বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন সংকটে। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব এবং দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে পাল্টা তলবের ঘটনায় এই সংকট এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। দুই দেশের হাইকমিশনে উগ্রবাদীদের অব্যাহত হামলার হুমকি রয়েছে। ফলে পারস্পরিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। গত এক সপ্তাহে এ নিয়ে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার ব্যাখ্যায় একে অন্যের প্রতি অনাস্থা স্পষ্ট হয়েছে।
দিল্লিতে নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেদ করে গত শনিবার রাতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের গেটের সামনে চলে আসেন ভারতের একটি উগ্র সংগঠনের নেতারা। এরপর তারা হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে হুমকি দেন। ভারতের ‘অখণ্ড হিন্দু রাষ্ট্রসেনা’র ব্যানারে একদল উগ্রপন্থি বাংলাদেশ হাউসের মূল ফটকে অবস্থান নেয়। এরপর তারা চিৎকার করে হুমকি-ধমকি দেয়। দিল্লিতে হাইকমিশনারকে হুমকির ঘটনায় গতকাল রবিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক অস্বস্তি দেখা যায়। এই ঘটনায় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে আবারও তলবের গুঞ্জন ছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। দিল্লির ঘটনায় তলব না কি প্রতিবাদপত্র দেওয়া হবে, তা নিয়ে দিনভর চিন্তাভাবনা চলে। অবশেষে গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকার পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে দুর্বৃত্তদের কর্মকাণ্ড চালানোর অনুমতি ছিল।
এদিকে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে গতকাল ভারতের পক্ষ থেকে একটি ব্যাখ্যা দেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘দিল্লিতে হাইকমিশনারকে হুমকির ঘটনায় বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা লক্ষ করেছি।’ তিনি বলেন, শনিবার নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে প্রায় ২০-২৫ জন যুবক জড়ো হয়ে ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাসের ভয়াবহ হত্যার প্রতিবাদে স্লোগান দেয় এবং বাংলাদেশের সব সংখ্যালঘুর সুরক্ষার আহ্বান জানায়। এ সময় নিরাপত্তাবেষ্টনী ভাঙার বা নিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরি করার কোনো চেষ্টা করা হয়নি। তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে মোতায়েন পুলিশ কয়েক মিনিট পর দলটিকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ ঘটনার দৃশ্যমান প্রমাণ জনসমক্ষেই রয়েছে। ভিয়েনা কনভেনশন অনুসারে ভারত তার ভূখণ্ডে বিদেশি মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জয়সওয়াল আরও বলেন, ভারত বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতির ওপর নিবিড়ভাবে নজর রাখছে।
এদিকে জয়সওয়ালের দেওয়া ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন গতকাল ব্রিফিংয়ে বলেন, দিল্লিতে উগ্রবাদীদের হাইকমিশন প্রাঙ্গণে ঢোকার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের কাছে সব প্রমাণ আছে। দিল্লিতে নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে হাইকমিশনারকে হুমকির ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যম ঠিকই লিখেছে। তিনি বলেন, ‘ভারতীয় প্রেস নোটে যা বলা হয়েছে, তা আমরা পূর্ণাঙ্গভাবে প্রত্যাখ্যান করছি। সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করি এ জন্য যে বিষয়টি যত সহজভাবে উত্থাপন করা হয়েছে, অত সহজ না। আমাদের মিশন কূটনৈতিক এলাকার ভেতরে, এমন না যে এটা বাইরে কোনো জায়গায় বা কূটনৈতিক এলাকার শুরুতে, তা কিন্তু না। তারা বলছে, ২০-২৫ জনের একটি দল হতে পারে। আবার সংখ্যা বেশিও হতে পারে। হিন্দু চরমপন্থি সংগঠনের ২৫ জনের একটি দলের লোকজন এত দূর পর্যন্ত আসতে পারবে কেন? একটা সুরক্ষিত এলাকায় তাদের প্রবেশ এ কথাই প্রমাণ করে যে তাদের আসতে দেওয়া হয়েছে। যেভাবেই হোক, তারা আসতে পেরেছে, আসার কথা না কিন্তু। তারা সেখানে হিন্দু নাগরিক হত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে চলে গেছে, ব্যাপারটা তাও না। তারা অনেক কিছু বলেছে, সেটা আমরা জানি।’
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘এখানে ব্যাপারটা এ রকম না যে আমাদের হাইকমিশনে তারা এসেছে, দুটো স্লোগান দিয়েছে। এর ভেতরে কিন্তু একটা পরিবার বাস করে। হাইকমিশনার এবং তার পরিবার সেখানে বাস করে। ওই ভবনে বসবাসকারীরা হুমকি অনুভব করেছে এবং আতঙ্কিত হয়েছে। সেখানে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল না, মাত্র দুজন নিরাপত্তাকর্মী ছিল, তারা চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। আমরা মনে করি, সাধারণ নিয়মে নিরাপত্তার বিষয়ে যে নিয়মকানুন আছে সেটা এখানে পালিত হয়নি।’
ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাসের নৃশংস হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে তৌহিদ হোসেন বলেন, একজন বাংলাদেশি নাগরিক নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। এটার সঙ্গে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার বিষয়টি একসঙ্গে করে ফেলার কোনো মানে হয় না। যাকে হত্যা করা হয়েছে তিনি বাংলাদেশের নাগরিক এবং অবিলম্বে সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা শুধু যে বাংলাদেশে ঘটে তা না, এ অঞ্চলের সব দেশে ঘটে এবং প্রত্যেক দেশের দায়িত্ব হচ্ছে সে ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া। বাংলাদেশ সেই ব্যবস্থা নিচ্ছে।
দিল্লিতে হাইকমিশনারকে হুমকির ঘটনায় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় দূতকে তলব করা হবে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা যা বলার বলেছি। আমরা কী করব আমাদের ওপর ছেড়ে দেন। আমরা তো ব্যবস্থা নিচ্ছি, সেটা দেখতে পাচ্ছেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে এসব কথাবার্তা হচ্ছে। আমি যে কথাটা বলছি সেটা তো বাংলাদেশ সরকারের কথা।’
তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র খবরের কাগজকে জানায়, সম্প্রতি ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে উভয় দেশই একে অন্যের হাইকমিশনারকে তলব করেছে। দিল্লির ঘটনায় এক সপ্তাহের মধ্যে আবার ভারতের হাইকমিশনারকে তলবের দিকে যেতে চায় না ঢাকা। এর বিকল্প আর কোনো উপায়ে প্রতিবাদ জানানো যায় কি না, তা নিয়ে চিন্তা করা হচ্ছে। তবে দিল্লির ঘটনায় ঢাকার পক্ষ থেকে একটি প্রতিবাদ অবশ্যই জানানো হবে।
সূত্র জানায়, দিল্লিতে শনিবার রাত ৯টার দিকে তিনটি গাড়িতে করে কিছু লোক এসে বাংলাদেশ হাউসের গেটে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চিৎকার করে। তারা বাংলা ও হিন্দি মিলিয়ে হিন্দুদের নিরাপত্তা দিতে বলে এবং হাইকমিশনারকে হুমকি দেয়। তারা বলে, বাংলাদেশে হিন্দুদের মেরে ফেললে আমরা তোমাদের সবাইকে মেরে ফেলব। এ সময় হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ ও তার স্ত্রী বাংলাদেশ হাউসে অবস্থান করছিলেন। এ ছাড়া ত্রিপুরার আগরতলায়ও বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনের সামনে শনিবার একদল উগ্র ভারতীয় বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।
এর আগে ঢাকায় গত বুধবার ‘মার্চ টু ইন্ডিয়ান হাইকমিশন’ কর্মসূচির ডাক দেন ‘জুলাই ঐক্যের’ নেতা-কর্মীরা। এতে পুলিশের বাধার মুখে তারা বাড্ডার পর আর সামনে যেতে পারেননি। এ ছাড়া গত বৃহস্পতিবার ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে চট্টগ্রামে ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনারের বাসভবনেও হামলার চেষ্টা হয়। গত এক সপ্তাহে ঘটে যাওয়া একাধিক ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক ও আস্থা সবচেয়ে বেশি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা।
সম্পর্ক এভাবে চলতে পারে না: হুমায়ুন কবির, সাবেক রাষ্ট্রদূত
অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছরে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে সম্পর্ক যেভাবে চলছে তা এভাবে চলতে পারে না। প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক অঙ্গনে যেভাবে পাল্টাপাল্টি প্রতিযোগিতা চলছে, এটা অগ্রহণযোগ্য। এটা কূটনৈতিক রীতিনীতির বাইরে। বড় প্রতিবেশী দেশ হিসেবে সম্পর্কোন্নয়নে ভারতের যেমন উদ্যোগী হওয়া দরকার, তেমনি আমাদেরও কথাবার্তায় সংযমী হওয়া দরকার। ঢাকা-দিল্লির মধ্যে যা চলছে, তাতে স্বাভাবিক সম্পর্ক আশা করা যায় না। এই প্রতিযোগিতা থেকে বের হতে হবে।
আরও সচেতন ও কৌশলী হতে হবে: মুন্সি ফয়েজ আহমেদ, সাবেক রাষ্ট্রদূত
ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে সম্পর্কোন্নয়ন করতে হলে প্রতিযোগিতামূলক প্রতিক্রিয়া জানানো থেকে বিরত থাকতে হবে। একজন কিছু বললে আরেকজন আরও বাড়িয়ে কিছু বলার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। পারস্পরিক আস্থার জায়গা তৈরির চেষ্টা চালাতে হবে। সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য বাড়িয়ে বলা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না। কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে আমাদের আরও সচেতন ও কৌশলী হতে হবে। কোনো অসংগতির প্রতিবাদ অবশ্যই করতে হবে, কিন্তু সে ক্ষেত্রে কৌশলী হতে হবে। ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে উত্তেজনা না বাড়িয়ে যা করলে উত্তেজনা কমবে সেই পন্থা নিতে হবে। ভারতের তুলনায় আমাদের সক্ষমতা অনেক কম, সেটি মাথায় রেখেই আমাদের জন্য আশঙ্কার সৃষ্টি যাতে না হয় সেটি মনে রাখতে হবে।