ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের কার্ড ও গাড়ির স্টিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে এবার নতুন নিয়ম চালু করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার যুক্তিতে প্রথমবারের মতো অনলাইন পদ্ধতিতে আবেদন বাধ্যতামূলক করা হলেও বাস্তবে সেই উদ্যোগই এখন কমিশনের জন্য বড় ধরনের বিতর্ক ও আস্থার সংকটে রূপ নিয়েছে। অনলাইন আবেদন ব্যবস্থায় ভোগান্তির পাশাপাশি প্রায় ১৪ হাজার সাংবাদিকের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। এতে ইসির দায়িত্বশীলতা ও ডিজিটাল প্রস্তুতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে তথ্য ফাঁসের অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন ইসির জনসংযোগ পরিচালক রুহুল আমিন মল্লিক।
অনলাইনে কার্ডের উদ্যোগ: উদ্দেশ্য ভালো, প্রস্তুতি প্রশ্নবিদ্ধ
ইসির জনসংযোগ শাখার মাধ্যমে চালু করা pr.ecs.gov.bd ওয়েবসাইটে সাংবাদিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, মোবাইল নম্বর, ই-মেইল, ছবি, স্বাক্ষরসহ সংবেদনশীল তথ্য দিয়ে নিবন্ধনের নির্দেশ দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল ভুয়া আবেদন, দ্বৈত কার্ড ও অনিয়ম ঠেকানো। কিন্তু সাংবাদিকদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত নেওয়ায় শুরু থেকেই অসন্তোষ দেখা দেয়, বিশেষ করে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের মধ্যে।
অনলাইনে চার ধাপের নিবন্ধন, ওটিপি যাচাই, নির্দিষ্ট ফরম্যাটে কাগজপত্র আপলোড–সব মিলিয়ে প্রক্রিয়াটি অনেকের কাছে জটিল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে ওঠে। এর মধ্যেই সাংবাদিক সমাজের চাপের মুখে ইসি এই অনলাইন পদ্ধতি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আগেই যে বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক আবেদন করেছিলেন, সেই তথ্যই পরে বিতর্কের কেন্দ্রে আসে।
১৪ হাজার সাংবাদিকের তথ্য ফাঁসের অভিযোগ
গত ৩১ জানুয়ারি বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে ইসির নির্ধারিত ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলে প্রায় ১৪ হাজার আবেদনকারীর তালিকা হোমপেজে ভেসে ওঠে বলে অভিযোগ ওঠে। তালিকার সঙ্গে নাম, এনআইডি নম্বর, মোবাইল নম্বর এবং সম্পূর্ণ আবেদনপত্র দেখার অপশনও উন্মুক্ত ছিল বলে জানান একাধিক সাংবাদিক। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে এই তথ্য জনসম্মুখে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। তাদের অভিযোগ, একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে এভাবে ব্যক্তিগত তথ্য উন্মুক্ত হয়ে পড়া শুধু গাফিলতিই নয়, বরং পেশাগত নিরাপত্তার জন্যও হুমকি।
অপসারণ দাবি, ইসির অস্বীকার
তথ্য ফাঁসের ঘটনায় গতকাল ইসির জনসংযোগ কর্মকর্তা রুহুল আমিন মল্লিকের অপসারণ দাবি করেছেন বিভিন্ন সাংবাদিক ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তাদের বক্তব্য, এ ধরনের গুরুতর ঘটনায় দায় স্বীকার ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এমন অবহেলা আরও বাড়বে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে রুহুল আমিন মল্লিক বলেন, ‘কোনো সাংবাদিকের তথ্য ফাঁস হয়নি। তার দাবি, সিস্টেম বন্ধ করার সময় কয়েক মুহূর্তের জন্য অ্যাডমিন ইন্টারফেস দৃশ্যমান হয়েছিল, কিন্তু ডাউনলোড বা কপি করার সুযোগ ছিল না। ইসির ভাষ্য অনুযায়ী, এটি একটি সাময়িক কারিগরি ত্রুটি, পরিকল্পিত বা স্থায়ী কোনো তথ্য ফাঁস নয়।
ডিজিটাল অবহেলার দৃষ্টান্ত: প্রযুক্তিবিদ
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও প্রযুক্তিবিদ তানভীর হাসান জোহা ইসির এ ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের ডিজিটাল অবহেলার নগ্ন উদাহরণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার মতে, লগইন ও অথেনটিকেশন ছাড়া সংবেদনশীল তথ্য দৃশ্যমান হওয়া কোনো ‘ছোটখাটো গ্লিচ’ নয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যথাযথ সিকিউরিটি অডিট, পেনিট্রেশন টেস্ট ও ডেটা প্রটেকশন ব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই কীভাবে এমন একটি সিস্টেম চালু করা হলো। জোহার মতে, ‘আজ সাংবাদিকদের তথ্য ফাঁস হলো, কাল যদি ভোটার তালিকা বা নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য এভাবে উন্মুক্ত হয়–তাহলে তার দায় নেবে কে?’
প্রশাসনিক ব্যর্থতা: বিশ্লেষকের মন্তব্য
ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন বিশ্লেষক জেসমিন টুলী মনে করেন, সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের কার্ড দেওয়ার প্রক্রিয়ায় নীতিগত দুর্বলতা এবং তথ্য সুরক্ষায় চরম অবহেলা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তার মতে, প্রায় ১৪ হাজার সাংবাদিকের ব্যক্তিগত তথ্য ঝুঁকির মুখে পড়া একটি গুরুতর প্রশাসনিক ব্যর্থতা। তিনি বলেন, কার্ড দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও পর্যবেক্ষণযোগ্য করা। কিন্তু স্পষ্ট নীতিমালা, পর্যাপ্ত কারিগরি প্রস্তুতি ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করায় সেই উদ্যোগই এখন নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
আস্থার সংকট ও সামনে চ্যালেঞ্জ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এমন বিতর্ক নির্বাচন ব্যবস্থাপনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, অনলাইন পদ্ধতি বাতিল নয়; বরং সেটিকে নিরাপদ, ব্যবহারবান্ধব ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে চালু করা উচিত ছিল। সাংবাদিকদের তথ্য ফাঁসের অভিযোগ নির্বাচন কমিশনের ডিজিটাল সক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের আস্থার সংকট তৈরি করেছে। এ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, স্বচ্ছ ব্যাখ্যা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়াই এখন নির্বাচন কমিশনের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।