আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। শহর-নগর ছাড়িয়ে নির্বাচনি প্রচার জমে উঠেছে গ্রাম-গঞ্জে। পোস্টার, দেয়াল লিখন, উঠান বৈঠক আর পথসভায় সরগরম হয়ে উঠেছে গ্রামীণ জনপদ। কোমল পানীয়, চা, চিনিসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য, বিড়ি, সিগারেট এবং প্রিন্টিং সরঞ্জামের চাহিদাও বেড়েছে। ভোটারদের কাছে টানতে নগদ টাকার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সামগ্রীও বিতরণ করছেন প্রার্থীরা। ফলে ঝিমিয়ে পড়া গ্রামীণ অর্থনীতি বেশ চাঙা হয়ে উঠেছে। নির্বাচনের কারণে গ্রামে টাকার প্রবাহ বাড়ছে। মানুষের হাতে টাকা যাচ্ছে।
জানা গেছে, গ্রামীণ রাজনীতিতে টাকার প্রবাহ বাড়ার অন্যতম কারণ প্রার্থীদের মধ্যে অনেকেই ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। রাজনৈতিক দলগুলো মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীর অর্থনৈতিক অবস্থাকে বিশেষ বিবেচনায় এনেছে। বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হয়ে নির্বাচনে লড়তে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন অনেক ব্যবসায়ী। এদের অধিকাংশই ব্যক্তিগতভাবে কিংবা পারিবারিকভাবে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। আবার কেউ কেউ রাজনীতি দিয়ে জীবন শুরু করলেও সময়ের বাস্তবতায় যুক্ত হয়েছেন ব্যবসায়ের সঙ্গে। বিশেষ করে ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের বিভিন্ন সংগঠন এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ, ঢাকা চেম্বার, মেট্রোপলিটান চেম্বার এবং চট্টগ্রাম চেম্বারসহ অধিকাংশ সংগঠনের নেতৃত্ব এখন রাজনীতিবিদদের হাতে।
গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় রাজধানীতে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে ভাসমান শ্রমিক কমে যাওয়ায়। এসব খাতে নিয়মিত কর্মরত অনেক শ্রমিককেই এখন আর রাজধানীতে দেখা যাচ্ছে না। মধুবাগ এলাকায় ভ্যানগাড়িতে সবজি বিক্রি করতেন মোবারক হোসেন। কিন্তু গত এক মাস তাকে আর সেখানে দেখা যায়নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্বাচন উপলক্ষে তিনি তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে নির্বাচনি প্রচারের কাজ করছেন। মোবারক হোসেনের মতো হাজার হাজার শ্রমিক এখন গ্রামে নির্বাচনি প্রচারে ব্যস্ত রয়েছেন। সব মিলিয়ে গ্রামীণ জনপদের বেকার জনগোষ্ঠী ব্যস্ত হয়ে উঠেছে নির্বাচনি কর্মকাণ্ডে। মফস্বলের ছাপাখানাগুলো এখন নির্বাচনি পোস্টার ছাপাতে ব্যস্ত। ব্যানার, ফেস্টুন ছাপার কাজে ব্যস্ত আধুনিক ছাপাখানাগুলো।
বিশ্লেষকদের মতে, গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হওয়ার পেছনে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে আরও কিছু বিষয়। শুকনো মৌসুম হওয়ায় গ্রামের লোকজন নিজেদের অবকাঠামোসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের জন্য এ মৌসুমকে বেছে নিয়েছেন। ফলে অনেকেই বাড়িঘর নির্মাণ থেকে শুরু করে বিভিন্নভাবে বাড়তি টাকা খরচ করছেন, যা সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে। তা ছাড়া শহরে বসবাসকারী অনেক ভোটার এ উপলক্ষে গ্রামে যাওয়ায় অর্থনীতিকে চাঙা করার ক্ষেত্রে তারাও ভূমিকা পালন করছেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রবাসীরাও অনেক বেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নির্বাচনের এই টাকা বিভিন্ন হাতে ছড়িয়ে পড়ছে। তাদের মতে, বণ্টন ব্যবস্থায় হঠাৎ এই পরিবর্তন আসায় চলতি মাসে গ্রামে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়বে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘নির্বাচন এলে তো বিভিন্নভাবে জনগণের হাতে টাকা আসে তাই। সরকার যেমন নির্বাচন কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যয় করে, টাকাটা তো অর্থনীতিতে সঞ্চালিত হয়। আবার প্রার্থীরাও বিভিন্নভাবে টাকা খরচ করছেন। এক একটা কেন্দ্রে যতজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, সবাই তো কোটি কোটি টাকা খরচ করছেন। নির্বাচন কমিশন যে ব্যয় নির্ধারণ করে দিয়েছে, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যয় করছেন প্রার্থীরা।’
ফলে মানুষের হাতে থাকা কালো টাকাসহ হাজার হাজার কোটি টাকা কিন্তু এখন অর্থনীতিতে বিভিন্নভাবে সার্কুলেশনে আসছে। এতে একদিকে যেমন গ্রামীণ অর্থনীতি সচল হচ্ছে, তেমনি মূল্যস্ফীতিও কিছুটা বাড়বে। তিনি বলেন, নির্বাচনের পরেই আসছে রমজান মাস। ফলে এই মুহূর্তে দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়লে স্বল্প আয়ের এবং নির্ধারিত আয়ের মানুষের ভোগান্তি বাড়বে। কারণ নির্বাচনে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে তা গ্রামের বা শহরের সব মানুষ সমানভাবে পাবে না। তিনি বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখন স্থবির হয়ে আছে। ফলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি। পরবর্তী সরকারের জন্য এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, অন্যান্য সময়ের চেয়ে ব্যাংকগুলোর গ্রামের শাখায় মুদ্রা চাহিদা বেড়েছে। সবকিছু মিলে চাঙা গ্রামীণ অর্থনীতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশের ৬১টি ব্যাংকের সারা দেশে ১১ হাজার ৪০৬টি শাখা রয়েছে। এর মধ্যে গ্রামীণ শাখা ৫ হাজার ১৭৬টি। যা মোট শাখার ৪৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকিং খাতে শহুরে এবং গ্রামীণ শাখার ব্যবধান অনেক কমে এসেছে।
এদিকে বর্তমানে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে নগদ টাকার পরিমাণও বেশ কিছুটা বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে ব্যাংক থেকে মানুষের হাতে নগদ অর্থের প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। যার অধিকাংশই ব্যয় হচ্ছে গ্রামে। এ সময় গ্রামে আমানতের পাশাপাশি ঋণ বিতরণও আগের চেয়ে বেড়েছে। পাশাপাশি এজেন্ট ব্যাংকিং এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও অনেক বেশি লেনদেন হয়েছে। মূলত নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই এই লেনদেন বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পরিচালনা ও আইনশৃঙ্খলা খাত মিলিয়ে এবার মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা, যা আগের দুই বছরের চেয়ে অনেক বেশি। এ ছাড়া, প্রতিটি নির্বাচনি এলাকায় ভোটারপ্রতি নির্বাচনি ব্যয় ১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নির্বাচনি এলাকার ব্যয় আগে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা থাকলেও এবার বলা হয়েছে, ভোটারের সংখ্যা বেশি হলে ব্যয় বেশি হলেও সমস্যা নেই। অর্থাৎ এবার কোনো সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নতুন তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে দেশে মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫১ জন, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৪ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ১২০ জন। তবে বিভিন্ন সংস্থার জরিপ রিপোর্ট বলছে ইসির নির্ধারিত ব্যয়ের সীমা কোনো প্রার্থীই মানছেন না। ভোটারপ্রতি প্রার্থীরা অনেক বেশি ব্যয় করছেন।
এদিকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রিন্টিং ব্যবসার পোয়াবারো অবস্থা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন নির্বাচনের ইঙ্গিত পাওয়ার পরই আগ্রহী প্রার্থীরা শুভেচ্ছা এবং নিজেদের আগ্রহের কথা জানিয়ে পোস্টার ও বিলবোর্ড ছাপিয়েছেন। এরপর নির্বাচন কমিশন থেকে চূড়ান্ত ঘোষণা এবং পরবর্তী সময়ে প্রতীক বরাদ্দের পর দুই দফায় পোস্টার ও লিফলেটসহ অন্যান্য প্রচারপত্র ছাপিয়েছেন প্রার্থীরা। এভাবে কয়েক দফার প্রিন্টিংয়ে ছাপাখানাগুলো বেশ জমে উঠেছে। গতকাল আরামবাগ ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি প্রেসেই ছাপা হচ্ছে নির্বাচনি পোস্টার। কর্মীরা জানালেন, সারা রাত তারা কাজ করেন।