‘সকাল ১০টায় এখানে এসেছি। লাইনে দাঁড়িয়েছি। তারপরও সিরিয়াল পাচ্ছি না। কোথায় যাব। কীভাবে পাব টিসিবির পণ্য। অনেকেই পরে এসেও মাল পেয়েছে। আমরা পাচ্ছি না।’ রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার জাপান গার্ডেন সিটির সামনে টিসিবির ট্রাকসেলের সামনে বেলা ৩টায় এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন মোহাম্মদিয়া হাউজিং সোসাইটির গৃহিনী সালমা বেগম। এ ছাড়া শাহিনা, শাহিনুরেরও একই অভিযোগ। তারা সকাল ১০টায় এলেও সিরিয়াল পাননি। আবার অনেকে সিরিয়াল পেলেও পণ্য পাবেন কি না সেই নিশ্চয়তা পাননি। শুধু এই ট্রাকের সামনেই নয়, আজিমপুরসহ বিভিন্ন স্থানে ট্রাকসেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নারী-পুরুষদের একই অভিযোগ।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) সূত্র জানায়, অন্য বছরের মতো এবারও পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ভর্তুকি মূল্যে ভোগ্যপণ্য বিক্রির সিদ্ধান্ত হয়। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে ২ লিটার সয়াবিন তেল, ১ কেজি চিনি, ২ কেজি মসুর ডালের সঙ্গে ১ কেজি ছোলা ও ১ কেজি খেজুর। বিক্রি হবে ১২ মার্চ পর্যন্ত। প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ১১৫ টাকা, চিনি ৮০ টাকা কেজি, মসুর ডাল ৭০ টাকা কেজি, ছোলা ৬০ টাকা ও খেজুর ১৬০ টাকায় কিনতে পারবেন ভোক্তারা। বাজারে এসব পণ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ। তাই যেখানেই টিসিবির ট্রাক দেখা যাচ্ছে নিম্ন আয়ের নারী-পুরুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন।
গতকাল মোহাম্মদপুরে টিসিবির ডিলার আল্লামা এন্টারপ্রাইজের ট্রাকসেলে দেখা যায় নারী-পুরুষের দীর্ঘ লাইন। এই ডিলারের প্রতিনিধি গাজী আজিজুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এখানে আসি। ৫টি পণ্যকে সাজাতে কিছু সময় লাগে। যারা লাইনে দাঁড়ায় তাদের ৪০০ জনকে সিরিয়াল নম্বর দেওয়া হয়। যাতে বিশৃঙ্খলা দেখা না দেয়। কারণ টিসিবি থেকে আমাদের হিসাব করেই ৮০০ লিটার তেল, ৮০০ কেজি ডাল, ৪০০ কেজি চিনি, ছোলা ৪০০ কেজি ও ২০০ কেজি খেজুর দিয়েছে। কাজেই আরও বেশি দেওয়ার ব্যাপারে কথা বলতে হলে টিসিবিকে বলতে হবে।’
এ সময় শেখেরটেক থেকে আসা সাবেক মাদ্রাসা শিক্ষক মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘বেলা ১১টায় এসে ১৩৬ নম্বর সিরিয়াল পেয়েছি। কম দামে পাওয়ার আশায় এখনো লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু পাব কি না নিশ্চিত হতে পারছি না। কেউ কিছু বলতে পারছে না। আবার অনেকেই পরে এসে মাল নিয়ে চলে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সুবিধা পাওয়ার জন্য এখানে এলেও ভোগান্তির শেষ নেই। ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। অনেক বয়স্ক লোকও আছেন। তাদের সিস্টেমে আনা দরকার।’ বিহারি ক্যাম্পের মাছ বিক্রেতা আসলাম বলেন, ‘বাজারে বেচা-কেনার কাজ নেই। তাই লাইনে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু পাব কি না কেউ বলতে পারছে না।’
শ্যামলী থেকে আসা কেপিদাসও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকার সুযোগ দিলেও আমরা কম দামের পণ্য পাচ্ছি না। বেলা ১১টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও পাব কি না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।’
শুধু এখানেই নয় রাজধানীর অধিকাংশ ট্রাকসেলের একই চিত্র দেখা গেছে। নিম্ন আয়ের নারী-পুরুষ হাতে ব্যাগ নিয়ে প্রধান প্রধান সড়কে দাঁড়িয়ে থাকেন। অপেক্ষায় থাকেন কখন টিসিবির ট্রাক আসবে। তারা টিসিবির ট্রাক দেখলেই ছুটাছুটি করতে থাকেন কে কার আগে এসব পণ্য নিতে পারবেন।
এ ব্যাপারে অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির চাপে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। তাই টিসিবির কম দামের পণ্যের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় পণ্য কম। তাই সরবরাহ বাড়ানো যায় কি না এই সরকারকে তা ভাবা দরকার।’
টিসিবির উপপরিচালক মো. শাহাদত হোসেন বলেন, ‘নিম্ন আয়ের মানুষের কথা বিবেচনা করেই প্রতিদিন রাজধানীর মেট্রোপলিটন এলাকায় ৫০টি, চট্টগ্রাম মেট্রোতে ২০টি, ৭ মেট্রো এলাকায় ১৫টি করে এবং অবশিষ্ট ৫৫টি জেলায় ৫টি করে মোট ৪৫০টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমে এসব পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। শুক্র ও শনিবার ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন ট্রাকপ্রতি ৪০০ জনের পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে।’