রাজস্ব ফাঁকি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে তমা ও ম্যাক্স গ্রুপের মালিকদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তমা গ্রুপের ৫টি ও ম্যাক্স গ্রুপের ১০টি অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন (অডিট রিপোর্ট) তলব করা হয়েছে। সম্প্রতি দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান টিমের প্রধান ও দুদকের পরিচালক আবুল হাসনাত স্বাক্ষরিত চিঠি বিভিন্ন ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও জয়েন্ট স্টক কোম্পানি বা যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরে (আরজেএসসি) পাঠানো হয়েছে। গত ১৮ জানুয়ারিতে পাঠানো পৃথক চিঠিতে ওই দুই গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনের কপি দুদকে জমা দিতে বলা হয়েছে। তবে আজ পর্যন্ত কোনো নথি দুদকে পাঠানো হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নথিপত্র সরবরাহের তাগিদ দিয়ে শিগগিরই আরেকটি চিঠি পাঠানো হবে।
এ ব্যাপারে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম খবরের কাগজকে জানান, তমা ও ম্যাক্স গ্রুপের দুর্নীতিসংক্রান্ত নানাবিধ অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তারা দুদকের আইন ও বিধি অনুযায়ী কাজ করছেন। অনুসন্ধান শেষে অভিযোগের সত্যতা জানা যাবে।
অভিযোগ অনুযায়ী, তমা ও ম্যাক্স গ্রুপের মালিকরা তাদের অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক আয়-ব্যয় বা লাভ-লোকসানের তথ্য গোপন ও জালিয়াতি করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), জয়েন্ট স্টক কোম্পানি বা যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (আরজেএসসি) ও বিভিন্ন ব্যাংকে বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। ব্যাংকঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকে জমা দেওয়া বার্ষিক প্রতিবেদনে তাদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপুল পরিমাণ লাভের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে এনবিআরে জমা দেওয়া অডিট রিপোর্টে লোকসান দেখানো হয়েছে। আবার জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে জমা দেওয়া অডিট রিপোর্টে সীমিত লাভ ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে লোকসান দেখানো হয়েছে। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
দুদক কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিকভাবে তমা গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। সেগুলো হলো–তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড (টিসিসিএল), তমা কংক্রিট, তমা ট্যাক্সি, তমা প্রপার্টিজ ও ভাটিকান প্রপার্টিজ লিমিটেড। পর্যায়ক্রমে গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট তথ্য চাওয়া হতে পারে। পাশাপাশি প্রাথমিকভাবে ম্যাক্স গ্রুপের ১০টি প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। সেগুলো হলো–ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড, কুশিয়ারা পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি লিমিটেড, ম্যাক্স পাওয়ার লিমিটেড, ম্যাক্স ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড, ম্যাক্সিনক্স লিমিটেড, ম্যাক্স সিকোসও, ম্যাক্স বিল্ডিং টেকনোলজি লিমিটেড, ম্যাক্স প্রি-স্ট্রেস লিমিটেড, লুব হাউস ইন্ডাস্টিজ লিমিটেড ও আফা স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।
রাজস্ব ফাঁকি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন ও অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তমা ও ম্যাক্স গ্রুপের বিরুদ্ধে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুসন্ধান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একজন উপপরিচালকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিশেষ টিম গঠন করা হয়। কিন্তু ওই টিম কাজ শুরু করতে না পারায় নতুন করে আরেকজন উপপরিচালকের নেতৃত্বে টিম পুনর্গঠন করা হয়। দ্বিতীয় টিমও অনুসন্ধানের আশানুরূপ অগ্রগতি করতে না পারায় ফের অনুসন্ধান কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়। এভাবে কয়েক দফা অনুসন্ধান টিম পরিবর্তন শেষে পঞ্চম অনুসন্ধান টিমের দায়িত্ব পান দুদকের পরিচালক আবুল হাসনাত। চার সদস্যের বিশেষ টিমের দলনেতা হিসেবে তিনি গত ১৮ জানুয়ারি বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনসহ প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত চেয়ে এনবিআর, জয়েন্ট স্টক কোম্পানি ও বিভিন্ন ব্যাংকে নোটিশ পাঠিয়েছেন।
এদিকে তমা ও ম্যাক্স গ্রুপের নানাবিধ দুর্নীতির অভিযোগে আরও কয়েকটি অনুসন্ধান চলছে। এর মধ্যে রেলওয়ের বিভিন্ন প্রকল্প থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে একটি অনুসন্ধান চলমান।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রায় সব প্রকল্পের কাজ নিয়ন্ত্রণ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা গ্রুপ ও ম্যাক্স গ্রুপ। রাজনৈতিক প্রভাবে এই প্রতিষ্ঠান দুটি বিভিন্ন প্রকল্পের অন্তত ৩০ হাজার কোটি টাকার কাজ কবজা করেছেন। এর মধ্যে রেল ভবনের উচ্চপদে শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করে কাজ পাওয়ার পর দফায় দফায় প্রকল্পের মেয়াদ ও খরচ বাড়িয়ে লোপাট করেছেন অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা। লুটের টাকার বড় অংশ ঠিকাদারি কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি আমদানির নামে ভুয়া এলসি খুলে বিদেশে পাচার করেছেন ওই দুই কোম্পানির পরিচালকরা। অনুসন্ধানে অভিযোগসংশ্লিষ্ট তমা ও মাক্স গ্রুপের পরিচালকদের মধ্যে রয়েছেন ম্যাক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ, তার স্ত্রী ও গ্রুপের পরিচালক কানিজ ফাতেমা, তমা গ্রুপের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান ভূঁইয়া, তার মেয়ে ও গ্রুপের পরিচালক রাসনাত তারিন রহমান, ছেলে ও গ্রুপের আরেক পরিচালক মুকিতুর রহমান।
তমা ও ম্যাক্স গ্রুপের পরিচালকরা যেন দেশ ছেড়ে পালাতে না পারেন, সে জন্য তাদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নিষেধাজ্ঞার আদেশ জারি করেছেন বিচারিক আদালত।
জানা গেছে, রাজবাড়ী-টুঙ্গিপাড়া রেলপথ প্রকল্প, পাবনা ঈশ্বরদী-ঢালারচর রেলপথ, চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন রেলপথ নির্মাণ, আখাউড়া-লাকসাম রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রকল্পের মেয়াদ ও খরচ দফায় দফায় বাড়িয়ে বিপুল অঙ্কের টাকা লোপাটের অভিযোগে তমা ও ম্যাক্স গ্রুপের পরিচালকদের বিরুদ্ধে ২০১৮ সাল থেকেই দুদকে অভিযোগ জমা হয়। কোনো কোনো অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রভাবে ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে থাকে। ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর নতুন করে আরও অভিযোগ আসে।
এর মধ্যে আখাউড়া-লাকসাম ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্পে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে তমা ও ম্যাক্স গ্রুপের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। দেড় বছর অনুসন্ধানের পর বিষয়টি ফাইলবন্দি হয়। এরপর সেই ফাইল গত বছরের মার্চ মাসে সচল হয় এবং পুনরায় অনুসন্ধানের জন্য দুদকের পরিচালক মো. আবুল হাসনাতের নেতৃত্বে চার সদস্যের বিশেষ টিম গঠন করা হয়। টিমের অন্য সদস্যরা হলেন সহকারী পরিচালক আশিকুর রহমান, আল আমিন ও উপসহকারী পরিচালক সাবিকুন নাহার। টিমের সদস্যরা ইতোমধ্যে প্রকল্পসংক্রান্ত নথিপত্র সংগ্রহ করেছেন। নথিপত্রের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় অভিযোগের সত্যতা মিলেছে।
তমা ও ম্যাক গ্রুপের পরিচালকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অন্যতম অভিযোগ রাজবাড়ী-টুঙ্গিপাড়া প্রকল্প
যৌথভাবে এই প্রকল্পের কাজ পায় ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও তমা কনস্ট্রাকশন। কোনো ধরনের সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া ২০১০ সালে নেওয়া এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ১০১ কোটি টাকা। ২০১৩ সালের মধ্যে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পাঁচ বছর পর ২০১৮ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। ওই সময়ের মধ্যে তিনবার সময় বাড়ানোর পাশাপাশি নির্মাণ ব্যয় বাড়ানো হয় ৯৩৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১ হাজার ১০১ কোটি টাকার প্রকল্প গিয়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৩৫ কোটি টাকায়। এ প্রকল্পে অন্তত ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পাবনা ঈশ্বরদী-ঢালারচর রেলপথ
২০১০ সালে পাবনার ঈশ্বরদী থেকে ঢালারচর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের কাজ পায় মাক্স গ্রুপ। পাঁচ বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও সাড়ে তিন বছর সময় বাড়িয়ে ২০১৮ সালে শেষ হয়। শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৮৩ কোটি টাকা। তিন দফায় ব্যয় বাড়ানো হয় ১ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা। প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পে ট্রেন চলে মাত্র একটি। অথচ এই রুটে ২০ থেকে ২৮টি ট্রেন চলার কথা ছিল।
দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার রেলপথ
বিগত সরকারের সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ছিল চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন রেলপথ নির্মাণ। এ প্রকল্পেই বেশি অর্থ লোপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০১৬ সালে এই প্রকল্পে ১০১ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা। সেই প্রকল্পে সব শেষে ব্যয় করা হয় ১৮ হাজার কোটি টাকা।