানা নেই। বিষয়টি নিয়ে তিনি এজিএম (সাপ্লাইয়ার্স ডিস্ট্রিবিউশন) শাহজাহান কবিরের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য এজিএম (সাপ্লাইয়ার্স ডিস্ট্রিবিউশন) শাহজাহান কবিরকে ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠালে উত্তর দেননি। পদ্মা অয়েল কার্যালয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে সাংবাদিক পরিচয় জেনে তিনি মিটিংয়ে আছেন বলে জানান। ফলে তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
জানতে চাইলে বিপিসির ব্যবস্থাপক (মার্কেটিং) বদরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘পদ্মা থেকে ১৩-১৪টি জাহাজের রিনিউ করার জন্য ফাইল পাঠানো হয়েছিল। এমটি হাই-৪ ছাড়া বাকি সব জাহাজের রিনিউ হয়েছে। ক্যালিব্রেশন চার্ট না থাকায় এই জাহাজের রিনিউ করা হয়নি।’ রিনিউ না করেও তেল পরিবহন করতে পারে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোনো সুযোগ নেই। তথ্যপ্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’