পুলিশের শুধু পোশাকের রং পাল্টে ও র্যাবের নাম পাল্টানোর সিদ্ধান্ত দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্কারের দায়িত্ব যেন শেষ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন, ফৌজদারি কার্যবিধি (সিআরপিসি) সংশোধন, পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা, সদস্যদের আচরণসহ নানা বিষয়ে কথা হলেও বর্তমানে দৃশ্যমান কিছুই দেখছেন না বিশ্লেষকরা। বাহিনীর গভীরে কাজ না করে শুধু নাম বা পোশাক পরিবর্তনকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের লোক দেখানো উদ্যোগ বলেও কেউ কেউ মন্তব্য করছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকৃত সংস্কার না করে উল্টো শুধু পুলিশের দীর্ঘদিনের ‘স্মার্ট’ কমব্যাট পোশাক খুলে নিয়ে নতুন পোশাক পরিয়ে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। নতুন পোশাক নিয়ে শুরুতেই নানা সমালোচনা হলেও তোয়াক্কা করা হয়নি। ফলে অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেওয়ার পর প্রকাশ্যেই নতুন পোশাক নিয়ে অস্বস্তির কথা জানাচ্ছেন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যরা।
বিশ্লেষকরা আরও মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে গুম-খুনসহ নানা অভিযোগের তিরে বিদ্ধ র্যাবের নাম পাল্টানোর কথা জানানো হয়। র্যাবের নতুন নাম স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স বা সংক্ষেপে ‘এসআইএফ’, হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা নিয়ে এই এলিট ফোর্সের সদস্যদের অনেকেই বিব্রত।
এ প্রসঙ্গে গতকাল সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদা খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘বাহিনীর সংস্কার একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এতে কিছুটা সময় লাগে। শুধু পোশাক বা রং পাল্টানো–সেই অর্থে সংস্কার নয়। এটারও প্রয়োজন হয়, কিন্তু সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। মূলত, বাহিনীর পরিচালনা পদ্ধতি, আইনগত বিষয়, সদস্যদের কর্মকাণ্ড, বৈশিষ্ট্যসহ নানা রীতি-নীতির বিষয়গুলোতে দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন হলেই কেবল তা সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হয়। এর জন্য প্রয়োজন হয় রাজনৈতিক সদিচ্ছা বা উদ্যোগের। যেহেতু রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এসেছে, হয়তো আগামীতে সেভাবেই সংস্কার হবে।’
চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর দেশের প্রধান আইনশৃঙ্খলা বাহিনী– বাংলাদেশ পুলিশ চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। ওই সময়ে বহু পুলিশ সদস্য হতাহতের শিকার হন। পাশাপাশি নানা রকম অভিযোগে পুলিশের মনোবল ও কাঠামোয় চরম নাজুক পরিস্থিতি দেখা যায়। পুলিশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তি, তাদের ওপর ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব, সরকারের লাঠিয়াল বাহিনী, কর্মকর্তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার-স্বেচ্ছাচারিতাসহ বিভিন্ন অভিযোগ এনে অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের কথা বলা হয়। এ নিয়ে উচ্চপর্যায়ের কমিটি হলে তারাও নানা প্রস্তাব জমা দিয়েছিল।
পুলিশ সংস্কার প্রস্তাব বা সুপারিশ তৈরির প্রক্রিয়ায় অন্যদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ওমর ফারুক। এই অপরাধবিজ্ঞানীর মতে, যে প্রতিশ্রুতি বা উদ্দেশ্য নিয়ে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তার কোনোটি আলোর মুখ দেখেনি।
সম্প্রতি খবরের কাগজের সঙ্গে আলাপকালে অধ্যাপক ড. মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘পুলিশ সংস্কার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার যেসব কথা বলেছিল, তাদের সেই দেড় বছরে দৃশ্যমান কোনো কিছুই দেখা যায়নি। তবে বর্তমানে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসায় আমরা এ বিষয়ে আশাবাদী হয়েছি। কেননা, এই সরকারের প্রতিশ্রুতিতেও জননিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। আমরা মনে করি, বিএনপির নেতৃত্বাধীন এই সরকার পুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যথাযথ সংস্কারের মাধ্যমে পরিচালনা করবে। তা না করলে ভবিষ্যতে তারাও বিপদে পড়বে। ফলে দলমত নির্বিশেষে পুলিশকে সত্যিকার অর্থে জনবান্ধব, দায়িত্বশীল ও সেবামুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।’
একাধিক বিশ্লেষক মনে করেন, পুলিশের মধ্যে যে ‘ঔপনিবেশিক মানসিকতা’, রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হওয়া, ক্ষমতার দাপট দেখানোসহ মৌলিক যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলোর পরিবর্তন করাই মূল চ্যালেঞ্জ। এসব বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার কাগজে-কলমে অনেক উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন নেই। ফলে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্কার নিয়ে সাধারণ মানুষ এবং অপরাধ বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা রকম প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য সংস্থার অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও সক্ষমতা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের যেসব উদ্যোগ দেখা যাচ্ছিল, সেগুলো নিয়ে আমরা ব্যাপক আশাবাদী ছিলাম। কিন্তু বাস্তবে শুধু পুলিশের পোশাক ও র্যাবের নাম পাল্টানোর ঘোষণা ছাড়া আর কোনো পরিবর্তন দেখছি না। ফলে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সেই পুরোনো ধারা থেকে বের করে আনার পদক্ষেপগুলো শুধু আলোচনার মধ্যেই রয়ে গেল। যদিও রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে কোনো সংস্কারই কাজে দেবে না। ফলে নতুন রাজনৈতিক সরকার নিশ্চয়ই এই বিষয়গুলোকে ইতিবাচকভাবে গুরুত্ব দেবে বলেই বিশ্বাস করি। আমরা আশাবাদী।’
পুলিশ সংস্কার কমিশন ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি (সিআরপিসি) সংশোধনের মাধ্যমে পুলিশের গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের অবাধ ক্ষমতা সীমিত করার প্রস্তাব দেয়। এ ছাড়া জনবান্ধব পুলিশিং নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় দেশগুলোর আদলে জনতা নিয়ন্ত্রণের মডেল অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত পুলিশের পোশাক ও র্যাবের নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়াসহ কিছু প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছে। যদিও সেগুলোকে কাঠামোগত সংস্কারের চেয়ে ‘ব্যবস্থাপনাগত পরিবর্তন’ হিসেবে দেখছেন অনেকে। এ ছাড়া দৃশ্যমান হিসেবে–পুলিশের শীর্ষ পদে বড় ধরনের রদবদল, আগের সরকারের ‘ঘনিষ্ঠ’ হিসেবে অনেককে বাধ্যতামূলক অবসর বা গ্রেপ্তারের বিষয়গুলো দেখা যায়। বেশ কিছু অবসরপ্রাপ্ত বা ‘বঞ্চিত’ কর্মকর্তাকে নতুন করে পদোন্নতি দিয়ে পুলিশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর বাইরে স্বাধীন পুলিশ কমিশন প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা, জনবান্ধব আচরণসহ নানা বিষয়ে জোরালো আলোচনা হলেও বাস্তবে এসবের প্রতিফলন দেখছেন না মানুষ।