বিতর্কিত কেপিএমজিকে দিয়ে আবারও একীভূত করা পাঁচ ব্যাংকে নতুন করে দায়-দেনার মান যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। এবারের অডিটে প্রতিটি ব্যাংককে ব্যয় করতে হবে প্রায় কোটি টাকা। যেখানে কিনা একীভূত করা ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের অতি প্রয়োজনীয় টাকাও ফেরত দিতে পারছে না।
একীভূত করা ব্যাংক পাঁচটি হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এসব ব্যাংকে নতুন করে অডিটের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এবার ব্যাংকগুলোর দায়-দেনার ওপর অডিট করা হবে। যদিও ব্যাংক একীভূতকরণের উদ্দেশ্যে ২০২৫ সালের শুরুতেই পাঁচটি ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক চিত্র বের করতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কেপিএমজি ও আর্নেস্ট অ্যান্ড ইয়ংকে দিয়ে অডিট করানো হয়। সে সময়ে বিতর্কিত কেপিএমজিকে নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন সংশ্লিষ্টরা। সে সময় দৈনিক খবরের কাগজে ‘বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে দুর্বল ব্যাংকের নিরীক্ষা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সে সময়ে প্রতিষ্ঠানটি পাঁচ ব্যাংকের সম্পদের মান যাচাইয়ে যে অডিট করেছিল, তখন কোনো পারিশ্রমিক নেয়নি। সেই একই প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে এখন আবার পাঁচ ব্যাংকের দায়-দেনার অডিট করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এবার প্রতিষ্ঠানটিকে প্রায় ৫ কোটি টাকা দিতে হবে, যা প্রতিটি ব্যাংককেই সমানভাবে পরিশোধ করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, আগে পাঁচটি ব্যাংকের সম্পদের মান যাচাই করার জন্য অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ করানো হয়েছিল, যার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ যাচাই করা হয়েছিল। এবার ব্যাংকগুলোর দায়-দেনার হিসাব যাচাই-বাছাই করা হবে। আগে অডিটের সময় এই প্রতিষ্ঠানকে কোনো ফি পরিশোধ করতে হয়নি। তবে এবার পাঁচটি ব্যাংককে প্রায় ৫ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই সময়ে যে অডিট করানো হয়েছিল, তার ব্যয় মিটিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক সেই ব্যয় সমন্বয়ের জন্যই নতুন করে অডিট করানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। যেখানে একীভূত করা ব্যাংকগুলো গ্রাহকের অতি প্রয়োজনীয় টাকাও ফেরত দিতে পারছে না, সেখানে তাদের ওপর বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপানো হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে করানো ফরেনসিক অডিট সঠিকভাবে হয়েছে কি না, সেই বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যদি সঠিকভাবে হয়ে থাকে, তাহলে এখন কেন আবার অডিট করতে হবে। যে ব্যাংকগুলো একীভূত করা হয়েছে, সেখানে রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যবস্থাপনা ও দক্ষতার অভাবের মতো বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কার্যকরী উদ্যোগ না নেওয়ায় আজ নানা ধরনের সংকটে পড়েছে পুরো ব্যাংক খাত। এই ব্যাংকগুলো এখন আমানতকারীদের টাকা দিতে পারছে না। যদিও এসব বিষয়ে আগেই ফয়সালা করা দরকার ছিল।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই ব্যাংকগুলো একীভূত করার শুরুতেই একবার ফরেনসিক অডিট করানো হয়েছিল। তাহলে এখন আবার কেন অডিট করতে হবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, আগে অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ করা হয়েছিল। আর এখন দায়-দেনার রিভিউ করা হবে। এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অ্যাসেট কোয়ালিটি যাচাই করতে গেলে তো অবশ্যই দায়-দেনাও দেখতে হবে। এটি তো কোনোভাবেই আলাদা আলাদা অডিটের প্রয়োজন নেই। যেখানে ব্যাংকগুলো হাজার হাজার গ্রাহকের টাকা দিতে পারছে না, সেখানে কোটি টাকার বিনিময়ে বারবার অডিট করানোর কোনো প্রয়োজন নেই।’
নতুন করে আবার কেপিএমজিকে দিয়ে একটি অডিট করানোর বিষয়ে জানতে চাইলে অভিজ্ঞ ব্যাংকার এবং একীভূত হওয়া গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নুরুল আমিন খবরের কাগজকে বলেন, একীভূতকরণের শুরুতেই পাঁচটি ব্যাংকের অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ (AQR) করানো হয়েছিল কেপিএমজি ও আর্নেস্ট অ্যান্ড ইয়ং নামক দুটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে। সে সময়ে প্রতিষ্ঠান দুটির খরচ বহন করেছিল বিশ্বব্যাংক।
তিনি বলেন, পাঁচটি ব্যাংকে ভিন্ন ভিন্নভাবে এর আগে অডিট করানো হয়েছে। আইদার ধরে নিতে হবে, ওই রিপোর্টগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংক হ্যাপি হয়নি, দ্বিতীয়ত হলো, আগের যাচাইয়ে কেবল সেই ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান যাচাই করা হয়েছিল। এখন একীভূত করার পর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে কী পরিমাণ দায়-দেনা দিতে হবে, সেই বিষয়ে হয়তো কোনো যাচাই করা হয়নি। সেটির একটি মূল্যায়ন করতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি আগে যখন অ্যাসেট কোয়ালিটি যাচাই করা হয়েছিল, একসঙ্গে এই জিনিসটিও বিবেচনা করে করা উচিত ছিল। তাহলে এখন ব্যাংকগুলোকে আর বাড়তি খরচ করতে হতো না। ব্যাংকগুলোর বর্তমানে কোনো ব্যবসা বা আয় না থাকলেও বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, বেতনসহ সব ব্যয় করতে হচ্ছে। এর মধ্যে আবার অডিটের জন্য যদি প্রতিটি ব্যাংককে কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়, তাহলে এই বাড়তি ব্যয় হবে অনেকটা বোঝার পর শাকের আঁটি।’