বছরের শুরুতেই প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মাঝে দেখা দিয়েছে ‘মবোক্রেসি’ আতঙ্ক। মাঠ প্রশাসন থেকে শুরু করে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত আতঙ্ক ও উদ্বেগ ভর করেছে। নির্বাচনের আগে হঠাৎ করেই রাজনৈতিক ‘ট্যাগ’ দেওয়া শুরু হওয়ায় কর্মকর্তাদের মাঝে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সচিবালয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে পাওয়া গেছে এমন চিত্র।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনের প্রার্থী বাছাইকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে মাঠ প্রশাসনের কয়েকজন রিটার্নিং অফিসার (ডিসি) ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারের (ইউএনও) ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছে দেশের বড় একটি রাজনৈতিক দল। গুঞ্জন রয়েছে, মাঠ প্রশাসনের বেশ কিছু কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের জন্য ইতোমধ্যে একটি তালিকাও জমা দিয়েছে দলটি।
কর্মকর্তারা জানান, মাঠ প্রশাসনের বেশ কিছু কর্মকর্তার ব্যাপারে এরই মধ্যে দেশের বড় একটি দল প্রকাশ্যে আপত্তি জানিয়েছে। কিছু দিন আগেও (ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত) রাজনৈতিক দলটি ক্ষমতায় যাওয়ার সংকল্পে অটুট ছিল। হঠাৎ করে এখন সেই দলটির এমন আচরণে নিরাপত্তা সংকটের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনেকেই। প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সারা দেশে ‘মব ভায়োলেন্সের’ একটি অপসংস্কৃতি চলছে। এমনও দেখা গেছে, নিজ স্বার্থ উদ্ধারে কোনো কোনো স্থানে মব ভায়োলেন্স তৈরি করছে কেউ কেউ। মাঠ প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তাই এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
কর্মকর্তারা বলছেন, যদি এমন হয়, তবে নির্বাচনে নিরপেক্ষ কর্মকর্তা পাওয়াই মুশকিল হবে। এভাবে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ যদি জমা হতেই থাকে, তবে মাঠ প্রশাসন থেকে দায়িত্ব পালনরতদের উঠিয়ে এনে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে হবে সেখানে। এর ফলে প্রথমত সেখানে শৃঙ্খলার ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এই মুহূর্তে মাঠ প্রশাসনে রদবদলের উদ্যোগ নিলে নিরপেক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তার অভাবে দলীয়, অদক্ষ ও দুর্নীতিতে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে দুষ্টরা মাঠ প্রশাসনে নিয়োগ পেয়ে যেতে পারে। আরও শঙ্কার বিষয় এই যে, এর ফলে গত সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তারাও এই সুযোগে মাঠ প্রশাসনে নিয়োগ পেতে পারেন। এতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে, যার ফলে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিবেশ সুষ্ঠু থাকবে না। নির্বাচন হতে পারে প্রশ্নবিদ্ধ। ইতোমধ্যে সর্বশেষ নিয়োগপ্রাপ্ত ৫২ ডিসির মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধেই অভিযোগ উঠেছে।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, দেশের বড় দুই দল ভেতরে ভেতরে কর্মকর্তাদের যাচাই-বাছাই করছে। কোনো কর্মকর্তাকে নিজেদের মতাদর্শের মনে না হলেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অন্য দলের ট্যাগ দিয়ে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের ১৫ কর্মকর্তাকে শাস্তিমূলক বদলির জন্য রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে একটি তালিকা করা হয়েছে। পাশাপাশি তালিকার অধিকাংশ কর্মকর্তাকে এই মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থায় বদলি করা হয়েছে।
২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অতিরিক্ত রিটার্নিং কর্মকর্তার (এআরও) দায়িত্ব পালন করেছেন এমন প্রায় ৫০০ কর্মকর্তাকে মাঠ প্রশাসনে নিয়োগ দেয়নি সরকার। তাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী সরকারকে বিভিন্ন সময়ে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। এমন অভিযোগ খণ্ডন করে ২৮তম ও ২৯তম ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রশাসনের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী মাঠ প্রশাসনের ইউএনও পদে এই দুই ব্যাচের কর্মকর্তাদের ব্যাচভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। এই পদে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ অনেক কম। ব্যাচভিত্তিক নিয়োগ হলেও ২০১৮ ও ২০২৪ সালে ইউএনও পদে যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়নি, বরং তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, শৃঙ্খলা ভঙ্গ অথবা অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছে।
জনপ্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে যেসব কর্মকর্তা এআরও পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, এবার মাঠ প্রশাসনে তাদের নিয়োগ দেওয়া হবে না। এটা সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত। এতে প্রশাসনে নিরপেক্ষ, দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তা সংকট থাকায় নিয়মিত কাজেরও ব্যাঘাত ঘটছে।
ঊর্ধ্বতন এই কর্মকর্তা জানান, প্রশাসনে সিনিয়র সচিব, সচিব ও সচিব পদমর্যাদার পদ রয়েছে ৭৮টি। সেখানে গতকাল (৫ জানুয়ারি) পর্যন্ত এই পদে কর্মরত ছিলেন ৭৩ জন। আবার অতিরিক্ত সচিবের অনুমোদিত পদ রয়েছে মোট ৪১৮টি। অথচ কর্মরত কর্মকর্তা আছেন ২৮৬ জন।
বিপরীতে পদের চেয়ে বেশি যুগ্ম সচিব (১০১৭ জন) ও উপসচিব (১৬৯৮ জন) পদের কর্মকর্তা থাকলেও রাজনৈতিক ট্যাগ ও বিতর্কিত হওয়ার আশঙ্কায় এসব কর্মকর্তাকে যথাযথ পদে পদায়ন করা যাচ্ছে না। এতে প্রশাসনে এমনিতেই একটি অদৃশ্য সংকট তৈরি হয়েছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর রশি টানাটানি।
রাজনৈতিক দুই দলের চাপাচাপিতে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে মন্ত্রণালয় ও বিভাগভিত্তিক কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরিতে। স্থানীয় সরকার বিভাগসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তাদের মাঝে বদলি আতঙ্ক ভর করেছে। অভিযোগ করে কয়েকজন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে দলীয় ট্যাগ দিয়ে কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরি হয়েছে। যাদের সবাইকে সচিবালয় এবং সচিবালয়ের বাইরে কম গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন একাধিক কর্মকর্তা।
স্থানীয় সরকার বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগের ১৫ কর্মকর্তাকে বিতর্কিত করতে এবং সচিবালয় থেকে সরিয়ে দিতে যে তালিকা করা হয়েছে, তা নিয়েও অনেকের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। এই তালিকা প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত তিন কর্মকর্তাকেও অনেকে দুর্নীতিবাজ বলে থাকেন। অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ শুরুর পর ডিসি নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ ওঠে। সে সময় এক কর্মকর্তার কক্ষে মোটা অঙ্কের টাকার চেক পাওয়া যায়। এবার সেই তারাই এই ১৫ জনের তালিকা প্রণয়নে যুক্ত রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ে নতুন উপদেষ্টা দায়িত্ব নেওয়ার পর সুযোগ কাজে লাগিয়ে এই মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিতে তালিকা করা হয়। এসব কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিতে প্রচার করা হয়, নতুন উপদেষ্টার পরামর্শেই কর্মকর্তাদের বদলি করা হচ্ছে। অথচ খবরের কাগজকে উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ সূত্র নিশ্চিত করেছে, এ বিষয়ে উপদেষ্টা কিছু জানেন না। তিনি দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে আগ্রহী। তার নিজস্ব কোনো পছন্দের কর্মকর্তা নেই। নিজের পছন্দমতো প্রশাসন সাজিয়ে নেবে, এমন কোনো ভাবনাও উপদেষ্টার ভেতরে নেই। উপদেষ্টা সব সময় বলে থাকেন, যারা যোগ্য, সৎ ও দক্ষ, তাদের সঙ্গেই কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি। অথচ তার নাম ভাঙিয়ে ইতোমধ্যে এই মন্ত্রণালয়ের প্রায় ১৩ জন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে আগের উপদেষ্টার একান্ত সচিবসহ (পিএস) ১৩ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়েছেন।
বদলির বিষয়ে কথা বলতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে দুটি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে এ মন্ত্রণালয়ে রয়েছেন, তাদেরই সরানো হচ্ছে।
তবে একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ মন্ত্রণালয়ে আরও অন্তত পাঁচজন কর্মকর্তা রয়েছেন, তারা অনেক দিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, তাদেরও বদলি করা হবে।