নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। যেভাবে বিভিন্ন স্থানে অস্ত্রের অবাধ ব্যবহার দেখা যাচ্ছে, খুন-জখম হচ্ছে, সে তুলনায় জব্দ হওয়া অস্ত্র বা অস্ত্র কারবারিদের গ্রেপ্তার দেখছেন না বিশ্লেষকরা। বাড়তি উৎকণ্ঠায় ফেলেছে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় থানা থেকে লুট হওয়া মারণাস্ত্রগুলো।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবহৃত ওই সব লুণ্ঠিত ১ হাজার ৩০০-এর বেশি অস্ত্র পেশাদার অপরাধীদের হাতে রয়ে গেছে। ফলে অবৈধ অস্ত্র এবং লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের কারণে মারাত্মক নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা মূলত রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ভীতি বাড়িয়ে দিচ্ছে। এরই মধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হয়েছেন। এ রকম পরিস্থিতিতে যদিও পুলিশ বলছে অস্ত্র উদ্ধারে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে।
ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল শুক্রবার ঠাকুরগাঁও শহরে নিজ বাসভবনে বিএনপি মহাসচিব সাংবাদিকদের বলেন, গোটা দেশের মানুষ নির্বাচনের অপেক্ষায় থাকলেও বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে সন্তুষ্ট নন। তিনি আরও বলেছেন, ‘রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ওপর যেভাবে একের পর এক হামলা ও খুনের ঘটনা ঘটছে, বিশেষ করে বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী এর শিকার হচ্ছেন। এ বিষয়ে সরকার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম মুঠোফোনে খবরের কাগজকে বলেন, ‘লুণ্ঠিত বা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আমরা চেষ্টা করছি। সেভাবে হয়তো পারছি না, তবে আমরা অস্ত্র উদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। পুলিশের সব ইউনিটকে অভিযানসহ বাড়তি নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
গত ৭ জানুয়ারি রাজধানীর কারওয়ান বাজারসংলগ্ন তেজতুরী বাজারের একটি গলিতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান ওরফে মুসাব্বির নিহত হন। এ ঘটনায় আবু সুফিয়ান মাসুদ নামে আরেকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মক আহত হন। এর আগে ৩ জানুয়ারি যশোর শহরের শংকরপুর এলাকায় আলমগীর হোসেন নামে বিএনপির এক স্থানীয় নেতাকে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে এ রকম আরও বেশ কয়েকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীতে আততায়ীদের গুলিতে গুরুতর আহত হওয়া ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি ছয় দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে মারা যান। বহুল আলোচিত এই হতাকাণ্ডের পর অবৈধ অস্ত্রের তৎপরতা নিয়ে সমালোচনা বাড়তে থাকে। আতঙ্ক দেখা দেয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মাঝে। এর পরও খুনের অনেক ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু সেই তুলনায় অবৈধ বা লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে সাফল্য দেখছেন না বিশ্লেষকরা।
এ প্রসঙ্গে সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘বৈধ অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ বা আটকের বিষয়গুলো জননিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। অবৈধ অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে থাকলে অপরাধ ভয়ানক মাত্রায় বাড়বে–এটাই স্বাভাবিক। বর্তমানে দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনমুখী নানা কর্মসূচি-তৎপরতা চলছে। এ সময়ে অবৈধ অস্ত্র বা অস্ত্র কারবারিদের তৎপরতা কঠোরভাবে দমন করতে না পারলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।’
গত শুক্রবার নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে মেঘনা নদীবেষ্টিত চরাঞ্চল কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নে অভিযান চালিয়ে পরিত্যক্ত ঘর থেকে থানা থেকে লুট হওয়া একটি পিস্তল-গুলিসহ বিপুলসংখ্যক দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করেছে যৌথ বাহিনী। এ সময় গ্রেপ্তার করা হয় পাঁচজনকে। একই দিনে রাজধানীর পল্লবী এলাকায় যৌথ অভিযানে একটি বিদেশি পিস্তল, দুই রাউন্ড গুলি, মাদকসহ মিরপুরের কুখ্যাত মাদকসম্রাজ্ঞী শাহজাদী বেগমসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার আগে গত ১ জানুয়ারি রাজধানীর শাহ আলী থানার গড়ান চটবাড়ী এলাকা থেকে অবৈধ দুটি বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গুলিসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-৪।
অবৈধ অস্ত্রের তৎপরতার প্রসঙ্গে সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদা খবরের কাগজকে বলেন, ‘নির্বাচনের সময় অবৈধ অস্ত্র কেনাবেচা এবং সন্ত্রাসীদের তৎপরতা বেড়ে যায়। পাশাপাশি লুট হওয়া অস্ত্রও সন্ত্রাসীদের হাতে রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে আগ্নেয়াস্ত্রের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ বা অস্ত্র উদ্ধার করা খুব জরুরি। কেননা, নির্বাচনসহ যেকোনো পরিবেশকে অস্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে অবৈধ অস্ত্রধারীরা ব্যাপক ভূমিকা পালন করে থাকে।’
অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান সন্তোষজনক কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, অভিযানের সাফল্য আরও বাড়াতে হবে। এ জন্য গোপন খবরের ‘নেটওয়ার্কগুলো’ ভালোমতো সচল করা জরুরি। বিভিন্ন স্তরে বিশ্বস্ত সোর্স তৈরি করে তথ্য সংগ্রহের দিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই অস্ত্র কারবারিসহ পেশাদার অপরাধীদের অপতৎরতা রোধ করা সম্ভব।